ম্যানেজারের কথা শুনে লাইলীর চোখও পানিতে ভরে গেল। উঠে গিয়ে তার পায়ে হাত দিয়ে কদমবুসি করে বলল, আমাকে চিরদিন মেয়ের মতো মনে করবেন।
এবারও ম্যানেজার সাহেব চোখের পানি রোধ করতে পারলেন না। তার মাথায় হাত রেখে ভিজে গলায় বললেন, বেঁচে থাক মা, সুখী হও। আল্লাহ তোমার মনের বাসনা পূরণ করুন।
অফিস থেকে বেরিয়ে আনন্দে লাইলীর মনটা ভরে গেল। চাকরিটা হয়ে যাবে সে ধারণাই করতে পারেনি। হোটেলে ফিরে মাকে শুভ সংবাদটা দিল। দুপুরে খেয়ে দেয়ে মাকে বিশ্রাম করতে বলে বান্ধবী সুলতানার বাসার ঠিকানাটা নিয়ে তার খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
যেদিন সোহানা বেগম বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে লাইলীদের চিঠি দেন, সেইদিন সুলতানার সঙ্গে তার খালাত ভাই খালেদের বিয়ে হয়। সুলতানা নিজে তাদের বাড়িতে দাওয়াত দিতে এসে সেলিমের সঙ্গে ওর বিয়ের কথা শুনে যায়। লাইলীর
জীবনে এরকম বিপর্যয় ঘটে গেল বলে সে বিয়েতে যেতে পারেনি।
বিলেত থেকে এফ, আর, সি, এস, ডিগ্রী নিয়ে এসে খালেদ চিটাগাং মেডিকেল কলেজে মেডিসিনের প্রফেসার পদে জয়েন করেছে। বিয়ের দুদিন পর ছুটি না থাকায় সুলতানাকে নিয়ে স্টাফকোয়ার্টারে নিজের বাসায় চলে এসেছে। কয়েকদিন পর সুলতানা লাইলীকে অভিযোগ করে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু লাইলী নানান দুর্ভাবনায় সে চিঠির উত্তর দিতে পারেনি।
ঠিকানামতে গিয়ে লাইলী দরজায় নক করল।
সবেমাত্র সুলতানা স্বামীর সঙ্গে খেয়ে উঠে পান চিবুচ্ছে। আর খালেদ বিছানায় আড় হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। এক্ষুণি তাকে আবার চেম্বারে গিয়ে বসতে হবে। দরজায় নক হতে সুলতানাকে বলল, দেখ তোমার কোনো পড়শীনি হয়তো এসেছে। আমি ততক্ষণ পোশাক পরে নেই।
সুলতানা দরজা খুলে লাইলীকে দেখে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল, তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, সই তুই? এতদিন পরে বুঝি আমাদের কথা মনে পড়ল? বিয়েতে তুই যখন এলি না, এমন কি চিঠির উত্তরও দিলি না তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, জীবনে তোর সঙ্গে কখনো কথা বলব না। কিন্তু তোর মধ্যে কি যাদ আছে, তোকে দেখে সে প্রতিজ্ঞা ঠিক রাখতে পরলাম না। তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে হাত ধরে বলল, আয় ভিতরে আয়। তোর সয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। ঘরের ভিতরে এসে সুলতানা স্বামীর উদ্দেশ্যে বলল, দেখবে এস কে এসেছে? যদি বলতে পার, তা হলে মিষ্টি খাওয়াব?
খালেদ পাশের রুমে পোশাক বদলাচ্ছিল। এ ঘরে এসে এক অচেনা সুন্দরী মেয়েকে দেখে প্রথমে লজ্জায় থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চিন্তা করল, আশ-পাশের মেয়ে হলে এভাবে সুলতানা তাকে ডাকত না। হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় লাইলীকে ভালভাবে দেখল। তারপর লজ্জা মিশ্রিত মৃদু হাসি দিয়ে “আসসালামু আলাইকুম” বলে বলল, আপনি নিশ্চয় লাইলী।
লাইলীও মিষ্টি হেসে সালামের জওয়াব দিয়ে বলল, আপনি ঠিক বলেছেন। কিন্তু আপনি আমাকে চিনলেন কি করে?
লাইলী আরজুমন বানু এদেশে একজনই আছেন। তাকে কাউকে চিনিয়ে দিতে হয় না, তিনি নিজেই সকলের কাছে পরিচিত। বিলেতে থাকতে এবং বিয়ের পর থেকে আপনার কথা ওর কাছে এত বেশি শুনেছি যে, আপনাকে দেখেই চিনে ফেললাম।
লাইলী সুলতানাকে বলল, তুই তো সয়ার কাছে হেরে গেলি, এখন মিষ্টি খাওয়া।
তাতো খাওয়াবই, কিন্তু তুই একলা কেন? সেলিম আসেনি? তুই অত রোগা হয়ে গেছিস কেন?
খালেদ বলল, তোমরা দুজনে বসে গল্প কর, আমার সময় নেই, চলি। তারপর লাইলীর দিকে চেয়ে বলল, আমি না আসা পর্যন্ত আপনি যাবেন না কিন্তু।
সুলতানা বলল, বারে আমার সই এল, তার খাতির যত্ন না করে তুমি যে বড় চলে যাচ্ছ?
এখন আমার একটা ইমারজেন্সী কল আছে। ময়নার মাকে দিয়ে যা দরকার আনিয়ে নিও। আমি যত তাড়াতাড়ি পারি ফেরার চেষ্টা করব।
খালেদ বেরিয়ে যেতে সুলতানা লাইলীকে জিজ্ঞেস করল, ভাত খাবি?
না এক্ষুণি খেয়ে এসেছি। আমি এখন কিছু খাব না, তুই তাড়াহুড়ো করছিস কেন? আমি কী তোদের কাছে খেতে এসেছি?
সুলতানা তবু শুনল না। ময়নার মাকে ডেকে দু’গ্লাস লক্ষ্মী তৈরী করে আনতে বলল। তারপর লাইলীকে বলল, তোর কি ব্যাপার বলতো? এমন শুকিয়ে গেছিস কেন? তোকে দেখে আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে।
লাইলী বলল, তোর সন্দেহ ঠিক। তারপর সেলিমের এ্যাকসিডেন্ট, বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া এবং বাপের মৃত্যু থেকে আজ পর্যন্ত সব ঘটনা খুলে বলল।
শুনতে শুনতে সুলতানার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। চোখ মুছে বলল, কি করবি ভাই? জানিস তো সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা। তাঁর বাণী স্মরণ করে সবুর কর। তিনি নিশ্চয় একদিন সবুরের ফল দেবেন। তুই বেশি চিন্তা করিসনা। খালা আম্মাকে নিয়ে একদম আমার এখানে উঠলেই পারতিস। চল যাই, তোদের মালপত্র আর খালাআম্মাকে এখানে নিয়ে আসি।
লাইলী বলল, সে কি করে হয়? তোদের অসুবিধে হবে। তা ছাড়া সয়া কিছু মনে করতে পারে?
দেখ, তোকে অত চিন্তা করতে হবে না। দেখছিস না, দু-দুটো ঘর খালি পড়ে রয়েছে।
তা হয় না রে, তার চেয়ে সয়াকে বলিস, তোদের কাছাকাছি একটা বাসা দেখে দিতে।
ঠিক আছে তাই হবে। এখন নাস্তা খেয়ে চল, সব কিছু এখানে নিয়ে আসি। যতদিন না বাসা ঠিক হচ্ছে ততদিন এখানে থাকবি। তোর সয়া শুনলে খুব খুশি হবে। সুলতানা লাইলীর কোনো বাধা শুনল না। তাকে সঙ্গে নিয়ে হোটেলে গিয়ে খালা আম্মাকে সালাম করে তাদেরকে নিয়ে চলে এল।
