উত্তরে আজাহের কোন কথাই বলিতে পারিল না। কিন্তু তাহার মনে হইতে লাগিল আজ যেন তাহার কি এক সর্বনাশ ঘটিল। মহাজনে তাহার যথাসর্বস্ব লইয়া তাহাকে পথের ফকির বানাইয়াছে–কত লোকে তাহাকে ঠকাইয়াছে কিন্তু কোন দিন সে নিজকে এমন অসহায় মনে করে নাই। কটার মায়ের সেই অপেক্ষমান ম্লান মুখোনি বারবার আজাহেরের মনে পড়িতে লাগিল। অনেকক্ষণ বসিয়া থাকিয়া আজাহের কাল যে গাছটি কাটিতে গিয়াছিল সেই গাছটির তলায় একটি ছোট্ট কবর খুঁড়িয়া যেমন করিয়া মানুষ। মরিলে গোর-দাফন করে তেমনি করিয়া বাচ্চাটিকে মাটি দিল। জানাজার কালাম সে-ই পড়িল। তাহার ছেলে মেয়ে দুটি পিছনে দাঁড়াইয়া মোনাজাত করিল। তারপর সে বলিল, “জঙ্গল! আমার বাচ্চা দুইটা অবুঝ। তুমি ওগো মাপ কইর।”
ঐ কাজ সারিয়া কুঠার কান্ধে করিয়া আজাহের আবার বনের মধ্যে প্রবেশ করিল। ছেলে বছির সঙ্গে সঙ্গে চলিল। এক জায়গায় যাইয়া তাহারা দেখিল, গাছের তলায় কত টেকিশাক। ডগাগুলো লকলক করিতেছে। গ্রামের লোকেরা টেকিশাক বেশী পছন্দ করে না। কিন্তু শহরে এই শাক বেশী দামে বিক্রি হয়। বাবুরা কাড়াকাড়ি করিয়া এই শাক কিনিয়া লইয়া যায়। বাপ-বেটাতে মিলিয়া তাহারা অনেক ঢেকিশাক তুলিল। তারপর শাকগুলি গামছায় বাঁধিয়া আজাহের আরও গভীর জঙ্গলের দিকে রওয়ানা হইল। এক জায়গায় যাইয়া দেখিল, একটি কড়াই গাছ। তাহার কয়খানা ডাল শুখাইয়া কাঠ হইয়া গিয়াছে। আজাহের সেই গাছে উঠিয়া ডালগুলি ভাঙ্গিয়া তলায় ফেলিতে লাগিল। কড়াই গাছ। হইতে নামিয়া আজাহের একটি জামগাছে উঠিয়া আরও কতকগুলি শুকনা ডাল ভাঙ্গিল। তারপর নামিয়া ডালগুলি একত্র করিয়া লতা দিয়া বোঝা বাধিয়া মাথায় লইল। চেঁকিশাকগুলি গামছায় বাঁধিয়া গাছতলায় রাখিয়া দিয়াছিল। সেগুলি উঠাইয়া বছিরের মাথায় দিল। বাপ-বেটাতে বাড়ি ফিরিল, তখন বেলা একপ্রহর হইয়াছে। কাঠের বোঝা নামাইয়া আজাহের ছেলে-মেয়ে লইয়া তাড়াতাড়ি খাইতে বসিল। ভাতের হাঁড়ির দিকে চাহিয়া আজাহের দেখিল যে সবগুলি পান্তা-ভাত বউ তাহাদের পাতে ঢালিয়া দিয়াছে। নিজের জন্য কিছুই রাখে নাই। বউ-এর সঙ্গে অনেক ধস্তাধস্তি করিয়া সে নিজের মাটির সানকি হইতে অর্ধেকটা পরিমাণ ভাত তুলিয়া হাঁড়িতে রাখিল। তারপর অবশিষ্ট ভাতগুলিতে সানকি পুরিয়া পানি লইয়া তাহাতে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ ও লবণ মাখাইয়া শব্দ করিয়া গোগ্রাসে গিলিতে লাগিল। ভাতগুলি সে চিবাইয়া খাইল না। পাছে তাহারা পেটে যাইয়া অল্প সময়ে হজম হইয়া যায়। ভাত খাওয়া শেষ হইতে না হইতেই বউ তাহার হাতে হুঁকা আনিয়া দিল। দুই তিন টানে কার কলিকায় আগুন জ্বালিয়া নাকে মুখে ধুয়া ছাড়িয়া সমস্ত গৃহখানা অন্ধকার করিয়া দিল। লাকড়ির বোঝা মাথায় করিয়া আজাহের ফরিদপুরের বাজারে রওয়ানা হইল।
এই ভাবে মাসখানেক লাকড়ি বিক্রি করিয়া কোন ক্রমে তাহাদের দিন যাইতে লাগিল।
.
১৯.
সেদিন আজাহের হাটে যাইবে, ছেলে বছির বায়না ধরিল, “বাজান, আমিও হাটে যাব!”
–”তুই আটপার পারবি? কত দূরির পথ, আমার সুনা, আমার মানিক, তুমি বাড়ি থাহ।”
কিন্তু ছেলে কথা শুনে না–”না বাজান, আমি আটপার পারব।”
অগত্যা ছেলেকে সঙ্গে লইতে হইল। একটি ডালিতে দুই তিনখানা মৌমাছির চাক, সুপারী, কুমড়ার ফুল, কয়েকটা কলার মোচা সাজাইয়া আজাহের ছেলের মাথায় দিল। বাকের দুই ধারে আটকাইয়া সে কাঁধে করিয়া লইয়া চলিল কাঠের বোঝা।
এত দূরের পথ। মাথার উপর দুপুরের রৌদ্র খা খা করিতেছে। ছোট ছেলে বছির, চলিতে চলিতে পিছনে পড়িয়া থাকে। বাপ পথের মধ্যে দাঁড়াইয়া অপেক্ষা করে। এমনি করিয়া তাহারা বদরপুরের পাকা ইঁদারার কাছে আসিয়া বোঝা নামাইল। কয়া হইতে পানি তুলিয়া আজাহের নিজের চোখে মুখে দিল। ছেলেকে পানি খাওয়াইল। তারপর কিছুক্ষণ ঝাউ গাছের ঠাণ্ডা হাওয়ায় জিড়াইয়া আবার পথ চলিতে আরম্ভ করিল।
শহরের নিকটে আসিতেই ছোট ছেলে বছির শুনিতে পাইল, কোথায় যেন ঝড় বৃষ্টি হইয়া গর্জন করিতেছে। বছির বাপকে জিজ্ঞাসা করে, “বাজান, এই শব্দ কিসির?”
বাপ বলে, “আমরা ফরাতপুরির আটের কাছে আইছি।”
অজানা রহস্যের আবেশে বছিরের বুক দুরু দুরু করিতে থাকে। বছির আরও জোরে জোরে হাঁটে। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাহারা শহরে আসিয়া উপস্থিত হইল। গোয়াল চামটের পুল পার হইয়া বামে ঘুরিয়া দুই পাশের মিষ্টির দোকানগুলি ছাড়াইয়া মেছো বাজারের দক্ষিণ দিকের রাস্তায় আজাহের কাঠের বাকটি নামাইল। বছিরের মাথা হইতেও বোঝাটি নামাইয়া দিল। বাপের কাছে কতবার বছির ফরিদপুরের হাটের গল্প শুনিয়াছে। আজ সেই হাটে সে নিজে আসিয়াছে। কত লোক এখানে জড় হইয়াছে। বছির এত লোক একস্থানে কোথাও দেখে নাই। তাহাদের তাম্বুলখানার হাট এতটুকু, এক দৌড়ে ঘুরিয়া আসা যায়। কিন্তু ফরিদপুরের হাটে কত লোক! বছির যে দিকে চাহে শুধু লোক আর লোক। তাহাদের গ্রামের জঙ্গলের মত এও যেন মানুষের জঙ্গল। ইহার যেন কোথাও শেষ নাই।
সাদা ধবধবে জামা কাপড় পরিয়া ভদ্রলোকেরা আসিয়া আজাহেরের কাঠের দাম জিজ্ঞাসা করে, “কিরে, তোর এই কাঠের দাম কত নিবি?”
আজাহের বলে, “আজ্ঞা, পাঁচ সিহা।”
