জোয়ার্দার সাহেবের অফিসে আসলেই ঝামেলা হচ্ছে। তার সিনিয়র সহকমী বরকতউল্লাহর মাথা খারাপের মতো হয়ে গেছে। প্রমোশনের জন্যে তিনি অনেক ওপরের লেভেলে ধরাধরি করিয়েছেন। প্ৰধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব বরকতউল্লাহর আত্মীয়, সে বলেছে, বরকত ভাই, আপনি নাকে খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে ঘুমান। খাঁটি তেল আপনার সন্ধানে না থাকলে আমাকে বলুন, আমি ঘানি ভাঙা তেল এনে দেব। DGA আপনি হচ্ছেন। কলকাঠি যা নাড়ার তা নাড়া হয়েছে। এরচে বেশি নাড়লে কাঠি ভেঙ্গে যাবে।
আজ ভোরবেলা কলকাঠি নাড়ার ফলাফল দেখে বরকতউল্লা স্তম্ভিত। ঘণ্টা দুই ঝিম ধরে থাকার পর হঠাৎ তাঁর মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। তিনি চিৎকার-চোঁচামেচি শুরু করলেন। অশ্রাব্য ভাষায় জোয়ার্দারকে গালাগালি।
নির্বোধি গাধা। শূন্য আই কিউ-এর একজন মানুষ। সে DGA হয় কিভাবে? ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া তো না, একে বলে হাতি ডিঙিয়ে কলা গাছ খাওয়া! আমি চুপচাপ বসে থাকব না। হাইকোর্টে মামলা করব। শালাকে আমি…।
বাকি কথা লেখা সম্ভব না। গালাগালি শোনার আনন্দের জন্য বরকতউল্লাহর অফিস রুমের সামনে ভিড় জমে গেল। গালাগালি করতে করতেই তাঁর স্ট্রোক হলো। দাঁড়ানো অবস্থা থেকে তিনি মেঝেতে পড়ে গেলেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
ক্যান্টিনে জোয়ার্দার এক কোনায় বসে আছেন। তার এদিকে কেউ আসছে না। তবে ক্যান্টিনের বয় কয়েকবার এসে খোজ নিয়ে গেছে। তিনি সবজি, কৈ মাছ, ডালের অর্ডার দিয়েছেন। আজ মনে হয় দেরি হবে না।
খালেক ক্যান্টিনে ঢুকে সংকুচিত ভঙ্গিতে জোয়ার্দারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, স্যার বসব?
জোয়ার্দার অবাক হয়ে বললেন, জিজ্ঞেস করেছেন কেন?
এত বড় অফিসারের সামনে বসাও তো একধরনের বেয়াদবি। স্যার, আমি আপনার প্রমোশনে অন্তর থেকে খুশি হয়েছি। শুধু আমি একা না, অনেকেই খুশি হয়েছে। ভাবিকে কি খবরটা দিয়েছেন?
না।
জানি উনাকে খবর দিবেন না। আপনি অতি আজব মানুষ। আজ বাসায় যাবের সময় অবশ্যই ভাবির জন্য কোনো উপহার কিনে নিয়ে যাবেন।
কী উপহার কিনব?
মেয়েরা শাড়ি পেলে খুশি হয়। জামদানি শাড়ি কিনে নিয়ে যাবেন।
এত টাকা সঙ্গে নাই।
আমার কাছ থেকে ধার নিয়ে কিনবেন। শাড়ি আমি পছন্দ করে দেব। স্যার, আপনার ক্রেডিট কার্ড নাই?
না।
আশ্চৰ্য! আজকাল তো ভিক্ষুকেরও ক্রেডিট কার্ড আছে। আচ্ছা আমি এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
লাগবে না।
লাগবে না মানে? অবশ্যই লাগবে। এখন তো আর লেবেনডিস ভাবে চললে হবে না। গাড়িতে যাওয়া-আসা করবেন। ভাবই অন্য রকম।
গাড়ি কোথায় পাব?
অফিসের গাড়ি। DGA-র গাড়ি আছে।
ও আচ্ছা।
জোয়ার্দার বাসায় ফিরলেন সন্ধায়। সুলতানার হাতে শাড়ি দিতেই সুলতানা তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, শাড়ি দিয়ে পার পেতে চাচ্ছ? লুচ্চা কোথাকার। এই শাড়ি রেখে দাও। রাস্তা থেকে যে মেয়ে আনবে তাকে দিয়ো। এখন সামনে বসো। তোমার সঙ্গে খুবই জরুরি কথা আছে। কথাগুলো আমি গুছিয়ে বলতে পারব না। কারণ তোমাকে দেখলেই রাগে আমার মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে। রঞ্জু তুই বল।
সুলতানা সামনে থেকে চলে গেলেন। রঞ্জু বলল, দুলাভাই! বুকুর মানসিক অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছেন। প্ৰেশার ফ্ল্যাকচুয়েট করছে। আপনাকে দেখলে রেগে যাচ্ছে। আমার মনে হয় কিছুদিন আপনাদের আলাদা থাকা ভালো।
জোয়ার্দার বললেন, আচ্ছা।
বুবু কিছুদিন থাকুক আমার সঙ্গে।
থাকুক।
কী ঘটেছে আমি কিছুই জিজ্ঞেস করব না। আপনি কী নিজ থেকে কিছু বলবেন?
জোয়ার্দার বললেন, আমার মনটা খুব খারাপ। অফিস থেকে আসার পথে খবর পেয়েছি। বরকতউল্লাহ সাহেব মারা গেছেন।
বরকতউল্লাহ কে?
আমার একজন কলিগ। স্ট্রোক করে মারা গেছেন।
রাত এগারোটা। জোয়ার্দারের বাসা খালি। সবাই চলে গেছে। রাতের জন্য জোয়ার্দার চুলায় খিচুড়ি বসিয়েছেন।
ছাত্রজীবনে অনেকবার নিজে রান্না করেছেন। মাঝে মধ্যে এখনো রাধতে হয়। খিচুড়ি অখাদ্য হবে না। রান্নার শেষে এক চামচ ঘি দিতে পারলে ভালো হতো। তিনি ঘিয়ের কৌটা খুঁজে পাচ্ছেন না।
শোবারঘরে হুটোপুটির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিড়ালটা নিশ্চয় চলে এসেছে। বাসা যেহেতু খালি, জামালেরও আসার সম্ভাবনা।
জোয়ার্দার রান্নাঘর থেকেই লক্ষ্য করলেন কে যেন মন দিয়ে টিভি দেখছে। জামালের মতো না, বয়স্ক একজন মানুষ। জোয়ার্দার এগিয়ে গিয়ে দেখেন বরকতউল্লাহ বসে আছেন। এটা কী করে সম্ভব?
বরকতউল্লাহ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাল আছেন?
জোয়ার্দার তাকিয়েই আছেন। কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। বরকতুল্লাহ বললেন, কাইন্ডলি চ্যানেলটা বদলে দিন।
আমাকে বলছেন?
আপনাকে ছাড়া আর কাকে বলব। আর কেউ কি এখানে আছে? আমি সারাজীবন বলেছি আপনি একজন নিৰ্বোধ। আমি যে একা বলেছি তা-না! সবাই বলেছে। তারপর প্রমোশন হয়ে গেল। আপনার। এর মানে কি জানেন?
না।
এর মানে হচ্ছে এ্যাডমিনস্ট্রেশন হায়ার লেভেল গর্ধভ চায়।
স্যার! আপনি যে মারা গেছেন এটা জানেন?
গর্ধভের মত কথা বলবেন না। যদি সম্ভব হয় এক কাপ কফি খাওয়ান।
গেস্টরুমটা দেখিয়ে দেই স্যার যদি ইচ্ছা করে গেস্ট রুমে ঘুমাবেন।
আমি কোথায় ঘুমাব এটা আমার মাথা ব্যথা আপনার না। You go to hell.
জোয়ার্দার মোটামুটি নিশ্চিত হলেন তার মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে। তার কোনো মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অত্যন্ত জরুরী।
রসমালাই
জোয়ার্দার শায়লার সামনে সংকুচিত ভঙ্গিতে বসে আছেন। শায়লা বললেন, রসমালাই এনেছেন?
