মহাজনের খাতাগুলি আবার নানা ধরনের। যাহারা তামা-কাসা বন্ধক রাখিয়া অল্প টাকা লয় তাহাদের জন্য এক খাতা, যাহারা সোনা-রূপা বন্ধক দিয়া টাকা লয় তাহাদের জন্য এক খাতা, যাহারা কোনকিছু বন্ধক না দিয়াই টাকা কর্জ করে তাহাদের জন্য এক খাতা, আবার যাহারা মহাজনের বাড়িতে তিন বৎসর খাঁটিয়া যাইবে এই অজুহাতে বিনা সুদে টাকা কর্জ করিয়াছে তাহাদের জন্য এক খাতা।
মহাজনের টাকা আবার নানা নামে খাটে।
কতক টাকা কর্জ দেয় স্ত্রীর নামে, সেই কবে স্ত্রী বউ হইয়া ঘরে আসিয়াছিল, তখন মহাজনের পিতা দশটি টাকা দিয়া নববধূর মুখ দর্শন করিয়াছিলেন, আজ সেই টাকা সুদে ফাপিয়া দশ হাজার টাকায় পরিণত হইয়াছে। তার ছেলে শহরে যাইয়া পড়াশুনা করে। জলপানের টাকা হইতে বাঁচাইয়া সে পিতার নিকট সুদে খাটাইবার জন্য পাঁচ টাকা দিয়াছিল তিন বৎসর আগে। তাহাও এখন সুদে ফঁপিয়া তিনশত টাকায় পরিণত হইয়াছে। এইভাবে নানা তহবিল হইতে মহাজনকে নানা প্রকারের টাকা কর্জ দিতে হয়।
ইহা ছাড়া জমা উসুল বকেয়া, পূজার বৃত্তি, পুণ্যার বৃত্তি আরও কত রকমের জটিল। হিসাব তাহাকে রাখিতে হয়। মহাজনের গদীর অর্ধেক স্থান জুড়িয়া কেবল খাতার উপরে খাতা। কিন্তু এতসব খাতাতে দিনের পর দিন চার পাঁচজন গোমস্তা বসিয়া শুধু কলমের খোঁচায় যে অঙ্কের উপর অঙ্কের দাগ বসাইয়া যাইতেছে, তাহার সবগুলি অক্ষর মহাজনের কণ্ঠস্থ। যদি বা কখনো এতটুকু ভুল হইবার উপক্রম হয় পাশের গোমস্তারা তাড়াতাড়ি করিয়া তাহা সংশোধন করিয়া দেয়।
সাহাপাড়া আসিয়া আজাহের দেখিল লোকে লোকারণ্য। আশেপাশের নানা গ্রাম হইতে চাষী মুসলমান ও নমঃশূদ্রেরা এখানে আসিয়া ভীড় করিয়াছে। কেহ টাকা কর্জ লইয়া হাসিতে হাসিতে বাড়ি যাইতেছে। কেহ কর্জ টাকা দিতে আসিয়া সুদের অঙ্ক শুনিয়া মহাজনের পা ধরিয়া কঁদিতেছে, কেহ বউ-এর গহনা আনিয়া মহাজনের গদিতে ঢালিয়া দিতেছে। মহাজন নিক্তিতে করিয়া অতি সাবধানে সেই সোনা-রূপার গহনা মাপিয়া লইতেছে।
এইসব দেখিতে দেখিতে আজাহের শরৎ সাহার বাড়িতে আসিয়া উপস্থিত হইল। শরৎ সাহার বাড়িতে লোকজনের ভীড় খুব কম। কারণ কুলোকে বদনাম রটাইয়াছে “চীনা জেঁকে ধরিলেও ছাড়িয়া যায় কিন্তু খাতকের শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকিতে শরৎ সাহা ছাড়ে না।” এত যে তার টাকা, কিন্তু সকালে একমুঠো চাউল মুখে দিয়া সে জলযোগ করে। বাজার যখন ভাঙ্গি ভাঙ্গি করে তখন শেষ বাজারে শরৎ সাহা যাইয়া পচা পুঁটিমাছ অথবা টাকিমাছ কিনিয়া আনে। এজন্য গৃহিণীর সঙ্গে তাহার প্রায়ই ঠোকাঠুকি লাগে।
বড় মেয়েটিকে বিবাহ দিয়াছে মানিকগঞ্জ গ্রামে। কাল জামাই আসিয়াছিল। এই খবর পাইয়াই শরৎ সাহা খিড়কীর দরজা দিয়া ভাঙ্গা ছাতির আড়াল করিয়া সেই যে সকাল বেলা তাগাদা করিতে ভাটপাড়ার গ্রামে গিয়াছিল আর ফিরিয়া আসিয়াছে রাত বারোটার সময়। শ্বশুরবাড়িতে দুপুর বেলায় শুকনো ডাটার ঝোল আর পচা আউস চাউলের ভাত খাইয়া জামাই চলিয়া গিয়াছে। অতরাত্রে বাড়ি আসিয়া গৃহিণীকে ঘুমাইতে দেখিয়া আহ্লাদে শরৎ সাহার নাচিতে ইচ্ছা করিতেছিল। গৃহিণী জাগিয়া থাকিলে নথ-নাড়া দিয়া বকিতে বকিতে তাহাকে সারা রাত্রি ঘুমাইতে দিত না। না হয় সে সারাদিন খায় নাই কিন্তু রাত্রটা ত সে ঘুমাইতে পারিবে। এই আনন্দে কলসী হইতে তিন গ্লাস জল লইয়া এক মুঠি চাউলসহ গলাধঃকরণ করিয়া সে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু সকাল বেলা উঠিয়া গৃহিণীর হাত হইতে সে নিস্তার পায় নাই। যতই সন্ধ্যা আহ্নিক করার অজুহাতে সে মালা-চন্দন লইয়া জপে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করিয়াছে গৃহিণীর ঝঙ্কার ততই উদারা মুদারা ছাড়াইয়া তারায়–পঞ্চমে উঠিয়াছে।
পরে গৃহিণীর জ্বালায় অস্থির হইয়া সে বলিয়াছে,”ভাল মানুষীর বউ। একটু মন দিয়া শোন। জামাইর সঙ্গে যদি আমি দেখা করতাম তবে বাজারে যেতে হত। বড় একটা রুইমাছ না হলেও অন্ততঃ দেড় টাকা দিয়ে একটা ইলিশমাছ কিনতে হত। দুধও আনতে হ’ত। বলত পাঁচ টাকার কমে কি বাজার করতে পারতাম? আমার বুকের হাড্ডির মত এই পঁচটা টাকা বাজারে নিয়ে ঢেলে দিয়ে আসতে হত। এই পাঁচটাকা সুদে খাটালে পাঁচ বছরে দুশো টাকা হবে। দশবছরে হাজার টাকা হবে।”
গৃহিণী ঝঙ্কার দিয়া উত্তর করিয়াছে, “ওরে মুখ-পোড়া! টাকার প্রতি যদি তোর এত দরদ তবে মেয়ের জন্ম দিয়েছিলি কেন? শ্বশুর বাড়িতে শুকনো ডাটার ঝোল খেয়ে জামাই আমার মেয়েকে যখন খোটা দিবে তখন কি তোর টাকা তার উত্তর দিতে যাবে? আজ পাঁচ বচ্ছর মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছি, একখানা পান-বাতাসা হাতে করে মেয়েটাকে দেখতে গেলে না! মেয়েকে আনার নাম করলে ত চোখ চড়ক গাছ।”
শরৎ সাহা এবার রাগিয়া উত্তর করিয়াছে, “সব কাজেই কেবল তোমার খরচ করবার। মতলব। কিসে দু’টো পয়সা আসে সে দিকে খেয়াল নেই। ছিলে ত গরীব বাপের বাড়ি, এক বেলাও আখায় হাঁড়ি চড়তো না!”
তারপর গৃহিণীর সঙ্গে শরৎ সাহার যে ধরনের কথাবার্তা হইয়াছে পৃথিবীর কোন ভাষা তাহা ধরিয়া রাখিবার শক্তি রাখে না। নিতান্ত সাধারণ রুচির কষ্টিপাথরে ঘষিয়া মাজিয়া তাহার কিঞ্চিৎ আমরা লিপিবদ্ধ করিলাম।
“কি! তুমি আমার বাপের খোটা দিয়ে কথা বল? বলি ও যুয়ান কি শোগা! তোর মত বুড়ো শুশানের-মড়ার সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়ে আমার বাপ-মা যে তোকে সাতকুলে উঠিয়েছে তা কি তোর মনে নেই? তোর ঘরে খেটে খেটে আমি জীবন ক্ষয় করলাম, একদিন একখানা ভাল শাড়ী কারে কয় দেখলাম না।”
