খালেকের ফ্ল্যাটবাড়ি ছবির মতো সুন্দর। বসার ঘরের টেবিলে। লাল টকটকে ফুলদানিতে ধবধবে সাদা গোলাপী। গোলাপের গন্ধে ঘর গন্ধময় হয়ে আছে। জোয়ার্দার বললেন, বাহ।
খালেক বলল, ঘর সাজানো আমার স্ত্রীর ডিপার্টমেন্ট। নিজের বাড়িতে যখন ঢুকি তখন মনে হয় নাটকের সেটে ঢুকে পড়েছি। বিশ্ৰী লাগে। নিজের ঘরে ঢুকব, জুতা খুলে একদিকে ফেলব, শার্ট আরেক দিকে ফেলব। তখনই না মজা।
খালেকের স্ত্রী শামা ঘরে ঢুকে জোয়ার্দারকে অস্বস্তিতে ফেলে বলল, আপনার মতো পুণ্যবান মানুষ আমার বাড়িতে, আজ আমার ঈদ। বলেই কদম বুসি করল। মেয়েটি শ্যামলা, অপরূপ মুখশ্ৰী। চোখ মায়ায় টলমল করছে।
জোয়ার্দার থতমত খেয়ে গেলেন। কী বলবেন ভেবে পেলেন না। কথার পিঠে কথা তিনি বলতে পারেন না।
খালেক বলল, স্যার রাতে খাবেন। ফ্রিজে কিছু আছে? না থাকলে ড্রাইভার পাঠিয়ে আনাও। বৃষ্টি বাদলার দিনে ইলিশ ফ্রাই জমবে। মোরগ পোলাও ইলিশ ফ্রাই।
শামা বলল, তোমার স্যার কে আমি আমার খাবার খাওয়াব। তোমার কিছু না।
জোয়ার্দার অবাক হয়ে বললেন, দুজনের খাবার আলাদা নাকি?
শামা বলল, জি। ওর ঈগারের খাবার আমি খাই না। বাবার কাছ থেকে আমি কিছু টাকা পেয়েছি। আমি ওই টকায় বাজার করি। ওর ফ্রিজ আলাদা। আমারটা আলাদা আমি নিজের খাবার নিজে খাই। আমার বাবাও ছিলেন। আপনার মতো সন্ন্যাসী টাই মানুষ। সেই অর্থে আমি সন্ন্যাসীর মেয়ে। আমি রান্নার জাগাড় দেখছি। তুমি তোমার স্যারের সঙ্গে গল্প করো। আধঘণ্টার মধ্যে নাশতার ব্যবস্থা করছি। স্যার, আপনি গোসল করবেন না?
জোয়ার্দার অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে আছেন। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। অফিস থেকে ফিরে দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করা তার অনেক দিনের অভ্যাস। অন্যের বাড়িতে নিশ্চয়ই এটা করা যায় না।
শামা বলল, স্যার, আমার বাবাকে দেখেছি অফিস থেকে ফিরেই অনেক সময় নিয়ে গোসল করতেন। তামার ধারণা, আপনিও তা-ই করেন।
জোয়ার্দার বললেন, হুঁ।
বাথরুমে সব কিছু আছে। আমি পরিষ্কার লুঙ্গি দিচ্ছি। আমার বাবার লুঙ্গি।
জোয়ার্দার বললেন, দরকার নাই।
শামা বলল, অবশ্যই দরকার আছে। আপনি বাথরুমে ঢুকুন, আমি নাশতার জোগাড় দেখি।
শামা চলে যেতেই খালেক বিরক্ত গলায় বলল, কথায় কথায় সন্ন্যাসী বাবা। সন্ন্যাসী বাবা। অস্থির হয়ে গেছি। কয়েকবার বলেছি তুমিও সন্ন্যাসী হয়ে যাও। পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো গুহা খুঁজে বের করি, গুহায় দাখিল হয়ে যাও। গুহার ভেতর হাগা মুতা কর। জংলী মশার কামড় খাও। সন্ন্যাসী বাবার কাণ্ডটা শুনুন স্যার। ঢাকা শহরে দুটা বাড়ি, দুটাই দান করে দিয়েছে। একটা মাত্র মেয়ে সে কিছু পায় নাই। নগদ কিছু টাকা দিয়ে খালাস। সেই টাকার পরিমাণ কত তাও জানি না। আমি তো সন্ন্যাসী না। আমাকে বলবে কেন?
জোয়ার্দার কথা ঘোরাবার জন্য বললেন, আপনার মেয়ে কোথায়?
সে তার ছোট চাচার বাড়িতে। মেয়ের মধ্যেও সন্ন্যাসী ভাব দেখা দিয়েছে। আমি দুষ্ট লোক, আমার সঙ্গে কথা বলে না বললেই চলে। তার মা আমার গাড়িতে উঠে না বলে মেয়েও উঠে না। লোন করে গাড়ি কিনেছি, লোনের কাগজপত্ৰ দেখিয়েছি, তাতেও লাভ হয় নাই। স্যার, যান গোসল করে আসুন। আমার স্ত্রী একবার যখন মুখ দিয়ে গোসলের কথা বের করেছে। তখন গোসল করতেই হবে। বাথরুমে যদি না যান, বালতিতে করে পানি এনে মাথায় ঢেলে দেবে। সন্ন্যাসি বাবার মেয়ের নাড়ি নক্ষত্র আমি চিনি।
রাত নটার মধ্যে খাওয়াদাওয়া শেষ হলো। শামা বলল, স্যার, আপনার কি পান খাওয়ার অভ্যাস আছে?
জোয়ার্দার বললেন, না।
শামা বলল, আপনার তো খালি বাসা। একা বাসায় থেকে কী করবেন? এখানে থেকে যান।
জোয়ার্দার মনে করতে পারলেন না তাঁর বাসা যে খালি এই খবর এদের দিয়েছেন কি না। দেবার তো কথা না।
শামা বলল, বাইরে ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে স্যার, থেকে যান। গেস্ট রুম রেডি করে দিই?
খালেক বলল, স্যারের বাড়িতে কেউ নাই?
জোয়ার্দার বললেন, না। ওরা কক্সবাজার বেড়াতে গেছে। সেখান থেকে গেছে সেন্টমার্টিন। কাল পরশু চলে আসবে।
খালেক স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, স্যারের বাড়ি যে খালি এই খবর তুমি কিভাবে জানলে? স্যার তোমাকে বলেছেন? কখন বললেন?
শামা জবাব না দিয়ে উঠে গেল।
খালেক বিরক্ত গলায় বলল, বাড়িতে মহিলা পীর নিয়ে বাস করি। না বলতেই ঘটনা জানে। বাড়ি তো না, হুজরাখানা। স্যার বুঝলেন, মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে বনে জঙ্গলে চলে যাই।
শামা অনেক চেষ্টা করেও জোয়ার্দারকে থেকে যাবের জন্য রাজি করাতে পারল না।
খালেকের ড্রাইভার তাকে নামিয়ে দিতে গেল। বৃষ্টি তখনো পড়ছে। রাস্তাঘাটে পানি উঠে গেছে। গাড়ি কিছুদূর যাবের পরই ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিয়ে বলল, স্যার, একটা কথা বলি? যদি মনে কিছু না নেন।
বলো।
অপরাধ নিবেন না স্যার।
না অপরাধ নিব না।
রাস্তায় পানি উঠে গেছে। পানির ভিতর দিয়ে গাড়ি নিয়ে গেলে ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাবে। আমার চাকরি চলে যাবে।
আমি কি এখানে নেমে যাব?
নামলে ভালো হয় স্যার।
গাড়িতে কি ছাতা আছে?
জি िনা।
জোয়ার্দার বৃষ্টির মধ্যেই নেমে গেলেন। গাড়ি হুস করে তাকে পুরোপুরি ভিজিয়ে দিয়ে বের হয়ে গেল। জোয়ার্দার মহা ঝামেলায় পড়লেন। চারদিক অন্ধকার। তিনি কোথায় আছেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। বৃষ্টিও নেমেছে আকাশ ভেঙে। তিনি ফুটপাত ধরে এগোচ্ছেন। কিছুদূর যেতেই রাস্তা দুই ভাগ হয়ে গেল। এখন তিনি কোন দিকে যাবেন? খালেকের ড্রাইভার তাকে নিতে কেন রাজি হলো না। তিনি বুঝতে পারছেন না। প্রচুর গাড়ি চলাচল করছে। একটা গাড়ি তো তার গা ঘেষে গেল। রাস্তার নোংরা পানিতে তিনি দ্বিতীয়বার মাখামাখি হয়ে গেলেন। রাস্তায় কোনো রিকশা নেই। রিকশা থাকলে জিজ্ঞেস করে জানা যেত। তিনি কোথায়, তাঁকে কত দূর যেতে হবে?
