সকাল সাতটায় সেলিম লাইলীদের বাড়িতে গেল।
জলিল সাহেব সেলিমকে দেখে অবাক হলেও ড্রইংরুমে এনে বসালেন।
সেলিম বলল, দয়া করে লাইলীকে বা ওর আব্বাকে একটু ডাকবেন?
জলিল সাহেব আরো বেশি অবাক হয়ে বললেন, খালুজান আজ প্রায় আট মাস আগে ইন্তেকাল করেছেন। আর লাইলী মাস দুই হল তার অসুস্থ মাকে নিয়ে চিটাগাং গেছে।
সেলিম “ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন” পড়ে উঠে এসে জলিল সাহেবের দু’টো হাত ধরে বলল, অনুগ্রহ করে তার ঠিকানাটা দিন।
জলিল সাহেব এতক্ষণ অনেক সহ্য করেছেন, এবার একটু রাগতস্বরে বললেন, আমরা তার ঠিকানা জানি না। এখন তার ঠিকানা নিয়ে কি করবেন? এতদিন কোথায় ছিলেন? শুনেছিলাম, একসিডেন্ট করে স্মৃতি ও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এখন তো দেখছি আপনি সুস্থ। খোঁজ-খবর নেননি কেন? বই পুস্তকে পড়েছি, বড় লোকের ছেলেরা গরিব মেয়েদের নিয়ে দুদিনের জন্য পুতুল খেলার মতো খেলে। আপনাকে দেখে প্রত্যক্ষ করলাম। আপনার মায়ের চিঠি পেয়ে লাইলী খালুজানকে গহনাগুলো ফেরৎ দিতে পাঠিয়েছিল। জানি না আপনার মা তাকে কি বলেছিলেন। ফিরে এসে সেই যে বিছানা নিলেন আর উঠলেন না। সে রাতেই মারা গেলেন। আর কি চান আপনারা? অমন বেহেস্তের হুরের মত সুন্দরী ও নিপাপ মেয়েকে দুর্ণাম দিয়ে এখান থেকে তাড়ালেন। আরও যদি কিছু করতে চান, তা হলে চিটাগাং গিয়ে গোয়েন্দা লাগান, পেয়ে যাবেন। একটা কথা মনে রাখবেন, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। বড়লোকেরা টাকার দেমাগে গরিবদের উপর অনেক জুলুম করে, কিন্তু সেটা সাময়িক। উপরে একজন শাহানশাহ আছেন, তিনি বড় ন্যায় বিচারক। তাঁকে ফাঁকি দেওয়া কারুর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি সত্য মিথ্যা একদিন প্রমাণ করে দেবেন।
সেলিম এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। তার দু’চোখ পানিতে ভরে উঠল। জলিল সাহেব থেমে যেতে ভিজে গলায় বলল, আমি নিজের সাফাই গাইবার জন্য আসিনি। এতদিন পর কেন এসেছি, সে খবর আল্লাহপাক জানেন। শুধু একটা কথা বলে যাই, আল্লাহপাক যেন আপনার শেষ কথাটা কবুল করেন। তারপর সে রুমাল দিয়ে দু’চোখ মুছতে মুছতে হঠাৎ করে উঠে চলে গেল।
জলিল সাহেব সেলিমের কথা ঠিক বুঝতে পারলেন না। রহিমা দরজার পর্দার আড়াল থেকে তাদের কথা শুনছিল। এবার ভিতরে এসে বলল, আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে। সেলিম সাহেব বোধ হয় এসব ঘটনা কিছুই জানেন না। না জেনে তুমি তাকে শুধু শুধু যাতা করে বললে?
সেলিমের ব্যবহারে জলিল সাহেবেরও মনে খটকা লেগেছে। বললেন, কি জানি, হয়তো হবে। তবু কিন্তু থেকে যাচ্ছে।
রহিমা বলল, এইজন্য হাদিসে আছে, আসল ঘটনা না জেনে কারও উপর সন্দেহ পোষণ করা মহাপাপ।
.
লাইলী মাঝে মাঝে রহিমাকে পত্র দেয়। কিন্তু ঠিকানা দেয় না। পোষ্ট অফিসের সীলমোহর দেখে ওরা জেনেছে, সে চিটাগাং-এ আছে।
সেলিম ঘরে ফিরে এসে জামাকাপড় ব্রীফকেসে ভরে নিয়ে মায়ের কাছে এসে বলল, মা, আমি চিটাগাং যাচ্ছি।
সোহানা বেগম বললেন, সে কিরে? মাত্র গতকাল এত জার্নি করে এলি। কয়েকদিন রেষ্ট নে, তারপর না হয় যাবি। এত ব্যস্ত হওয়ার কি আছে?
সেলিম হতাশভাবে ব্রীফকেসটা সেখানে রেখে নিজের রুমে ফিরে এল। ইজিচেয়ারে শুয়ে চোখ বন্ধ করে লাইলীকে নিয়ে তার অতীত জীবনের কথা চিন্তা করতে লাগল।
সোহানা বেগম আসমাকে বলে দিয়েছেন তোর দাদার দিকে খুব খেয়াল রাখবি। তাকে বেশি চিন্তা করতে দিবি না। সে বীফকেসটা নিয়ে সেলিমের ঘরে এসে সেটা যথাস্থানে রেখে দিল। তারপর তার কাছে এসে মাথার চুলে হাত বুলাতে লাগল।
সেলিম চমকে উঠে তাকিয়ে আসমাকে দেখে বসতে বলে বলল, হাঁরে রেহানা বা মনিরুলের সঙ্গে তোর পরিচয় হয়নি?
আসমা সামনের একটা চেয়ারে বসে বলল, রেহানার সঙ্গে এখানে আসার কয়েকদিন পর পরিচয় হয়েছে। প্রথমদিন রুবীনার সঙ্গে আমাকে দেখে তার কাছে আমার পরিচয় জানতে চাইতে রুবীনা বলল, আমাদের দুর সম্পর্কের আত্মীয়া। আমাকে অবশ্য সে কোনোদিন কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আর মনিরুল প্রায়ই এসে রুবীনার সঙ্গে গল্প করে। মাঝে মাঝে দুজনে বেড়াতে যায়। আমি তার সামনে কোনোদিন যাইনি।
মনিরুলকে তুই ঠিক চিনতে পেরেছিস? আসমা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সেলিম বলল, তোকে ভালভাবে আই, এ, পাশ করতে হবে। এখানে বেশি দিন থাকলে ধরা পড়ে যাবি। তোকে অন্তত বি. এ. পাশ করতে হবে। তোর ছেলেকে কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করে দেব। ছেলের চিন্তা করিসনে, তারও ব্যবস্থা করতে পারব। তোর জন্য ঐ স্কুলে ছেলেমেয়েদের দেখাশুনার কাজটা ঠিক করে দেব। তোকে আর ছেলে ছেড়ে থাকতে হবে না।
আসমা মেঝেয় বসে পড়ে সেলিমের দুটো পা জড়িয়ে ধরে কাঁদকাঁদ স্বরে বলল, দাদা, তুমি এই মহাপাপীর জন্য যা করছ, তার এক কণাও আমি প্রতিদান দিতে পারব না। তোমার মতো ছেলের জীবনে কেন যে এরকম একটা ঘটনা ঘটে গেল, তা একমাত্র আল্লাহপাক জানেন। তারপর সে সেলিমের দুই হাঁটুর মাঝখানে মাথা রেখে ফোঁপাতে লাগল।
সেলিম তার মাথায় হাত বলাতে বুলোতে ভাঙ্গা গলায় বলল, কাঁদিসনে বোন কাঁদিসনে, উঠে বস। কি করবি বল? উপরের দিকে আঙুল তুলে বলল, সবকিছু উনি করছেন। ওখানে মানুষের কিছু করার ক্ষমতা নেই। হারে, লাইলীর আরা মারা গেলেন, তোরা বুঝি সে খবর জানিস নি?
