“শাড়ীরই যদি দরকার তবে তোমার বাপ-মা তোমাকে তাঁতীদের বাড়ি বিয়ে দিল না। কেন?”
“তাও যদি দিত আমার শত গুণে ভাল হ’ত। তোর বাড়িতে এসে কোনদিন একটা মিষ্টি কথা শুনতে পেলাম না। দিনরাত তোর শুধু টাকা, টাকা, টাকা। বলি ও গোলামের নাতি! সারাদিন টো টো করে ঘোরো খাতকের পাড়ায় পাড়ায়, আর বাড়িতে এসে মহাজনি খাতা সামনে করে মরা-খেকো শকুনের মত বসে থাকো। বলি ও কুড়ের নাতি!–তোর ঐ খাতা পত্তর আজ আমি উনুনে দিয়ে পুড়িয়ে ফেলব।”
“আহা হা গিন্নি রাগ করো না। এই খাতা পত্তরগুলো হ’ল আমার বুকের পাজর। ওর পাতা ছিড়লে আমি বাচবো না। একটা কথা শোন–লোকে বলে শরৎ সাহা খায় না। তার শরীরে বল নেই। কিন্তু আমার বল যে ওই হিসাবের খাতাগুলো। ও গুলো দিনে দিনে। যত বাড়ে আমার বুকের তাগতও তত বাড়ে, একথা কেউ জানে না। এই খাতাগুলোর জোরে আজ আমি দশগ্রামের মধ্যে একটা কেউকেটা। আমার হুকুমে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়। তোমার যে দশটাকা ভাটপাড়া গাঁয়ে সুদে খাঁটিয়েছিলাম, চার বছরে তা বেড়ে একশ টাকা হয়েছে। কাল সেই টাকাটা পেয়েছি।”
“দাও তবে আমার সে টাকা। সেই টাকা দিয়ে আমি মেয়ের বাড়িতে তথ্য পাঠাব।”
“এইত, এই তুমি একটা নামাঙ্কুলের মত কথা বললে। টাকা কি আমি বাড়িতে নিয়ে এসেছি? তখন তখনই টাকাটা অপরের কাছে সুদে লাগিয়ে এলাম। বাড়িতে যদি নিয়ে আসতাম, সারারাত তাই পাহারা দিতে ঘুম আসত না। লোকে বলে, শরৎ সাহা লাখপতি না কোটীপতি, কিন্তু বাপের নাম করে প্রতিজ্ঞা করে বলতে পারি–জীবনে কোনদিন একত্রে পাঁচশত টাকার মুখও দেখি নি!”
“তবে তোমার অত মুরাদ কিসের?”
“আরে গিন্নি–একটু মনোযোগ দিয়ে শোন। আমার লাখ টাকা আছে না কোটী টাকা আছে তা তোমাকে দেখাতে পারব না, কিন্তু আমার সারাটি জীবন ভরে পাওনাগণ্ডার হিসাব লিখে যত সব খাতা পত্তর লিখেছি তা মাটিতে বিছিয়ে দিলে গয়া, কাশী, বৃন্দাবন পর্যন্ত সমস্ত পথ আমি মুড়ে ফেলতে পারি। টাকা, টাকা, টাকা! টাকা ঘরে এনে কি হবে! টাকায় টাকা আনে। সেই জন্য টাকা ছড়িয়ে দিয়েছি। আমার পাঁচ’শ ঘর খাতক আছে সুন্দরবন অঞ্চলে। হাজার ঘর খাতক আছে বঙ্গোপসাগরের ওপারে কুতুবদিয়ার চরে। দশ হাজার খাতক আছে সন্দ্বীপে, ভাটপাড়া, মুরালদাহ, কত গ্রামের নাম তোমাকে বলবো। মুন্সীগঞ্জে ইকিড়ি মিকিড়ি কথা বলে, বেদের দল, নায়ে নায়ে ঘুরে বেড়ায়, সেখানে আছে আমার বিশ হাজার খাতক। আর তুমি গিন্নি। তুলসীতলায় পেন্নাম করে আমার জন্য। দেবতার আশীর্বাদ এনো। আর যদি কুড়ি বছর বেঁচে থাকি তবে কৃষ্ণের গোলকখানি আমার খাতকে ভরে যাবে। জান গিন্নি সাধে কি লোকে বলে আমার নাম শরৎ সাহা!”
“পাড়ার লোকেরা বলে কি জান? সকাল বেলা উঠে তোমার নাম যদি মুখে আসে তবে সেদিন তাদের আহার জোটে না। কঞ্জুস যক্ষ কোথাকার! আমার কাশি দিয়ে রক্ত পড়ছে কতদিন। লোকে বলে যক্ষ্মা হয়েছে। আমার জন্য একফোঁটা ঔষধ কিনে আনলে না?”
“তোমাকে না বলেছিলাম রামেরাজকে ডেকে জল পড়িয়ে খেও। তা খাওনি? তোমার কেবল টাকা খরচের দিকে মন?”
“রামেরাজের পড়া জল ত কত খেলাম কিন্তু আমার অসুখ একটুও কমলো না। দেখ, তোমার পায়ে পড়ি, আমাকে একটু ভাল ঔষধ আনিয়ে দাও।”
“দেখ গিন্নি! টাকা পয়সা খরচের দিকে তুমি কিছুতেই আমাকে নিতে পারবে না। তোমার আগে আমি আরও দুই বিয়ে করেছিলাম। বড় জন বড়ই সুন্দরী ছিল। সান্নিপাতিক জ্বর হ’ল, মরে গেল, পয়সা খরচ করে ডাক্তার দেখালাম না। তারপর যিনি এলেন, তার ছিল বড় ঝুঁজ, এই তোমারই মতন, একদিন সিন্দুকের চাবি চুরি করে টাকা বের করে তার বাপকে দিয়েছিল। আমি তার মুখে কলকে পোড়া দিয়ে ছাপ লাগিয়ে দিয়েছিলাম। সেই লজ্জায় সে গলায় দড়ি দিয়ে মরল।”
“তারা মরে সকল জ্বালা জুড়িয়েছে। ওগো তোমার পায়ে পড়ি, তুমি আমাকে গলাটিপে মেরে ফেল। তোমার মত কঞ্জুসের ঘর করার চেয়ে আমার মরাও ভাল। বলি ও মরা কাঠ! তোর ঐ টাকা কে খাবে? আমার এমন সুন্দর ছেলেটি পাঁচ বছর বয়সে বাড়ির এখানে সেখানে হরিণের মত ঘুরতো। ওলাউঠা ব্যারাম হোল। বিনা চিকিৎসায় মারা গেল। পয়সা খরচ হবে বলে একজন ডাক্তার এনে দেখালে না।”
এমন সময় বাহিরে গলা খেকর দিয়া আজাহের ডাক ছাড়িল, “সা-জী মশায় বাড়ি আছেন নাকি?”
আজাহেরের কণ্ঠস্বর শুনিয়া গৃহিণী অন্দরে চলিয়া গেল।
বস্তুতঃ গৃহিণীর সঙ্গে উপরোক্ত বাক্যালাপ করিয়া শরৎ সাহার মেজাজ খারাপ হইয়া পড়িয়াছিল কিন্তু খাতকের কণ্ঠস্বর যেন বাঁশীর স্বরের মত, তাহাকে আপন মূর্তিতে প্রতিষ্ঠিত করিল।
০৬-১০. সা-জী মশায়
০৬.
“বলি, সা-জী মশায়! বাড়ি আছেন নাকি?”
“এই দুপুর বেলা কে এল? আজাহের নাকি?”
“স্যালাম কর্তা স্যালাম।”
“স্যালাম, স্যালাম;–তা কি মনে করে আজাহের?”
“এই আইলাম কর্তা, আপনার টাহা কয়ডা দিবার জন্যি।”
“বটে! এরই মধ্যে টাহা জোগাড় করে ফেললি! তুই ত কম পাত্র নস রে!”
“হে কর্তা! আজই পাট বেচলাম কিনা। তা ভাবলাম আপনার টাহা কয়ডা দিয়া আসি।”
“তা কত টাকা বেচলি?”
“এই বেশী নয় সা-জী মশায়। চাইর কুড়ি টাহা।”
সা-জী মশায় এবারে চেয়ারের উপর একটু ঘুরিয়া বসিলেন। আজাহের মাটির উপর একখানা ছালা টান দিয়া তাহার উপর বসিল।
