জোয়ার্দারের অফিসে যেতে আধাঘণ্টার মতো দেরি হয়ে গেল। তাকে এক জোড়া স্যান্ডেল। কিনতে হলো। রাতে তার স্যান্ডেল চুরি হয়েছে। চোর পকেটে হাত দেয়নি। মানি ধ্যাগ নিয়ে গেলে ভালো ঝামেলা হতো। চোর মানিব্যাগ কেন নিলো না জোয়ার্দার বুঝতে পারছেন না। মনে হয় এই চোর তেমন এক্সপার্ট না। কিংবা তার চাহিদা কম। সে অল্পতেই তুষ্ট।
অফিসে ঢুকে জোয়ার্দার লক্ষ্য করলেন, সবাই তার দিকে কেমন করে যেন তাকাচ্ছে। তাদের তাকানোর ভঙ্গি থেকে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। প্যান্টের জিপার খোলা থাকলে লোকজন এমন করে তাকায়। তার জিপার ঠিক আছে।
অফিসের পিয়ন হঠাৎ পা ছুঁয়ে তাকে সালাম করল। জোয়ার্দার বললেন, কী ব্যাপার?
স্যার, আপনার প্রমোশন হয়েছে। আপনি DGA হয়েছেন। জানেন না?
না তো। আমাকে এক কাপ চা দাও।
পিয়ন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। জোয়ার্দার যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে ড্রয়ার খুলে ফাইল বের করতে লাগলেন। পিয়ন বলল, AG স্যারের সঙ্গে দেখা করবেন না?
দেখা করতে কি বলেছেন?
জি না।
তাহলে শুধু শুধু তাঁর সঙ্গে দেখা করব কেন?
স্যার মিষ্টি খাওয়াবেন না?
মিষ্টি খাওয়াব কেন?
এতবড় প্রমোশন পেয়েছেন মিষ্টি খাওয়াবেন না?
জোয়ার্দার মানি ব্যাগ খুলে একশ টাকার একটা নোট বের করলেন।
পিওন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সুলতানার বাড়িতে হুলুস্থূল কাণ্ড।
অনিকা স্কুলে যায়নি। শুকনা মুখে বিড়াল কোলে ঘুরছে। রঞ্জু খবর পেয়ে ভোরে চলে এসেছে। বসার ঘরের সোফায় বসে কিছুক্ষণ পরপর বলছে,
Does not make any sense.
ঘটনা হচ্ছে সকালবেলা সুলতানা আবিষ্কার করেছেন তুহিন তুষারের ঘরের তিনটা বালিশ ছেড়া। ঘরময় তুলা উড়ছে। এই দুজন কাল রাতে ছিল না। রঞ্জু তার বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। এখন রঞ্জুর সঙ্গে ফিরেছে। তারা সব কিছুতে মজা পায়। এবারের ঘটনায় মজা পাচ্ছে না। তারা আতংকিত কারণ বালিশের ভেতর তাদের গোপন টাকা লুকানো ছিল। তুলার সঙ্গে টাকাও বের হয়েছে।
সুলতানা চায়ের কাপ হাতে ভাইয়ের পাশে বসতে বসতে বললেন, আমি যে ঘরে দুই চুন্নি পুষছি তা তো জানি না। এদের এক্ষুনি বিদায় করা দরকার। আট হাজার তিন শ টাকা পাওয়া গেছে।
রঞ্জু বিরক্ত গলায় বলল, মূল জিনিস নিয়ে আগে আলোচনা কর। টাকা চুরি তো মূল না। কাজের লোক কিছু টাকা এদিক-ওদিক করবে। এটা মেনে নিতে হবে। তোমরা অসাবধান থাকবে ঘরময় টাকা ছড়িয়ে রাখবে। চুরি তো হবেই। উঠানে ধান ছিটিয়ে রাখলে কাক আসে। আসে না?
হুঁ।
দোষ তো কাকের না। দোষ যে ধান ছিটিয়েছে তারা। চুরির প্রসঙ্গ আপাতত বাদ। ওদের টাকা বাজেয়াপ্ত করা হবে। সেটাই ওদের শান্তি। এই দুজন চলে গেলে তোমার সংসার চলবে? কাজের মেয়ে পাওয়া আর ইউরেনিয়ামের খনি পাওয়া এখন সমান। বালিশ ছিঁড়ে তুলা কে বের করল এটা নিয়ে চিন্তা কর।
সুলতানা বললেন, ভূত না তো?
রঞ্জু বলল, কথায় কথায় ভূত-প্ৰেত নিয়ে আসবে না। ভূত-প্রেত আবার কী। আমার ধারণা, দরজা খুলে কেউ ঢুকেছে। তোমাকে ভয় দেখানোর জন্য এই কাণ্ড করেছে। বালিশ ছিঁড়ে চলে গেছে।
কে ঢুকবে দরজা খুলে?
যার কাছে মেইন দরজা খোলার চাবি আছে সে ঢুকবে।
তোর দুলাভাইয়ের কথা বলছিস?
রঞ্জু জবাব দিল, না।
তোর দুলাভাইকে টেলিফোন করে জিজ্ঞেস করব?
রঞ্জু বলল, করতে পারো। তবে টেকনিক্যালি জিজ্ঞেস করতে হবে। টেলিফোন তুলেই চিৎকার-চোঁচামেচি করলে তো হবে না। শায়লা মেয়েটি প্রসঙ্গে একটি কথাও বলবে না। আমি অলরেডি লোক লাগিয়েছি তারা পাত্তা লাগাবে।
সুলতানা বললেন, জিজ্ঞাসাবাদ যা করার তুই কর। আমি বাসায় আসতে বলি।
আসতে বললেই তো দুলাভাই ছুটে আসবেন না। অফিস ছুটি হলে তারপর হেলতে—দুলতে আসবেন।
জোয়ার্দরের সঙ্গে মোবাইল ফোন নেই। ফোন সিজ করা হয়েছে। সুলতানা বেশ ঝামেলা করেই অফিসের ল্যান্ডফোনে তাকে ধরলেন।
জোয়ার্দার বললেন, কেমন আছ?
সুলতানা বললেন, আমি কেমন আছি তোমার জানার দরকার নেই। তুমি এক্ষণ বাসায় আসো।
অফিস ছুটি হলেই আসব।
বাসায় বড় কোনো দুৰ্ঘটনা ঘটলেও তুমি অফিস করবে?
দুর্ঘটনা ঘটেছে?
তোমার সঙ্গে ইতিহাস কপচাতে পারব না। তোমার কাছে মেইন দরজা খোলার চাবি আছে কি না বলো।
চাবি আছে। এখন টেলিফোন রাখি। অফিসে কিছু ঝামেলা হয়েছে।
সুলতানা টেলিফোন রেখে গম্ভীর গলায় বললেন, রঞ্জু তুই যা ভেবেছিস তাই। তোর দুলাভাইয়ের কাছে মেইন দরজার চাবি আছে। কী অদ্ভুত মানুষ চিন্তা কর। আমাকে ভয় দেখানোর জন্য চুপি চুপি ঘরে ঢুকেছে। বালিশ ছিঁড়ে তছনছ করেছে। এই লোক তো যেকোনো সময় আমাকে খুন করতে পারে। চুপি চুপি ঘরে ঢুকে খুন করে পালিয়ে গেল। কেউ কিছু জানল না।
রঞ্জু বলল, দুলাভাইয়ের যে অদ্ভুত মানসিকতা দেখছি। নাথিং ইজ ইম্পসিবল। তোমাকে বলতে আমার খারাপ লাগছে আমার ধারণা দুলাভাই মাথা খারাপের দিকে যাচ্ছেন।
সুলতানা বললেন, আমি তো এই লোকের সঙ্গে বাস করব না। আজ সে অফিস থেকে ফিরুক, তুই তার সঙ্গে ফয়সালা করবি। আমি অনিকাকে নিয়ে তোর বাড়িতে উঠিব।
আমার দিক থেকে কোনোই সমস্যা নেই।
অনিকা দরজার আড়াল থেকে সব কথা শুনছে। সেখান থেকেই ক্ষীণ গলায় বলল, বাবা একা থাকবে?
সুলতানা বিরক্ত গলায় বললেন, একা থাকবে কোন দুঃখে? রাস্তা থেকে মেয়ে ধরে আনবে। ঐ মেয়ের কোলে বসে বাকি জীবন কাটাবে।
রঞ্জু বলল, বাচ্চাদের সামনে এ ধরনের কথা বলা ঠিক না।
