আজাহের ফ্যাল ফ্যাল করিয়া অছিমদ্দীর অপূর্ব ঐশ্বর্য্যের পানে চাহিয়া বিসায়ে অবাক হইয়া রহিল।
সেই টাকা হইতে গণিয়া গণিয়া অছিমদ্দী কুড়ি মণ পাটের দাম নব্বই টাকা আজাহেরের হাতে খুঁজিয়া দিল।
এত টাকা একসঙ্গে পাইয়া খুশীতে আজাহেরের ইচ্ছা করিতেছিল, অছিমদ্দী বেপারীর পায়ের কাছে লুটাইয়া ছালাম জানায়। সে যেন নিতান্ত অনুগ্রহ করিয়াই তাকে টাকাগুলি দিয়া গেল। পাটগুলি যে লইয়া গেল সে যেন একটা তুচ্ছ উপলক্ষ মাত্র।
বেপারী চলিয়া গেলে বউ ঘরের মধ্য হইতে আসিয়া আজাহেরকে বলিল, “বলি, আমাগো বাড়ির উনি এত বোকা ক্যান? সে দিন মাইপা পাট ঐল ছাব্বিশ মণ আর আজই বেপারী আইসা সেই পাট মাইপা কুড়ি মণ করল। ও-বাড়ির মেনাজদ্দী মোড়লেরে ডাইকা আইনা পাটের একটা বুঝ কইরা নিলি ঐত না?”
“বাল কই কইছ তুমি। আমার উয়া মনেই আসে নাই। যাক–খোদা নছিবে যা লেখছে তাই ত আমি পাব। এর বেশী কিডা দিবি।”
এ কথার উপরে আর কথা চলে না। তবু বউর মনটা খুঁৎখুঁৎ করিতেছিল।
বউকে খুশী করিবার জন্য আজাহের বলিল, “আইজই রহিমদ্দী কারিকরের বাড়ি ত্যা তোমার জন্যি একখানা পাছা পাইরা শাড়ী কিন্যা আনিগা।”
বউ বলিল, “আমার শাড়ীর কাম নাই। আগে শরৎ সাহার কর্জ টাহাডা দিয়া আসুক গিয়া।”
“বাল কতাই কইছ তুমি। আমি এহনি যামু শরৎ সহর বাড়ি।”
গোটা তিরিশেক টাকা কোমরে বাধিয়া বাকি টাকাগুলি আজাহের ঘরের মেঝেয় গর্ত খুঁড়িয়া একটা হাড়িতে পুরিয়া তাহার মধ্যে পুঁতিয়া রাখিল। বউ তাড়াতাড়ি সেই গর্তটি মাটি দিয়া বুজাইয়া তাহার উপরটা লেপিয়া ফেলিল।
.
০৫.
দুপুরের রোদে আজাহের সেই কোমরে বাধা টাকাগুলি লইয়া শরৎ সাহার বাড়ির দিকে রওয়ানা হইল।
আলীপুরের ওধারে সাহা পাড়া। হালটের দুইধারে বড় বড় টিনের ঘরওয়ালা বাড়িগুলি। আম, জাম, কাঁঠালগাছগুলি শাখা বাহু বিস্তার করিয়া এই গ্রামগুলিকে অন্ধকার করিয়া রাখিয়াছে। হালটের পথে সাহাদের সুন্দর সুন্দর ছেলেমেয়েগুলি খেলা করিতেছে। তাহাদের প্রায় সকলের গলায়ই মোটা মোটা সোনার হার। কাহারো বাহুতে সোনার তাবিজ বাধা। কপালে সিঁদুর পরিয়া কাঁখে পিতলের কলসী লইয়া দলে দলে সাহা গৃহিণীরা নদীতে জল আনিতে যাইতেছে। তাহাদের কাখের ঘসামাজা পিতলের কলসীর উপর দুপুর বেলার রৌদ্র পড়িয়া ঝকঝক করিতেছে। সাহারা এই অঞ্চলে সবচাইতে অবস্থাপন্ন জাতি, কিন্তু পানীয় জলের জন্যে মুসলমানদের মত তাহারা বাড়িতে টিউবওয়েল বা পতাকুয়া বসায় না। তাহাদের, মেয়েরাই নদী হইতে জল লইয়া আসে। সেই জন্য গ্রামে কলেরা হইলে আগে সাহা পাড়ায় আরম্ভ হয়। নানা রকমের সংক্রামক রোগে তাই ধীরে ধীরে উহাদের বংশ লোপ পাইতে বসিয়াছে।
পূর্বে সাহারা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য দেশে-বিদেশে গমন করিত। এদেশের মাল ও-দেশে লইয়া গিয়া, ও-দেশের মাল এ-দেশে আনিয়া তাহারা দেশের সম্পদ বাড়াইত। পল্লী-বাংলার অনেকগুলি রূপরেখা তাই সাহা, সাধু-সওদাগরদের কাহিনীতে ভরপুর। আজও পল্লী গ্রামের গানের আসরগুলিতে গায়কেরা কত সাধু-সওদাগরের, শখ-বণিকের দূরের সফরের কাহিনী বর্ণনা করিয়া শত শত শ্রোতার মনোরঞ্জন করে। কবে কোন নীলা-সুন্দরীর মাথার কেশে-লেখা প্রেম-লিপি পড়িয়া কোন সাহা বণিকের ছেলে সুদূর লঙ্কার বাণিজ্যে বসিয়া বিরহের অশ্রুবিন্দু বিসর্জন করিয়াছিল, তাহার ঢেউ আজো গ্রাম্য-রাখালের বাঁশীতে রহিয়া রহিয়া বাজিয়া উঠে।
কিন্তু কিসে কি হইয়া গেল! সাহারা আয়াসপ্রিয় হইয়া পড়িল। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের অদুনা পদুনার শাড়ীর অঞ্চল ছাড়িয়া তাহারা আর সংগ্রাম-সঙ্কুল বিদেশের বাণিজ্যে যাইতে চাহিল না। পুব বাংলার দেশ-বিদেশের বাণিজ্য-ভার সাহাদের হাত হইতে সরিয়া গিয়া বিদেশী মাড়োয়ারী এবং অন্যান্য জাতির উপর পড়িল। নানা বিলাস ব্যসনে ডুবিতে ডুবিতে তাহারা লাভ-মূল সবই খোয়াইল। বাংলার সাহা সমাজ কুসীদজীবীতে পরিণত হইল। সামান্য ব্যবসা-বাণিজ্য যা তাহারা করে তাহাও নামে মাত্র। এখন তাহাদের মুখ্য ব্যবসা মূর্খ গেঁয়ো চাষীদের মধ্যে উচ্চহারের সুদে টাকা খাটান।
সাহাদের প্রত্যেক বাড়িতে একখানা করিয়া বৈঠকখানা। সেই বৈঠকখানার একধারে চৌকি পাতা। তাহার উপরে চাদর বিছান। তারই এক কোণে কাঠের একটি বাক্স সামনে করিয়া বাড়ির মূল মহাজন বসিয়া থাকেন। পাশে দুই একজন বৃদ্ধ বয়সের গোমস্তা। ডানাভাঙ্গা চশমায় সূতো বাধিয়া কানের সঙ্গে আঁটকাইয়া তাহারা বড় বড় হিসাবের খাতা লেখে। মূল মহাজন মাঝে মাঝে কানে কানে কি বলিয়া দেন। তাহারা ইসারায় সায় দিয়া আবার খাতা লেখায় মনোনিবেশ করে। মহাজনের মাথার উপর গৌরাঙ্গদেবের সন্ন্যাসের ফটো। তারই পাশে নামাবলি গায়ে হরিনাম জপ-রত মহাজনের গুরুঠাকুর বা পিতৃদেবের ফটো। তাহার উপরে চন্দনের ফোঁটা। প্রতিদিন সকালে বিকালে ধূপ ধুনা দিয়া সেখানে নত হইয়া মহাজন পূজা করেন। এই সমস্ত উপকরণই যেন তার কুসীদজীবী নিষ্ঠুর জীবনের মর্মান্তিক উপহাস। ঘরের চৌকির ওপাশের মেঝে লেপাপোছা। একধারে কতকগুলি ছালা গোটান। সমবেত খাতকেরা এবং টাউটেরা সেই ছালার উপরে বসিয়া নানা রকমের চাটুবাক্য বলিয়া মহাজনের মনস্তুষ্টি করিবার চেষ্টা করে। একপাশে একটি আগুনের পাতিল। তাহা হইতে ঘুটার ধুয়া উঠিতেছে। তারই পাশে চার পাঁচটি পিতল বাধান তেলো হুঁকো। তাহার একটি ব্রাহ্মণের জন্যে, একটি কায়স্থের জন্য, একটি মূল মহাজনের জন্যে। সমবেত মুসলমান খাতকদের জন্য কোন হুঁকো নাই। তাহারা কলিকায়ই তামাক সেবন করে।
