গ্রামের লোকেরা যে যার মত বাড়ি চলিল। অনেকেরই শরীরে মৃদু জ্বরের কাঁপন অনুভূত হইয়াছে। কিন্তু সমস্ত ছাপাইয়া কি একটা গভীর বিষাদে যেন সকলের অন্তর ভরা। অতীত দিনের অন্ধকারতল হইতে মোড়ল আজ এই গ্রামের যে বিস্মৃত গৌরব-কথার খানিক প্রকাশ করিল, তাহার মৃদু স্পর্শ সকলকেই অভিভূত করিয়া তুলিতেছে।
.
১৮.
সন্ধ্যার কিছু আগেই লাঠি ভর দিয়া মোড়ল আজাহেরের নতুন বাড়ি দেখিতে আসিল। আসিয়া যাহা দেখিল, মোড়লও তাহাতে তাজ্জব বনিয়া গেল। বাঘার ভিটার মাঝখানে দু’খানা ঘর উঠিয়াছে। ঘরের পাশে ধরন্ত কলাগাছ। উঠানের একধারে জাঙলায় শ্রীচন্দনের লতা, তাহাতে রাশি রাশি শ্রীচন্দন ঝুলিতেছে। উঠানের অন্য ধারে লাল নটের খেত। কার যেন রাঙা শাড়িখানা রৌদ্রে শুখান হইতেছে।
“ছ্যামড়ারা তোরা ত যাদু জানস্ দেহি! এত সমস্ত কোন হেকমতে করলিরে তোরা?” কথা শুনিয়া সমস্ত লোক কলরব করিয়া মোড়লকে আসিয়া ঘিরিয়া দাঁড়াইল। মোড়ল-গিন্নী ঘরের ভিতর হইতে ডাকিল, “আমাগো বাড়ির উনি এদিক আসুক একটু।” ঘরের মধ্যে যাইয়া মোড়ল আরো অবাক হইয়া গেল। ঘরের চালার আটনে একটা ফুলচাঙ পাতা। তাহার সঙ্গে কেলীকদম্ব সিকা, সাগরফানা সিকা, আসমান তারা সিকা, কত রঙ বেরঙের সিকা ঝুলিতেছে। সেই সব সিকায় মাটির বাসন। ছোট ছোট (হড়ি) বাতাসে দুলিতেছে। ঘরের বেড়ায় কাদা লেপিয়া চুন-হলুদ আর আলো-চালের গুঁড়া দিয়া নতুন নকসা আঁকা হইয়াছে। মোড়ল বুঝিতে পারিল তাহার গৃহিণী সমস্ত গায়ের মেয়েদের লইয়া সারা দিনে এইসব কাণ্ড করিয়াছে। সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া মোড়ল খুব তারিফ করিল, “বলি তোমরাও ত হেকমত কম জান না?” শুনিয়া খুশীতে ঘরে উপবিষ্ট সমবেত মেয়েদের মুখ রঙীন হইয়া উঠিল। মোড়লের বউ তখন বলিতে লাগিল, “এই সিকাডা দিছে বরান খার বউ, এইডা দিছে কলিমদ্দীর ম্যায়া, আর এই সিকাডা দিছে মোকিমির পরিবার।”
মোড়ল বলিল, “বড় সুন্দর ঐছে। আমাগো গিরামে এমন কামিলকার আছে আগে জানতাম না।” বলিতে বলিতে মোড়ল বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল।
মোকিম বুড়ো তখন আসিয়া বলিল, “মোড়ল-বাই! তুমি না কইছিল্যা আজাহেরের বাড়ি আইজ খাইবা। সামান্য কিছু খিচুড়ী রান্না ঐছে। তুমি না বসলি ত ছ্যামড়ারা উয়া মুহি দিবি না।”
“তয় তোমরা কোনডাই বাহি রাহ নাই। আইজ বুঝতি পারলাম তোমাগো অসাদ্য কোনু কাম নাই,” বলিয়া মোড়ল আসিয়া খাইতে বসিল। খাওয়া দাওয়া শেষ হইলে যাহাদের ইতিমধ্যেই জ্বর আসিয়াছে তাহারা যাহার যাহার বাড়ি চলিয়া গেল; অবশিষ্ট লোকেরা একতারা দোতারা বাজাইয়া গান গাহিতে আরম্ভ করিল। প্রায় অর্ধেক রাত অবধি গান গাহিয়া যে যাহার বাড়িতে চলিয়া গেল। আজাহের নতুন ঘরে ছেলে-মেয়ে লইয়া ঘুমাইয়া পড়িল।
প্রভাত না হইতেই চারিধারের বন হইতে কত রকমের পাখি ডাকিয়া উঠিল। সেই পাখির ডাকে আজাহেরের ছেলে বছিরের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। এখনও ভাল মত সকাল হয় নাই। বছিরের কেমন যেন ভয় ভয় করিতে লাগিল। পাশেই তার ছোট বোন বড় অঘোরে ঘুমাইতেছে। সে বড়কে ডাকিয়া বলিল, “ও বড়ু উঠলি না? চল গুয়া কুড়ায়া আনি।” বড়ু। তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িল।
দুই ভাই-বোনে অতি সন্তর্পণে ঘরের দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিল। মা বাপ জাগিলে হয়ত এত ভোরে তাহাদের বাহিরে যাইতে দিবে না।
সুপারি গাছের তলায় আসিয়া দেখে, বাদুড়ে কামড়াইয়া কত সুপারি ফেলিয়া গিয়াছে। দুই ভাই-বোনে একটি একটি করিয়া সুপারি কুড়াইয়া এক জায়গায় আনিয়া জড় করিয়া ফেলিল। কড়াইতে কি আনন্দ!
“ওই একটা–ওই একটা, মিঞা বাই! তুমি ওদিক কুড়াও। এদিকটা আমার,” বলিয়া। বড়ু একটু জঙ্গলের মধ্যে গিয়াছে, অমনি একটা বন-সজারু সামনে দেখিয়া, চীৎকার করিয়া উঠিল, “ও মিঞা বাই! এইডা যেন কি?”
বছির দৌড়াইয়া আসিয়া বলিল, “বড়ু! ডরাইস না। ওডা সজারু। আয় দেহি, জঙ্গলের মদ্দি সজারুর কাটা আছে কিনা। সজারুর কাঁটা দিয়া বেশ খেলা করা যায়।” দুই ভাই-বোনে তখন জঙ্গলের মধ্যে সজারুর কাটা খুঁজিতে লাগিল।
এদিকে আজাহের ঘুম হইতে উঠিয়া ভাবিতে বসিল। নতুন বাড়ি ত তাহার হইল। কিন্তু তাহারা খাইবে কি! অবশ্য সাত আট দিনের আন্দাজ চাল ডাল মোড়ল গিন্নী দিয়া গিয়াছে। তাহা ফুরাইতে কয়দিন? পরের কাছে চাহিয়া চিন্তিয়া কয়দিন চালান যাইবে? ভাবিয়া ভাবিয়া আজাহের কিছুই ঠিক করিতে পারিতেছিল না। আবার কি সে আগের মত জন খাঁটিয়া মানুষের বাড়িতে কাজ করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিবে? কিন্তু যেখানে লোকে তাহাকে এত আদর-যত্ন করিয়াছে তাহাদের বাড়িতে জন খাঁটিতে গেলে কি সেই খাতির থাকিবে? আর জন খাঁটিয়া যাহারা খায় গ্রামের লোকেরা তাহাদিগকে সম্মানের চোখে। দেখে না। আজাহের ভাবিল, আজ যদি তাহার গরু দুইটি থাকিত তাহা হইলে সে লাঙ্গল লইয়া খেত চষিতে পারিত। কিন্তু খেত চষিতে গেলেও বীজধান লাগে! আর খেতে ধান ছড়াইয়া দেওয়া মাত্রই তো ফসল ফলে না। বউকে ডাকিয়া জিজ্ঞাস করে, “কও ত এহন কি কাম করি?”
বউ ভাবিতে বসে। অনেক ভাবিয়া বলে, “আমি একটা কতা কইবার চাই। এহানকার জঙ্গলে কত কাঠ। তুমি কাঠ ফাঁইড়া খড়ি বানায়া ফইরাতপুরির বাজারে নিয়া বিককিরি।
