“ভাল কতা কইছাও বউ। এইডাই কয়দিন কইরা দেহি।” বলিয়া আজাহের মোড়ল-বাড়ি হইতে কুড়াল আনিয়া জঙ্গলের মধ্যে গেল। যাইয়া দেখে তাহার ছেলে-মেয়ে । দুইটি আগেই আসিয়া সেখানে কি কুড়াইতেছে।
“ও বাজান! দ্যাহ আমরা কত স্যাজারের কাটা কুড়ায়া পাইছি। একরাশ সজারুর কাঁটা আনিয়া ছোট মেয়েটি বাপকে দেখাইল। বছির বলিল, “বাজান! এই দিক একবার চায়াই দেহ না কত গুয়া কুড়াইছি?”
“বেশতরে, অনেক গুয়া কুড়ায়া ফেলছাস। বাড়ির থইনে ঝকা আইন্যা এগুলা লয়া যা!”
ছেলে দৌড়াইয়া গেল কঁকা আনিতে। আজাহের কুঠার লইয়া একটি গাছের উপর দুই। তিনটি কোপ দিল। কুঠারের আঘাতে গাছটি কাঁপয়া উঠিল। গাছের ডালে কয়েকটি পাখি বিশ্রাম করিতেছিল, তাহারা করুণ আর্তনাদ করিয়া উড়িয়া চলিয়া গেল। আজাহেরের কুঠার কাপিয়া উঠিল। কুঠার মাটিতে রাখিয়া আজাহের সমস্ত গাছটির উপর একবার চোখ। বুলাইয়া লইল। কত কালের এই গাছ। বনের লতা জড়াইয়া পাকাইয়া এ-ডালের সঙ্গে ও-ডালে মিল করিয়া দিয়াছে। কত কালের এই মিতালী! শত শত বৎসরের মায়া-মমতা যেন লতা-পাতা শাখার মূক-অক্ষরে লিখিত হইয়াছে। অত শত আজাহের ভাবিতে পারিল কিনা জানি না। কিন্তু সামান্য গাছটির উপর চোখ বুলাইতে কি যেন মমতায় আজাহেরের। অন্তর আকুল হইয়া উঠিল। লক্ষ লক্ষ বৎসর পূর্বে মানুষ যখন বনে-জঙ্গলে বাস করিত, তখন এই গাছগুলি ছিল মানুষের দোসর। সেই আদিম প্রীতি তাহার অবচেতন মনে আঘাত করিল কিনা জানি না–গাছের যে স্থানটিতে সে কুঠারের আঘাত করিয়াছিল সে। স্থান হইতে টস্ টস্ করিয়া গাছের কস বাহির হইতেছে। আজাহের তাহা গামছার খেটে মুছিয়া দিয়া বলিল, “গাছ! তুই কান্দিস না। আর আমি তোগো কাটপ না।” এই গাছটির। মত সে নিজেও মূক। নিজের দুঃখ-বেদনা সে ভাষায় প্রকাশ করিয়া বলিতে পারে না। সেই। জন্য এই মূক-বৃক্ষের বেদনা সে বুঝি কিছুটা বুঝিতে পারে। কুঠার কাঁধে লইয়া আজাহের। সমস্ত জঙ্গলটার মধ্যে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।
কত কালের ভুলিয়া যাওয়া আপনজনের সান্নিধ্যে যেন সে আসিয়াছে। এ-গাছের আড়াল দিয়া ও-গাছের পাশ দিয়া লতাগুল্মের মধ্য দিয়া বনের সরু পথখানি আঁকিয়া বাকিয়া চলিয়া গিয়াছে। এই পথে কাহারা চলে! বন-রহস্যের এই মায়াবি অন্তরখানি যাহাদের কাছে কিঞ্চিৎ উদঘাটিত হয় তাহারাই বুঝি চলিয়া চলিয়া এই পথ করিয়াছে। এক জায়গায় যাইয়া আজাহের দেখিল, একটা গাছের ডালে চার পাঁচ জায়গায় মৌমাছিরা চাক করিয়াছে। কি বড় বড় চাক! চাক হইতে ফোঁটায় ফোঁটায় মধু ঝরিয়া পড়িতেছে। অন্য। জায়গায় আজাহের দেখিল, একটা গাছের খোড়লে কটায় বাসা করিয়াছে। তাহাকে দেখিয়া কটা পালাইয়া দূরে যাইয়া অপেক্ষা করিতেছিল। বাসায় চার পাঁচটি ছোট ছোট কালো বাচ্চা চিঁ চিঁ করিতেছে। বাচ্চাগুলিকে ধরিয়া আজাহের বুকের কাছে লইয়া একটু আদর করিল, তারপর অদূরবর্তী বাচ্চাদের মায়ের দিকে চাহিয়া অতি সন্তর্পণে সে তাহাদের গর্তের মধ্যে রাখিয়া অন্য পথ ধরিয়া চলিল। বনের পথ দিয়া সে যতদূর যায় তাহার তৃষ্ণা যেন মেটে না। যত সে পথ চলে বন যেন তাহার চোখের সামনে রহস্যের পর রহস্যের আবরণ খুলিয়া দেয়। এমনি করিয়া সারাদিন জঙ্গল ভরিয়া ঘুরিয়া আজাহের সন্ধ্যা বেলা গৃহে ফিরিয়া আসিল। বউ বলিল, “বলি কাঠ না কাটপার গেছিলা? তয় খালি আতে আইল্যা ক্যান?”
আজাহের তাহার উত্তরে কিছুই বলিল না। কি এক অব্যক্ত আত্মীয়তার মমতায় তাহার সকল অন্তর ভরপুর। তাহার এতটুকু প্রকাশ করিয়া সেই মনোভাবকে সে ম্লান করিতে পারে না।
সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে। আজাহের চাহিয়া দেখে উঠানের এক কোণে একটি ছোট্ট কটার বাচ্চা লইয়া তাহার ছেলে-মেয়েরা খেলা করিতেছে। “বাজান! দেইখ্যা যাও। আমরা জঙ্গল থইনে কটার বাচ্চা ধইর্যা আনছি।” ছোট মেয়ে বড়ু আল্লাদে ডগমগ হইয়া বাপকে আসিয়া বলিল।
“পোড়ামুখী! এ কি করছস? বুনো জানোয়ার, আহা ওগো মা-বাপ য্যান কতই কানত্যাছে।”
“বাজান! এডারে আমরা পালব। এরে উড়ুম খাইতে দিছি। একটু বাদে ভাত খাওয়াব।”
“কিন্তুক ওরা যে মার দুধ খায়। তোর কাছে ত ওরা বাঁচপ না।” আজাহের ভাবিল, কটার বাচ্চাটিকে লইয়া সে তাদের বাসায় দিয়া আসিবে। কিন্তু তখন অন্ধকার হইয়া গিয়াছে। সেই দুর্ভেদ্য জঙ্গলের পথ সে এখন চিনিবে না। আর চিনিলেও এখন সেখানে যাওয়া অবিবেচনার কাজ হইবে। বুনো শূকর আর বাঘ সেখান দিয়া এখন নির্ভয়ে বিচরণ করিতেছে। মেয়েটিকে সে খুব বকিল। তাহার বকুনীতে মেয়েটি কাঁদিয়া ফেলিল।
“ও বাজান! আমি ত জানতাম না কটার মা আছে। তারা ওর জন্যি কানব। তুমি বাচ্চাডিরে নিয়া যাও। ওগো বাসায় দিয়া আইস গিয়া।”
কিন্তু এ অনুরোধ এখন নিরর্থক। আজাহের বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল। ছোট কটার বাচ্চাটি চিৎকার করিয়া কাঁদিতেছে। ও যেন মূক-বনের আপন সন্তান। ওর কান্নায় সমস্ত বন আর্তনাদ করিয়া উঠিতেছে। সারা রাত্র কটার বাচ্চাটির চিন্তায় আজাহেরের ঘুম আসিল না। বারবার উঠিয়া যাইয়া বাচ্চাটিকে দেখিয়া আসে। শেষ রাত্রে উঠিয়া যাইয়া দেখিল বাচ্চাটি শীতে কাঁপিতেছে। আজাহের অতি সন্তর্পণে নিজের গামছাখানি বাচ্চাটির গায়ের উপর জড়াইয়া দিয়া আসিয়া আবার ঘুমাইয়া পড়িল। প্রভাত না হইতেই আজাহের জাগিয়া দেখিল, তাহার ছেলে-মেয়ে দুইটি বাচ্চাটিকে সামনে করিয়া কাঁদিতেছে। আজাহের আগাইয়া আসিয়া দেখিল সব শেষ হইয়া গিয়াছে। ফোঁটায় ফোঁটায় চোখের পানিতে আজাহেরের দুই গণ্ড ভিজিয়া গেল। মেয়ে বাপের গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল, “বাজান! আমরা যদি জানতাম, তা ঐলে বাচ্চাডারে এমন কইরা আনতাম না। আমাগো দোষেই বাচ্চাটা মইরা গ্যাল।”
