বউ বলে, আর এক কর্তা। মোড়ল বউরে কইবেন তার ছাইলার যহন বিয়া অবি আমারে যেন নাইয়ারে নেয়। কতকাল গিরামডারে দেহি না। একবার যাইবার ইচ্ছা করে।”
বিদায় লইয়া রহিমদ্দী পথে রওয়ানা হয়। আজাহের তাকে গ্রামের শেষ সীমা পর্যন্ত আগাইয়া দিয়া আসে। ফিরিবার সময় আজাহেরের মনে হয়, আজ যে গান গাহিয়া রহিমদ্দীন সকলের অন্তর জয় করিয়া গেল, এ যেন তাহাদের নিজেরই কীর্তি। সে যেন নিজেই গান গাহিয়া সকলকে মাতাইয়া দিয়াছে। রহিমদ্দী উপলক্ষ মাত্র। কারণ সেই ত তাহাকে ডাকিয়া আনিয়াছিল। গর্বে আজাহেরের নাচিতে ইচ্ছা করে।
২৬-৩০. এক কোচ বেথুন
২৬.
ভরদুপুরে কোন্ জঙ্গল হইতে এক কোচ বেথুন, সজারুর কাঁটা আর লাল মাকাল ফল কুড়াইয়া আনিয়া বড় বলে, “মা! আমার জানি কেমুন করতাছে।”
মেয়ের গায়ে কপালে হাত বুলাইয়া দিতে দিতে মা বলে, “ক্যারে নক্কী! কি ঐছে?”
বডু কয়, “মা! আমার যিনি বমি বমি করতাছে।”
মা বলে, “গরের মাইজায় সপ মেইলা দিলাম। তুই একটু শুইয়া থাক।”
মায়ের মেলান সপের উপর শুইয়া বড়ু মার গলা জড়াইয়া ধরে, “মা! তুই আমার কাছে বইস্যা থাক।”
মায় কয়, “আমার নক্কী! আমার সুনা! কত কাম পইড়া রইছে। তুমি শুইয়া থাহ। আমি যাই।”
মেয়ে বলে, “আইচ্ছা মা! তবে তুমি যাও।”
মা একাজ করে ওকাজ করে কিন্তু কোন কিছুতেই মন টেকে না। ঘরে আসিয়া দেখে, বড় বমি করিতেছে। মা আসিয়া মেয়েকে জড়াইয়া ধরে। মেয়ে বলে, “একটুখানি বমি ঐছে মা। য়্যাক্কনি সাইর্যা যাবি। তুমি কাম কর গিয়া। মিঞাবাই ত আসপ্যানে পাঠশালা ঐতে। তার বাত রান্দ গিয়া।”
মা মেয়েকে আদর করিয়া বলে, “ওরে আমার মা জননীরে। আমার মায়ের কত বুদ্ধি ঐছে!”
মেয়ে আবার বমি করে। এমন সময় বাপ আসিল। মা ডাকে, “আমাগো বাড়ির উনি এদিকে আইস্যা দেহুক। আমার বড় যে বমি করতাছে।”
বাপের প্রাণ ছ্যাত করিয়া উঠিল। ওদিকের হিন্দু পাড়ায় কলেরা আরম্ভ হইয়াছে। তাড়াতাড়ি বাপ আসিয়া মেয়ের পাশে বসিল। “কি মা! তোমার কেমন লাগতাছে?”
মেয়ে বলে, “আমারে যিনি অস্থির কইরা ফেলত্যাছে।”
মায় বলে, “আমাগো বাড়ির উনি ও-পাড়ায় মোকিম মিঞারে ডাইকা নিয়া আসুক। ম্যায়ার বাতাস লাগছে। হে আইসা ঝাইড়া দিলি বাল অয়া যাব্যানে।”
আজাহের তাড়াতাড়ি মোকিম মিঞাকে ডাকিয়া আনে। আসিয়া দেখে, মেয়ে বমিই। করিতেছে না–পানির মত পায়খানাও করিতেছে। মোকিম মিঞা নাড়ী ধরিয়া বলিল, “মাইয়ার বাতাস লাগছে। আমি পানি পইড়া দিয়া যাই। বাল অয়া যাব্যানে।” কিন্তু মোকিম মিঞার পানি পড়া খাইয়া মেয়ের কোনই উপকার হইল না। আস্তে আস্তে মেয়ে যেন নেতাইয়া পড়িতেছে। গায়ের সোনার বর্ণ কালো হইয়া গিয়াছে। বউ বলে, “এহন কি করবা? কেমুন কইরা আমার বড়ুরে বাল করবা?”
আজাহের ঘরের মেঝের মাটি খুঁড়িয়া একটি ঘট বাহির করিল। তাহা হইতে কতকগুলি সিকি, আনি, দুয়ানী বাহির করিয়া গামছায় বাঁধিল। বউকে বলিল, “তুমি উয়ারে লয়া বইস। আমি বন্দর ঐতে ডাক্তার লয়া আসি।”
বাড়ি হইতে বন্দর মাত্র দুই মাইল। এই পথ কি আজাহেরের শেষ হয়? চলিতে চলিতে তার হাত পা যেন ভাঙ্গিয়া আসিতেছে। বন্দরে তিনজন ডাক্তার। তারিণী ডাক্তার, সেন মশায় আর কাজী সাব। তার মধ্যে কাজী সাহেবেরই নাম ডাক বেশী। কলিকাতা হইতে পাশ করিয়া আসিয়াছে। আজাহের কাজী সাহেবের ডাক্তারখানায় যাইয়া কান্দিয়া ফেলিল। কাজী সাহেব বসিয়া বসিয়া একখানা বই পড়িতেছিলেন। বই হইতে মুখ তুলিয়া বলিলেন, “কি চাই?”
আজাহের বলিল, “আমার ম্যায়াডার ভেদবমি ঐত্যাছে, আপনি আইসা একবার দেইখ্যা যান।”
কাজী সাহেব বলিলেন, “ভেদবমী হচ্ছে। তবে ত এ কলেরা!”
আজাহেরের পরাণ ছ্যাত করিয়া উঠিল। কাঁদিয়া বলিল, “হুজুর, আপনি চলেন।”
কাজী সাহেব গম্ভীর হইয়া বলিলেন, “যেতে ত বলছ। ভিজিটের টাকা এনেছ?”
গামছার খোট হইতে সিকি, দুয়ানীগুলি কাজী সাহেবের টেবিলে রাখিয়া আজাহের বলিল, “আমার এহন জ্ঞান গিরাম নাই। এই আমার যা সম্বল আছে আপনারে দিলাম। আপনি দয়া কইরা চলেন।”
টেবিলের পয়সাগুলি গুণিয়া কাজী সাহেব বলিলেন, “মাত্র দুই টাকা চার আনা হ’ল মিঞা। আমার ভিজিট লাগে পাঁচ টাকা। আগে আর টাকা নিয়ে এসো, তখন যাব।”
আজাহের কাজী সাহেবের পা জড়াইয়া ধরে, “হুজুর! এই আমার আছে আপনি দয়া কইরা আমার ম্যায়াডারে দেইখ্যা আসেন। ম্যায়া সারলে আপনার টেহা আমি দিব।”
কাজী সাহেব পা ছাড়াইয়া লইয়া বলেন, “ও কথা কত জনই কয় কিন্তু অসুখ সেরে গেলে আর কারো পাত্তা পাওয়া যায় না। দেখ মিঞা! দয়ার কথা বলছ? একটা ডাক্তারী পাশ করতে কত টাকা খরচ করেছি জান? সেই টাকাটা ত উসুল করতে হবে। আমাকে দয়া দেখালে চলবে না।”
আজাহের বলে, “হুজুর! আমার ম্যায়াডারে দেইখ্যা আসেন। আল্লা আপনার দিগে চাইব। আমি রোজ নমাজ পইড়্যা আপনার জন্যি দোয়া করব।
কাজী সাহেব বলে, “আরে মিঞা! ওতে আমার মন ভেজে না। পঁচটাকা যদি দিতে পার, আমি যাব আর যদি না পার, আমার সময় নষ্ট করো না। দেখছ না আমি ডাক্তারী বই পড়ছি?”
আজাহের তবু হাল ছাড়ে না। “হুজুর! আপনার গরেও ত ছাওয়াল-ম্যায়া আছে। তাগো মুহির দিগে চায়া আমার ম্যায়াডারে দেইখ্যা আসেন। আল্লার আসমান নাইমা পড়বি আপনারে দোয়া করনের জন্যি। আমার কেবলই মনে ঐত্যাছে আপনি গেলি আমার। ম্যায়াডা বাল অবি।”
