কাজী সাহেব এবার চটিয়া বলিলেন, “আরে মিঞা! ছেলে-পেলে তুলে কথা বল? যাও এখান থেকে। পাঁচটাকা না জোটে ওই সস্তা ডাক্তার আছে তারিণী ডাক্তার, সেন। মশায় তাদের ডেকে নাও গিয়া।”
ইহা বলিয়া কাজী সাহেব অন্দরে প্রবেশ করিলেন। অনেকক্ষণ বসিয়া থাকিয়া মরার মত উঠিয়া আজাহের তারিণী ডাক্তারের কাছে আসিয়া উপস্থিত হইল। তারিণী ডাক্তার সেই কবে ফরিদপুরের এক ডাক্তারের কম্পাউণ্ডারী করিত। ঔষধ চুরি করিয়া চাকরি হইতে বরখাস্ত হইয়া দেশে আসিয়া ডাক্তারী আরম্ভ করিয়াছে। পাড়া গাঁয়ের লোক। কোন ডাক্তারের কত বিদ্যা কেহ জানে না। নানা ভেলভাল দিয়া যে লোক ঠকাইতে পারে তাহারই বেশী পশার।
তারিণী ডাক্তারকে আজাহের যাহা দিল তাহাতেই সে তাহার বাড়িতে যাইয়া রোগী দেখিতে রাজি হইল। কারণ এ তল্লাটে তাহাকে বড় কেউ ডাকে না।
ডাক্তারকে সঙ্গে লইয়া আজাহের যখন গৃহে ফিরিল তখন মেয়ে আরও অস্থির। কেবল ঘন ঘন পানি খায় আর বমি করে। তারিণী ডাক্তার রোগীর নাড়ী ধরিয়া অনেকক্ষণ চোখ বুজিয়া বসিয়া রহিল, তাহার পর রোগীর চোখের পাতা উল্টাইয়া, পেট টিপিয়া দেখিয়া অতি গম্ভীর হইয়া বাহিরে আসিয়া ঘুঁটের ছাই হাতে মাখিয়া হাত ধুইল। আজাহের আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করে, “ডাক্তার বাবু! কেমুন দেখলেন?”
ডাক্তার জিজ্ঞেস মতন গম্ভীর হইয়া বলেন, “ঠিক সময়েই আমাকে ডেকেছ। ডাকতে যদি ওই কাজী ডাক্তারকে তবে কিছুই করতে পারত না। জান ত বিলনাইলার মাতবর কি নাম জানি? হ হ অছিরদ্দী মুন্সী, তার ছেলের নামটি যেন কি?”
আজাহের আবার বলে, “আমার ম্যায়াডা কেমুন দেখলেন ডাক্তারবাবু?”
দাঁড়াও কই আগে, অছিরদ্দী মুন্সীর ছেলের নাম–হু হু মনে পড়েছে গইজদ্দী–তার হ’ল কলেরা। বড় লোক ত। ডাকল ঐ কাজী ডাক্তারকে। এ সব অসুখের চিকিৎসা ওকি জানবে? সাতদিন চিকিৎসা করার পরেও রোগী চিৎপাত। তখন এ-পাড়ার বরান খা সেই তাদের যেয়ে বলল আমার কথা। আমি যেয়ে এক গুলিতেই রোগ সারিয়ে দিয়ে এলাম।”
আজাহের বলে, “আপনার গুণপনার কতা ত আমরা জানিই। আমার ম্যায়াডারে কেমুন দেখলেন?”
ডাক্তার বলে, “তোমার মেয়ের অবস্থাটা ভাল না, তবে কোন চিন্তা নাই। আমারে যখন ডেকেছ, এমন ঔষধ দেব তোমার মেয়েটা ভাল হয়ে যাবে। তবে একটা কথা, জল দিতে পারবে না। জল খাওয়ান বন্ধ করতে হবে।”
আজাহেরের বউ বলে, ডাক্তারবাবু! পানি না খাওয়ায়া উয়ারে কেমুন কইরা রাখপ?” ডাক্তার বলে, “মেয়ে যদি বাঁচাতে চাও তবে তা রাখতেই হবে।”
ঔষধ দেওয়ার জন্য বাড়িতে কোন পরিষ্কার শিশি নাই। পানি খাওয়ার একটি কাঁচের গ্লাস ছিল। তাহাতেই ডাক্তারবাবু কয়েক ফোঁটা ঔষধ ঢালিয়া দিলেন। বলিয়া দিলেন, “চার বারের ঔষধ দিলাম। সারা রাত্রে চারবার আন্দাজ মত ঢেলে খাওয়াবে। কাল ভোরে। যেয়ে আমাকে খবর দিও! ভাল কথা, ঔষধের দাম ত দিলে না মিঞা?”
আজাহের বলে, “আমার যা ছিল সবই ত আপনারে দিছি ডাক্তার বাবু।”
ডাক্তার জিজ্ঞাসা করে, “মুড়ির ধান আছে নি তোমার বাড়িতে? কাল সকালে যখন। যাবে আমার জন্য তিন কাঠা মুড়ির ধান নিয়ে যেয়ো। ওকি! তোমার ওই পালানে কেমন সুন্দর এক কাঁদি মর্তমান কলা হয়েছে। ভাল কথা আজাহের! আমার মনেই ছিল না। একটা সুন্দর ঔষধের কথা মনে পড়েছে। তুমি ওই কলার কাদিটা কেটে নিয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে চল। ঔষধটা এখনই নিয়ে আসতে পারবে। আর শোন আজাহের এক বোঝা খড় নিয়ে চল। আমার গরুটার খাবার নেই।”
মর্তমান কলার কাঁদি আর এক বোঝা খড় লইয়া আজাহের তারিণী ডাক্তারের সঙ্গে সঙ্গে চলিল।
ডাক্তার চলিয়া গেল। মেয়ে বারবার পানি চায়, “মারে আর একটু পানি দাও।”
মা মেয়ের গায়ে মুখে হাত বুলাইতে বুলাইতে বলে, “মা! ডাক্তার যে তোমারে পানি দিতে বারণ কইর্যা গ্যাল।”
মেয়ে কয়, “মা! পানি না খাইলি আমি বাঁচপ না। একটু পানি দাও।” মায়ের ত মন। মা মেয়ের মুখে একটু পানি দেয়।
মেয়ে বলে, “মা! অতটুকু পানিতে ত আমার কইলজা ঠাণ্ডা অয় না। আমারে এক কলসী পানি দাও।”
গরীবুল্লা মাতবরের বউ আসিয়াছিল খবর পাইয়া। সে বলিল, “বউ! সজ বিজান পানি ওরে দ্যাও। তাতে তেষ্টা কমবানে!” মা তাড়াতাড়ি নেকড়ায় সজ বাধিয়া পানিতে ভেজায়। সেই নেকড়া মুখের কাছে ধরে। দুই এক ফোঁটা পানি মেয়ের মুখে পড়ে!
মেয়ে বলে, “মা! ও-পানি না, আমারে ইন্দারার পানি দাও। আমারে পুকুইরের পানি দাও। মা! পানি–পানি–পানি”
মোড়ল-বউ এর গলা জড়াইয়া মা কান্দে, “বুবুগো! এ তো সওন যায় না।”
নিজেরই চোখের পানি গড়াইয়া পড়ে বউকে প্রবোধ দিতে যাইয়া, “কি করবা বউ। সবুর কইরা থাক।”
বছির পাঠশালা হইতে ফিরিয়া আসে। “ও বড় তোর জন্যি সোনালতা আনছি।”
বড় ডাকে, “মিঞা ভাই! তুমি আইস্যা আমার কাছে বইস।” বছির যাইয়া বোনের পাশে বসিয়া মাথার চুলগুলিতে হাত বুলায়। আবার বড় বলে, “মা! তোমার পায়ে পড়ি আমারে অনেকটুকু পানি দাও।”
মা কান্দিয়া বলে, “ডাক্তার যে তোরে পানি দিবার মানা করছে।” রাগ করিয়া ওঠে বড়ু। “ছাই ডাক্তার। ও কিছুই জানে না। মিঞা বাই! তুমি আইছ। মা আমারে পানি দ্যায় না। তুমি আমারে পানি দাও।”
বছির মার দিকে চাহিয়া বলে, “মা দেই?”
