মিয়াঁও।
জোয়ার্দার চমকে তাকালেন। তার ডান দিকে পুফি। কুকুর যেমন লেজ উঁচু করে রাখে সেও লেজ উঁচু করে রেখেছে। মনে হয় দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে। তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। বিড়াল হাঁটতে শুরু করেছে। তিনি বিড়ালের পেছনে পেছনে যাচ্ছেন। জোয়ার্দার নিশ্চিত এই বিড়াল তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। বিড়াল পানি পছন্দ করে না। কিন্তু এর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তিনি মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছেন, বিড়ালও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা নিয়ে কারো সঙ্গে আলাপ করতে পারলে ভালো হতো। কার সঙ্গে আলাপ করবেন? সবার সঙ্গে সব কিছু নিয়ে আলাপ করা যায় না। ডাক্তায় শায়লাতো পাত্তাও দিলো না। আজ রাত নটায় তার সঙ্গে দেখা করার কথা। লাভ কি। তাছাড়া যাবেনও বা কি ভাবে?
রাত এগারোটার দিকে জোয়ার্দার নিজ বাসার সামনে উপস্থিত হলেন। বিড়ালটা তাকিয়ে আছে তার দিকে। তিনি ক্ষীণ গলায় বললেন, থ্যাংক য়্যু। বলেই নিজের ওপর খানিকটা রাগ লাগল। বিড়াল থ্যাংক য়্যুর মর্ম বুঝবে না।
জোয়ার্দারের সারা শরীর কাদায় পানিতে মাখামাখি হয়ে ছিল। তাকে দ্বিতীয়বার গোসল করতে হলো। এখন শুয়ে পড়ার সময়ঃ কিন্তু তিনি অভ্যাসবশে টিভির সামনে বসলেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে মহিষের মতো দেখতে কোনো এক প্রাণীর জীবনবৃত্তান্ত দেখাচ্ছে। তিনি আগ্রহ নিয়ে দেখছেন, বিড়ালটাও আগ্রহ নিয়ে দেখছে।
অনেকক্ষণ হলো টেলিফোন বাজছে। তার চেয়ার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। সারা শরীরে আলস্য। মনে হচ্ছে চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়বেন। নিতান্ত অনিচ্ছায় টেলিফোন ধরলেন। সুলতানী টেলিফোন করেছেন।
এই, টেলিফোন ধরছ না কেন? তিনবার কল করলাম।
জোয়ার্দার বললেন, হুঁ।
কী প্রশ্ন করেছি। আর কী উত্তর। হুঁ আবার কী? রাতে খাওয়াদাওয়া করেছ?
হুঁ।
হোটেলে খেয়েছ?
জোয়ার্দার আবারও বললেন, হঁ। ঝামেলা এড়ানোর জন্য হুঁ বলা।
কী দিয়ে খেয়েছ?
কৈ মাছ, মুরগির মাংস, ছোট মাছ, ঘি।
ঘি?
হুঁ। গরম ভাতে এক চামচ ঘি নিয়েছি।
হোটেলে ঘি দেয়? ঠিক করে বলো তো কোথায় খেয়েছ? তুমি আমার সঙ্গে লুকাছাপা করো, এটা আমি জানি। বলো কোথায় খেয়েছ?
জোয়ার্দার প্রশ্নের জবাব দেবার আগেই পাশের ঘরে খিলখিল হাসির শব্দ হলো।
সুলতানা বললেন, হাসছে কে?
জোয়ার্দার জানেন কে হাসছে। খালি বাড়ি পেয়ে জামাল চলে এসেছে। বিষয়টা সুলতানাকে বলা অর্থহীন। কী বুঝতে কী বুঝবে।
এই কথা বলছি না কেন? কে হাসে?
কেউ না।
কেউ না মানে। আমি পরিষ্কার শুনছি। খালি বাড়ি পেয়ে কাকে তুমি নিয়ে এসেছ? মেয়েটার নাম কী? রাস্তা থেকে এনেছি? বেশ্যা মেয়ে? কত টাকা দিয়ে এনেছ?
জোয়ার্দার টেলিফোন লাইন কেটে দিলেন। সুলতানার কথা শুনার চেয়ে জন্তুর কাণ্ড কারখানা দেখা যাক। এর মধ্যেও নিশ্চয়ই শিক্ষণীয় কিছু আছে। মহিষের মত জানোয়ারটার নাম জানতে পারলে ভাল হতো। অনিকা বলতে পারত।
টেলিফোন আবার বাজছে। বাজুক। ওই দিকে কান না দিলেই হলো।
জোয়ার্দার ঠিক করলেন, আজ আর বিছানায় যাবেন না। সোফাতেই ঘুমাবেন। জামালের লাফালাফিটা বাড়াবাড়ি রকমের। মাঝে মাঝে বিড়ালের মিয়াঁও শব্দও কানে আসছে। সেও যুক্ত হয়েছে জামালের সঙ্গে।
জোয়ার্দার সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়লেন। টিভি চ্যানেলের শব্দ। জামালের হৈচৈ, একটু পর পর টেলিফোনের বেজে ওঠা কিছুই তাঁর ঘুমের সমস্যা করল না। স্তবা অনেক দিন পর দুঃস্বপ্নটা দেখলেন।
কালো রঙের মাঝারি সাইজের চেয়েও ছোট একটা কুকুর তাকে কামড়ে ধরেছে। জামাল কুকুরটাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। একসময় কুকুরটা তাকে ছেড়ে জামালকে কামড়ে ধরল। জামাল বুকফাটা আৰ্তনাদ করল, বাজান, বাজানগো।
জোয়ার্দারের স্বপ্ন এ পর্যন্ত হয়। বাজান বাজান শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। আজ ঘুম ভাঙ্গল না। স্বপ্নটা চলতে থাকল। তিনি দেখলেন জামাল চার পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার পেট ফুলে আছে। পেটভৰ্তি কুকুরের বাচ্চা। পেটের চামড়া ভেদ করে বাচ্চাগুলো দেখা যাচ্ছে। কী ভয়ংকর দৃশ্য!
বাচ্চাগুলি কাঁদছে। কান্নার আওয়াজ টেলিফোনের রিং টোনের মত। জোয়ার্দার জাগলেন। কুকুরের বাচ্চা কাঁদছে না। টেলিফোন বাজছে। পুফি মোবাইল ফোন কামড়ে ধরে তার বিছানার কাছে বাসা। জামালকেও দেখা যাচ্ছে। সে জোয়ার্দারের পায়ের কাছে বসেছে। নিতান্ত অনিচ্ছার জোয়ার্দার টেলিফোন ধরলেন। নিশ্চয়ই সুলতানা চিৎকার চেচামেচি করে রাতের ঘুমের বারটা বাজিয়ে দেবে। জোয়ার্দার বললেন, সুলতানা বল কি বলবে।
অপরিচিত তরুণী কণ্ঠ বলল, আপনার স্ত্রীর নাম সুলতানা।
জোয়ার্দার বললেন, আপনি কে?
আমার নাম শায়লা। ডাক্তার শায়লা।
ও, আচ্ছা।
আজ আপনার আসার কথা ছিল।
জোয়ার্দার বললেন, ঝড় বৃষ্টিতে আটকা পড়েছিলাম।
বুঝতে পারছি। আমি অপেক্ষা করেছিলাম। ভাল কথা আপনার মামা কি বেঁচে আছেন?
কোন মামা?
শায়লা বললেন, যে মামার কারণে আমাদের বিয়েটা হয় নি।
ও বড় মামা। হ্যাঁ বেঁচে আছেন। প্যারালাইসিস হয়েছে। বিছানা থেকে নামতে পারেন না।
সরি টু হিয়ার দ্যাট। আপনি আপনার বড় মামার ঠিকানাটা আমাকে দেবেন। আমি তাকে একটা থ্যাংক য়্যু লেটার পাঠাব।
কেন?
উনার কারণে আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হয় নি। নিজের মধ্যে প্রচন্ড জেদ তৈরী হয়েছিল। পড়াশোনা করেছি। রেজাল্ট ভাল করেছি। একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয় নি।
আপনার স্ত্রী কি হাউস ওয়াইফ।
