আব্দুস সাত্তার মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে ফুফুআম্মার জিদে ব্যবসা দেখাশোনা করছে। ছোট বোনের বিয়ে ও পা ভেঙে যাওয়ার কারণে প্রায় পাঁচ মাস অফিসে যেতে পারে নি। তাই মা দেশের বাড়িতে চলে যাওয়ার পর নিয়মিত অফিস করছে। এতদিন অফিস না করায় প্রচুর কাজের চাপে তাসনিমকে দিনে সময় দিতে পারে নি। তবে রাতে ফোনে আলাপ করে।
একদিন আলাপ করার সময় তাসনিম বলল, তোমার কথা আব্বুকে বলেছি। আলাপ করার জন্য নিয়ে আসতে বলেছে। কবে আসবে বল।
আমি কবে যাব বললে তো হবে না। তোমার আব্ব ব্যস্ত মানুষ। যখন যাব। তখন যদি উনি বাসায় না থাকেন? তা ছাড়া একটা অজানা অচেনা ছেলেকে। দারোয়ান ঢুকতে দেবে কী?
তাসনিম হেসে উঠে বলল, দারোয়ানের চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। শোন, পরশু শুক্রবার। ঐদিন তোমার আসার কথা বলে আব্বকে বাসায় থাকতে বলব। কি বলে না বলে কাল রাতে জানাব।
তা জানিও। তবে শুক্রবার উনি যেতে বলুন আর নাই বলুন, তুমি কিন্তু কাল সকালে আসবে। কিছু আলাপ করব। এবার রাখি খুব টায়ার্ড লাগছে, ঘুমাব।
কী ব্যাপার বলতো? কয়েকদিন থেকে লক্ষ্য করছি, ফোন করতে না করতে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়?
এই কয়েকদিন যে খুব পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
তাসনিম অবাক হয়ে বলল, খুব পরিশ্রম করতে হচ্ছে মানে?
বারে, এত পড়াশোনা করলাম বসে থাকার জন্য নাকী? তুমি চী চাও না, তোমার স্বামী বেকার না থেকে কিছু কাজকর্ম করুক?
আমি সে কথা জানতে চাই নি। জানতে চাচ্ছি; সারাদিন এমন কী কাজ কর, যে জন্য রাতে এত টায়ার্ড হয়ে পড়?
কাল সকালে এস, সারাদিন কি কাজ করি বলব।
ঠিক আছে, আসব।
আব্দুস সাত্তারের খুব ঘুম পাচ্ছিল। হাই তুলে “লা হাউলা ওয়া কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” পড়ে বলল, এবার রাখি তা হলে?
তাসনিম বুঝতে পারল, সত্যিই ও খুব টায়ার্ড। বলল, তোমাকে আর কষ্ট দেব না। তারপর সালাম বিনিময় করে লাইন কেটে দিল।
.
আজ সকালে নাস্তা খাওয়ার সময় রোকন উদ্দিন সাহেব বড় মেয়েকে বললেন, কই রে মা, অল রাউন্ডার ছেলেটাকে নিয়ে এলি না যে? এখনও সুস্থ হয় নি?
আব্বুর কথা শুনে সায়মা হেসে উঠল।
কি রে মা, তুই আবার হাসছিস কেন?
হাসি থামিয়ে সায়মা বলল, তুমি আব্দুস সাত্তারকে অলরাউন্ডার বললে কেন? ক্রিকেট প্লেয়ারদের মধ্যে যারা ভালো ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং করতে পারে, তাদেরকে তো অল রাউন্ডার বলে।
তুই বুঝি খুব ক্রিকেট খেলা দেখিস?
শুধু আমি নই, আপুও।
তা কোন দেশের টিম তোদের ফেভারিট?
আমার দক্ষিণ আফ্রিকা। আপুর পাকিস্তান। তবে এ বছর পেপসি কাপে পাকিস্তানের খেলা দেখে পাকিস্তান টিম আমারও ফেভারিট হয়ে গেছে। শোয়েব আখতারের বোলিং ও অলরাউন্ডার ওয়াসিম আকরামের জন্য পাকিস্তান মনে হয় এবারের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ান হবে।
রোকন উদ্দিন সাহেব এবার বড় মেয়েকে বললেন, তুই কী বলিস? এ বছর বিশ্বকাপে পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ান হতে পারবে?
তাসনিম বলল, আমি সাত আট বছর ক্রিকেট খেলা দেখছি। আমার ধারণা, এই খেলাটা সম্পূর্ণ ভাগ্যের ব্যাপার। কখন কোন টিম জিতবে আর কখন হারবে, বলা খুব কঠিন। তবে এ বছর বিশ্বকাপের ব্যাপারে সায়মার সাথে আমি একমত।
তোরা নিজের দেশের টিমের ব্যাপারে কিছু বললি না যে?
আমরা নিজের দেশের টিমকে খুব ভালবাসি। এ বছর বিশ্বকাপে খেলতে গেছে জেনে গর্ববোধ করছি। যখন ভালে খেলবে এবং চ্যাম্পিয়ান হবে তখন শুধু নিজের দেশের টিমই ফেভারিট হবে।
ছেলেটার নাম আব্দুস সাত্তার বললি না?
হ্যাঁ।
আব্দুস সাত্তার ক্রিকেট খেলে না?
তা জানি না। তবে খেললে নিশ্চয় কোনো না কোনো টিমে খেলতে দেখতাম।
যাক গে, এখন তার খবর বল।
উনি সুস্থ হয়েছে। তুমি যদি শুক্রবার বাসায় থাক, তা হলে ওকে নিয়ে আসব।
রোকন উদ্দিন সাহেব কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, ঠিক আছে, সকালের দিকে নিয়ে আসিস। বিকেলে বেরোব।
রিডিং রুমে সায়মা পড়ছিল। তাসনিম সেজেগুজে এসে জিজ্ঞেস করল, তোর আজ ক্লাস আছে?
না, কোথাও যাবি মনে হচ্ছে?
হ্যাঁ, গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি, ফিরতে দেরি হবে। তাই জিজ্ঞেস করলাম।
সায়মা মিটি মিটি হাসতে লাগল।
কী রে, হাসছিস যে?
সাদা পোশাকে তোকে বেহেস্তের হুরের মতো লাগছে। আব্দুস সাত্তার সাহেবের মাথা না ঘুরে যায়।
তাসনিম মেকী রাগ দেখিয়ে বলল, বেহেস্তের হুর কখনও দেখেছিস? তার সঙ্গে তুলনা করলি যে?
দুনিয়ার কোনো মানুষই দেখে নি, আমি দেখব কী করে? বেহেস্তের হুরের বর্ণনা দাদির কাছে শুনেছিলেন। কিছুদিন আগে সুরা আর রহমানের ব্যাখ্যা পড়ে তুইও তো শোনালি।
তারপর বলল, কাল তাকে নিয়ে আসবি। আজ আবার যাচ্ছিস কেন? ফোন করে দিলেই তো পারিস?
তাই করতাম, গত রাতে ফোনে আজ সকালে যেতে বলেছে।
তা হলে অভিসারে যাচ্ছিস? যা যা, কাল আব্বর ইন্টারভিউতে যেন পাশ করতে পারে, শিখিয়ে পড়িয়ে আয়।
তোকে আর পাকামী করতে হবে না। নিজের চরকায় তেল দে বলে তাসনিম বেরিয়ে এল।
.
আব্দুস সাত্তার নাস্তা না খেয়ে তাসনিমের জন্য অপেক্ষা করছিল। রাইসা বেগম দু’বার তাগিদ দিয়েছেন। আব্দুস সাত্তার বলেছে, একটু পরে খাবে। তৃতীয়বার এলে বলল, ফুফুআম্মা বস, একটু আলাপ করি।
রাইসা বেগম বললেন, ক’টা বেজেছে দেখেছিস? নাস্তা খেয়ে নে, তারপর আলাপ করবি।
