অফিসের ম্যানেজার একটি পদের জন্য দেড়শত ছেলে মেয়ের দরখাস্ত দেখে হাঁপিয়ে উঠলেন। কি করবেন ঠিক করতে না পেরে প্রথমে হাতের লেখা দেখতে লাগলেন। কয়েকটা দেখার পর লাইলীর ফটো ও হাতের লেখা দেখে অবাক হয়ে চিন্তা করলেন, আল্লাহপাক মেয়েটিকে যেমন রূপ দিয়েছেন তেমনি হাতের লেখাও বটে। এরপর তিনি আর কোনো দরখাস্ত দেখলেন না। লাইলীকে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠালেন। এই অফিসটা সেলিমদের। সে এটা উদ্বোধন করার পর এ্যাকসিডেন্ট করে। তারপর অনেক দিন বন্ধ ছিল। সোহানা বেগম যখন সেলিমকে নিয়ে তার চিকিৎসার জন্য সুইজারল্যাণ্ড গেলেন তখন তিনি চিটাগাং এর অফিস চালু করার জন্য ম্যানেজারকে বলে যান। তাঁরই নির্দেশে ম্যানেজার সাহেব কয়েকদিন আগে আবার অফিস খুলেছেন। অনেক লোক আগেই এপয়েন্টমেন্ট হয়ে কাজ করেছে। কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় একজন ষ্টেনোর দরকার হয়ে পড়ে। তাই কাগজে বিজ্ঞাপন দেন। যেদিন সোহানা বেগম লাইলীকে পূত্রবধূ করার কথা ফাংশানে ঘোষণা করেন, সেদিন ম্যানেজার মিটিং এ থাকলেও শরীর খারাপ থাকায় ফাংশান শুরু হওয়ার আগেই চলে যান। সেদিন তিনি লাইলীকে দেখেননি। তাই আজ তার ফটো দেখে তাকে চিনতে পারলেন না। কিন্তু তার মরা মেয়ের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিল দেখে অবাক হয়ে গেলেন। ইন্টারভিউ এর দিন চুরুট ধরিয়ে লাইলীর ফটোর সঙ্গে নিজের মেয়ের মিল দেখছিলেন।
লাইলী চীটাগাং এসে মাকে হোটেলে রেখে নির্দিষ্ট সময়ে ইন্টারভিউ দিতে গেল। অফিসে পৌঁছে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে ম্যানেজারের রুমের দিকে এগোল।
দরজার বাইরে টুলে পিয়ন বসেছিল। একজন বোরখা পরা মেয়েকে এগিয়ে আসতে দেখে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন? ম্যানেজার সাহেব পিয়নকে বলে রেখেছেন, একজন বোরখা পরা মহিলা ইন্টারভিউ দিতে আসবেন। আসলে তাকে ভিতরে পাঠিয়ে দিও।
পিয়নের কথা শুনে লাইলী বলল, জ্বি।
পিয়ন বলল, আপনি ভিতরে যান।
দরজায় ভারী পর্দা ঝুলছে। লাইলী পর্দা ফাঁক করে দেখল, একজন বয়স্ক ভদ্রলোক চেয়ারে বসে চুরুট টানছে। লাইলী বলল, মে আই কাম ইন স্যার? বলা বাহুল্য সে তখন মুখের নেকাব সরিয়ে দিয়েছে।
ম্যানেজার সাহেব লাইলীর কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠে তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। একটা মেয়ে যে আসবার অনুমতি চাচ্ছে, সেকথা ভুলে গেলেন।
ভদ্রলোককে তার দিকে ঐভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে লাইলীর মনে হল লোকটা যেন অবিশ্বাস্য কিছু দেখছে। সে খুব অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। কোনো রকমে আবার বলল, “মে আই কাম ইন স্যার”?
এবার ম্যানেজার সাহেব স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, অফকোর্স। এস মা এস, আমি তোমারই জন্য অপেক্ষা করছি। লাইলী ভিতরে এলে তাকে সামনের চেয়ার দেখিয়ে বললেন, বস। তারপর প্রশ্ন করলেন, তুমি চাকরি করতে চাও কেন?
লাইলী বলল, দেখন, এটা একান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন। তার উপর আমি মেয়েছেলে। এরকম প্রশ্ন শুধু পিতৃস্থানীয় ব্যক্তি করতে পারেন। চাকরির ইন্টারভিউতে এরকম প্রশ্ন হবে জানলে আসতাম না। আপনার অফিসে ষ্টেনো দরকার। সে কাজের উপযুক্ত কিনা পরীক্ষা করতে পারেন। ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রশ্ন করলে ফিরে যাব।
এতক্ষণ ম্যানেজার সাহেব চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে চুরুট টানতে টানতে সব কথা শুনছিলেন। লাইলী থেমে যেতে সোজা হয়ে বসে তার দিকে চেয়ে বললেন, তুমি একদম ছেলেমানুষ। চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসে এরকম কড়া কড়া কথা বললে কোথাও তোমার চাকরি হবে না। যাক, যা জানার তা জানা হয়ে গেছে। এখন তোমার কথায় ফিরে আসি। তুমি একটু আগে বলেছ, ব্যক্তিগত ব্যাপারে পিতৃস্থানীয় লোক প্রশ্ন করতে পারে। আমি নিজেই সে স্থান দখল করে কয়েকটি কথা জিজ্ঞেস করছি। দরখাস্তে তোমার পিতার নামের আগে লেট লেখা দেখে বুঝেছি তিনি নেই। তোমার কি আর কেউ গার্জেন নেই?
লাইলী কয়েক সেকেণ্ড ম্যানেজারকে বুঝবার চেষ্টা করল। তারপর যখন মনে হল লোকটার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই তখন বলল, শুধু মা আছেন। চাচা একজন আছেন। তাদের সঙ্গে ঐ ব্যক্তিগত কারণে অনেক দিন থেকে মনোমালিন্য। বড় এক ভাই ছিল, আল্লাহপাক তাকেও দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছেন। আপনি হয়তো ভাবছেন, লাক্সারী করার জন্য আমি চাকরি করতে চাইছি। আমাকে দেখে কি সে রকম ভাবতে পারছেন? দেখুন, সত্যিই আমার একটা চাকরি খুব দরকার। আর ইন্তেকালের পর মায়ের শরীর খুব ভেঙ্গে পড়েছে। আব্বা চাকরি করতেন। হার্টের অসুখে হঠাৎ করে মারা গেছেন। ঢাকায় শুধু আর পৈত্রিক চার কামরা ঘর আছে। অনেক চিন্তাভাবনা করে চাকরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হঠাৎ লাইলী লক্ষ্য করল, লোকটার চোখ অশ্রুতে ঢল ঢল করছে। নিজের দুঃখের কথা এতক্ষণ বলছিল, কোনো দিকে তার খেয়াল ছিল না। তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, আপনার চোখে পানি কেন? কিছু পড়েছে নাকি?
ম্যানেজার সাহেব রুমাল বার করে চোখ মুছে বললেন, চোখে কিছু পড়েনি মা, মনে কিছু পড়েছে। আমার একটা মেয়ে ছিল, বেঁচে থাকলে আজ ঠিক তোমার মতো এত বড় হত। পনের বছর বয়সে ম্যানেনজাইটীস হয়ে মারা গেছে। দরখাস্তের সঙ্গে তোমার ফটো দেখে আমার মেয়ের কথা মনে পড়ে। তার গড়ন ছিল ঠিক তোমার মতো। এখন তোমার কথাশুনে মনে হচ্ছে, তার গলার স্বরও তোমার মতো। প্রথমে তোমার গলার আওয়াজ শুনে মনে হয়েছিল, ছয় বছর পর মেয়ের গলা শুনছি। তবে সে তোমার মত এতো সুন্দরী ছিল না। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি আগামীকাল থেকে জয়েন কর। কালকেই তোমাকে এপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়ে দেব।
