চোখের পানিতে বুক ভাসাইয়া মা বলে, “দে।”
গেলাস লইয়া ধীরে ধীরে বছির বোনের মুখে পানি দেয়। পানি খাইয়া বড় যেন কিছুটা শান্ত হয়। ভাইয়ের হাতখানা কপালে ঘসিতে ঘসিতে বলে, “মিঞা বাই! দেহা ত কেন সোনালতা আনছাস।” বছির সোনালতা গাছি বোনের হাতে দেয়। হাতের উর সোনালতাগুলি নাড়িয়া চাড়িয়া বোন বলে, “মিঞা বাই। আমি ত এহন খেলতি পারব। এই সোনালতাগুলি তুমি রাইখা দাও। কালকা বিয়ানে ফুলী আসপি। তারে দিও! হে সোনালতার বয়লা বানায়া পরবি, হাসলী বানায়া পরবি।”
ফুলীর মা বলে, “অ্যালো ম্যায়া! তুই রইলি অসুখে পইড়া, হে সোনালতা লয়া কার সঙ্গে খেলা করবি লো?”
আজাহের তারিণী ডাক্তারের নিকট হইতে ঔষধ লইয়া ফিরিয়া আসিল! বাপকে দেখিয়া মেয়ে আবার কাঁদিয়া উঠিল, “ও বাজান! আমারে পানি দাও–পানি দাও।”
বাপ বলে, “মারে একটু সহ্য কইরা থাক। ডাক্তার তোরে পানি দিতি নিষেধ করছে।”
মেয়ে তবু কান্দে, “পানি–পানি–পানি, আমারে পানি দাও।
মা পানিতে ভেজানো সজের পোটলাটা মেয়ের মুখের কাছে ধরে।
মেয়ে চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া ওঠে, “অতটুকু পানিতে আমার হয় নারে মা। আমারে কলসী কলসী পানি দাও।” ডাক ছাড়িয়া মেয়ে বিছানা হইতে উঠিয়া যাইতে চাহে। বাপ তাকে জোর করিয়া বিছানার সঙ্গে ধরিয়া রাখে। মা জোড়হাত করিয়া আল্লার কাছে দোয়া মাঙে–”আল্লা রছুল–পাক পরওয়ারদ্দেগার! আমার বড়ুরে বাল কইরা দাও।”
পাড়া-প্রতিবেশীরা খবর পাইয়া সকলেই বড়কে দেখিতে আসিয়াছে। গরীবুল্লা মাতবরেও আসিয়াছে। হলদে পাখির মত ডুগে ভুগে মেয়েটি, যার বাড়িতে বেড়াইতে। যাইত, সেই কাছে ডাকিয়া আদর করিত; কিন্তু তারা যে সকলেই আজ নাচার! কেউ আসিয়া এমন কিছু বলিয়া যাইত যা করিলে মেয়েটির সকল যন্ত্রণা সারে, সে কাজ যতই কঠিন হউক, তারা তা করিত! নীরব দর্শকের মত তারা উঠানে বসিয়া চোখের পানি ফেলিতে থাকে। সারা রাত্র এই ভাবে পানি পানি করিয়া মেয়ে ছটফট করে।
“ও বাজান! তোমার পায়ে পড়ি। আমাকে পানি দাও। আমাকে পানি দাও। পানির জন্যি আমার বুক ফাঁইট্যা গেল।”
আজাহের মেয়েকে পানি দেয় না। ডাক্তার বলিয়াছে, যদি মেয়েকে বাঁচাইতে চাও, তবে তার মুখে পানি দিও না। আজাহের নির্মম পাষাণের মত নিষ্ঠুর হইবে, তবু সে মেয়েকে বাঁচাইবে। পানি না দিলে সে বাঁচিবে। ডাক্তার বলিয়াছে, যে অনেক কিছু জানে, যার বিদ্যা আছে। বহু ঠকিয়া আজাহের শিখিয়াছে বিদ্বান লোকে বেশী বোঝে। তার কথা। পালন করিলে মেয়ে বাঁচিবে।
বউ কাঁদিয়া আজাহেরের পায়ে আছড়াইয়া পড়ে, “তুমি কি পাষাণ ঐছ! দাও উয়ারে একটু পানি। যদি বাঁচনের অয় এমনি বাঁচপি।”
না! না! মেয়েকে তার বাঁচাতেই হইবে। মেয়ে না বাঁচিলে আজাহের পাগল হইবে–আজাহের গলায় দড়ি দিবে। তাই মেয়েকে তার বাঁচাইতেই হইবে। ডাক্তার বলিয়াছে–বিজ্ঞলোকে বলিয়াছে, পানি না দিলে মেয়ে বাঁচিবে।
বছির বলে, “বাজান; একটু পানি ওর মুহি দেই।”
আজাহের রাগ করিয়া উঠিয়া যায়। “তোগো যা মনে অয় কর। আমার আর সহ্য অয় ।” বাপ চলিয়া গেলে মা আবার সেই সজ ভিজানো একটুকু পানি মেয়ের মুখে দেয়। অনেকক্ষণ পরে পানি পাইয়া মেয়ে যেন একটু শান্ত হয়। মার গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলে, “মারে! কারা যিনি আসত্যাছে। আমারে কয়, আমাগরে সঙ্গে খেলতি যাবি? আমি কই? আমিত খেলি মিঞা বাইর সঙ্গে, ফুলুর সঙ্গে। ওই যে–ওই যে তারা আসত্যাছে। কি সুন্দর ওগো দেখতি, ওই যে দেহ মা।”
মা বলে, “কই আমিত কেওইরে দেহি না।” মায়ের গলা জড়াইয়া ধরিয়া মেয়ে বলে, “মা! তুই আমার আরো কাছে আয়। ওরা আমারে নিয়া যাবার চায়। তুই কাছে থাকলি। আমারে কেওই নিবার পারবি না।”
মা মেয়েকে আরও বুকের কাছে টানিয়া আনে।
মেয়ে মায়ের মুখের কাছে মুখ লইয়া বলে, “আমার সোনা মা! আমার নক্কী মা! তুমি। গিলাসে কইরা এক গিলাস পানি আমারে দাও। পানি খাইলি আমি মরব না।”
মা আর একটু পানি মেয়ের মুখে দেয়।
ঘর হইতে বাহির হইয়া আজাহের মাঠের ধারে বসিয়া কান্দে। বাড়িতে বসিয়া কান্দিলে বউ আরও আওলাইয়া যাইবে, অনেকক্ষণ কাঁদিয়া আজাহের তারিণী ডাক্তারের বাড়িতে গেল। মুড়ির ধান আনে নাই দেখিয়া তারিণী ডাক্তার রাগিয়া খুন। “আরে মিঞা! মনে করছ বিনে জলে চিড়ে ভিজবে। তা হয় না।”
আজাহের বলে, “ডাক্তার বাবু! মেয়ের অবস্থা দেইখ্যা আমার কুনু জ্ঞান গিরাম নাই। আমি কাইলই আপনারে মুড়ির দান আইনা দিবানি। আইজ আবার চলেন আমার ম্যায়াডারে দেখপার জন্যি।” কলেরার রোগী টাকা পাইলেও তারিণী ডাক্তার যাইয়া দেখিতে ভয় পায়। ছোঁয়াছে রোগ। কখন কি হয় কে বলিবে।
বিজ্ঞের মত ডাক্তার বলে, “আর দেখতে হবে না। যা ঔষধ দিয়াছি তাই খাওয়াও গিয়ে। কিন্তু পানি খেতে দিও না। পানি দিলে মেয়েকে বাঁচাতে পারব না।”
আজাহের বলে, “ডাক্তার বাবু! ম্যায়া আমার পানি পানি কইরা এমুন ছটফট করে যে । মদ্দি মদ্দি পানি না দিয়া পারি না। জানেন ত বাপ-মায়ের প্রাণ!”
ডাক্তার ঘাড় নাড়িয়া বলে, “পানি দিলে মেয়ে বাঁচাতে পারব না। তোমরা মুখ মানুষ। তোমাদের মধ্যে চিকিৎসা করে ওই ত এক দায়। যা বলেছিলাম করলে তার উল্টো।”
