খালেদ ফিরে এসে স্ত্রীর কাছে সব কিছু শুনে খুব দুঃখ প্রকাশ করল। লাইলীরা এখানে এসেছে দেখে খুশি হল।
পরের দিন থেকে লাইলী নিয়মিত অফিস করতে লাগল।
সুলতানা ও খালেদ তাদেরকে এখানেই থাকতে বলল। লাইলী কিছুতেই রাজি হল না। শেষে ওদের বাসার কাছাকাছি একটা বাসা ঠিক করে দিল।
দুমাস হতে চলল লাইলী চাকরি করছে। সে বোরখা পরেই অফিস করে। সব সময় তার মুখ নেকাবে ঢাকা থাকে। যখন সে ম্যানেজারের কাছে একা থাকে তখন শুধু মুখ ভোলা রাখে। তাকে সে চাচার আসনে বসিয়েছে। তার অনুরোধে মাঝে মাঝে লাইলীকে তাদের বাসায় যেতে হয়। ওঁর স্ত্রীও লাইলীকে মেয়ের মত স্নেহ করেন। তাদের বাড়িতে তারা থাকতে বলেছিলেন, কিন্তু সে রাজি হয়নি।
অফিসে মোট পনের জন লোক কাজ করে। তাদের কেউ আজ পর্যন্ত লাইলীর মুখ দেখেনি। অনেকে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে বিফল হয়েছে। একজন মেয়ে পিয়ন আছে, তার কাছ থেকে অফিস ষ্টাফরা শুনেছে, ষ্টেনো মেয়েটা অপূর্ব সুন্দরী। তারা অনেক চেষ্টা করেছে তাকে দেখতে এবং তার সঙ্গে আলাপ করতে; কিন্তু পারেনি। ছুটির পর লাইলী যখন অফিস থেকে বের হয় তখন অফিস গেটের বাইরে রাস্তায় কলিগরা তাকে দেখে নানা রকম মন্তব্য করে। একদিন একজন তাকে শুনিয়ে সঙ্গীদের বলল, উনি যদি পর্দা মেনে চলেন তবে চাকরি করতে এসেছেন কেন? একজন পীরসাহেবকে বিয়ে করে অসুস্পশ্যা হয়ে থাকতে পারতেন। রূপসী বলে কলিগদের সঙ্গে কি মেলামেশা করতে নেই? মেয়েদের এত অহংকার থাকা ভালো না। এরপরও লাইলীর কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে শেষে আংগুর ফল টক ভেবে তারা ইতি টেনেছে।
লাইলী তাদের কথায় একটু মনে ব্যথা পেলেও কাউকে কিছু বলেনি। সে ভাবে, তাদেরকে দোষ দেওয়া যায় না। আজকাল কয়টা মেয়ে পর্দা করে চাকরি করে? সে তাদের বিরুদ্ধে কোনোদিন ম্যানেজার সাহেবকেও কিছু বলেনি। যদিও সে জানে, ম্যানেজারকে বলে দিলে তারা আর কোনোদিন তার পিছু লাগবে না।
এদিকে সুইজারল্যাণ্ডে দীর্ঘ ছয়মাস চিকিৎসার পর সেলিম স্মৃতিশক্তি ও বাকশক্তি ফিরে পেল। সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর মায়ের কাছে এ্যাকসিডেন্টের কথা শুনে জিজ্ঞেস করল, আমাদের বিয়ে তা হলে হয়নি?
লাইলীর কথা শুনে যদি ছেলের আবার কিছু হয়ে যায়? সেই কথা চিন্তা করে সোহানা বেগম বললেন, সে সব ঠিক আছে, দেশে ফিরে সব কিছু জানতে পারবে।
ও নিয়ে তুমি এখন কোনো চিন্তা করো না। মনে রেখ, তুমি একসিডেন্ট করে আজ ছয়মাস স্মৃতিশক্তি ও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলে। কোনো কিছুই এখন তোমার চিন্তা করা নিষেধ।
আরও একমাস পর সোহানা বেগম ছেলেকে নিয়ে দেশে ফিরলেন।
রাত্রে ঘুমোবার সময় আসমা সেলিমের ঘরে তাকে শুয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল, দাদা, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ?
সেলিম জেগেই ছিল। সে তখন লাইলীর কথা চিন্তা করছিল। উঠে বসে বলল, নারে ঘুমোইনি, আয় বস। কিছু বলবি নাকি?
সোহানা বেগম আসমাকে লাইলীর সঙ্গে বিয়ে ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনাটা জানাবার জন্য পাঠিয়েছেন। কিভাবে কথাটা বলবে চিন্তা করতে করতে একটা চেয়ার টেনে বসল।
কিরে কথা বলছিস না কেন? তোর ছেলে কেমন আছে? পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিস তো?
আসমা বলল, আমার খবর ভালো। তোমাকে একটা কথা বলব, সেটা শুনে তুমি মনে আঘাত পাবে, তাই বলতে সাহস হচ্ছে না।
সেলিম একটু চিন্তা করে বলল, যত বড়ই আঘাত পাই না কেন, তুই বল।
আসমা সেই বেনামী চিঠিটা এগিয়ে দিয়ে বলল, পড়ে দেখ।
সেলিম তার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়ল। তারপর আসমার দিকে রাগের সঙ্গে চেয়ে রইল।
আসমা ভয়ে ভয়ে বলল, তোমার যেদিন এ্যাকসিডেন্ট হয়, সেদিন একটা লোক এসে খালাম্মাকে এই চিঠিটা দিয়ে যায়। ওঁর ধারনা লাইলী খুব অপয়া মেয়ে। সেই জন্য তোমার এই দুর্ঘটনা হয়। তাই তিনি বিয়ে ভেঙ্গে দেন।
আসমা তুই চুপ কর বলে চিৎকার করে সেলিম মায়ের ঘরে গিয়ে পায়ের কাছে বসে দু’পা জড়িয়ে ভিজে গলায় বলল, একি করলে মা? একজন অচেনা, অজানা লোকের একটা চিঠি পেয়ে তাকে বিশ্বাস করে ফেললে? তোমার নিজের ছেলের চেয়ে সেই অজানা লোকটা তোমার কাছে বেশি বিশ্বাসী হয়ে গেল? তুমি মা হয়ে আমাকে এতখানি অবিশ্বাস করবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলল, কেন তুমি আমার ভালো হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে না? আমাকে এত টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে ভালো করে আনলে কেন? বল মা বল, চুপ করে থেক না? আমার কথার উত্তর দাও। আমি কী এমন তোমার কাছে অন্যায় করেছি, যার জন্য তুমি আমাকে এত বড় শাস্তি দিলে? তা হলে কী ভাবব, আমাকে এই চরম আঘাত দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে ভালো করে এনেছ।
সোহানা বেগম বললেন, সেলিম, তুই আমাকে এত বড় কথা বলতে পারলি? তারপর ভিজে গলায় বললেন, আমি মা হয়ে তোর ভালর জন্য এই কাজ করেছি। তুই শান্ত হ বাবা। তুই শিক্ষিত ছেলে, সামান্য একটা মেয়ের জন্য এতটা উতলা হওয়া উচিত না।
সেলিম মাকে ছেড়ে দিয়ে আর কোনো কথা না বলে নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফোঁপাতে লাগল। রাত্রে ঘুমিয়ে সে স্বপ্ন দেখল, লাইলী পাগলি হয়ে গেছে। ভেঁড়া ময়লা কাপড় পরে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার সুদীর্ঘ চুল উস্কোখুসকো হয়ে জট পাকিয়েছে। সে রাস্তায় যাকে পাচ্ছে তাকেই জিজ্ঞেস করছে, আপনি সেলিম সাহেবকে দেখেছেন? বলতে পারেন তিনি কোথায় ও কেমন আছেন? একটা হোটেল থেকে বেরোবার সময় গেটে লাইলী তাকে ঠিক ঐ কথাগুলো বলল। সেলিমের তখন ইচ্ছা হল, তাকে জড়িয়ে ধরে বলে এই তো আমিই তোমার সেই সেলিম সাহেব। ঠিক এই সময় মোয়াজ্জেনের আজান শুনে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভারাক্রান্ত মনে ফজরের নামায পড়ে লাইলীর মঙ্গলের জন্য আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া চাইল।
