জলিল সাহেব একমাসের মধ্যে তার বাবার সার্ভিসের টাকা তুলে এনে লাইলীর হাতে দিয়ে বললেন, খালুজানের কুলখানি তো করা দরকার।
লাইলী বলল, আমি পাঁচ খতম কোরআন শরীফ পড়ে তার রূহপাকের উপর বখশে দিয়েছি। লৌকিক প্রথা আমি মানি না। রাসুলুল্লাহ (দঃ) ও তাহার সাহাবীদের জামানায় ঐ প্রথা ছিল না। ওসব লোক দেখান। তবে এই টাকা থেকে আবার নামে কিছু মসজিদ ও মাদ্রাসায় দান করব। তাতে বরং আল্লাহপাক খুশি হয়ে আব্বাকে ক্ষমা করতে পারেন।
রহিমা ও হামিদা বানু সেখানে ছিল। অনেক দিন পর লাইলীকে এত কথা বলতে দেখে খুশি হল।
লাইলী আবার বলল, ভাইয়া, আমি ক’দিন থেকে চিন্তা করছি, মাকে নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যাব। তোমরা কিন্তু এখানে থাকবে।
জলিল সাহেব বললেন, বেশ তো যাবে।
দেখতে দেখতে ছয় মাস কেটে গেল। দান খয়রাত করার পর হাতে যা টাকা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু ঘরের ভাড়া দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলছে। লাইলী সাদেককে পড়ান বন্ধ করে দিয়েছে। ইলেট্রিক বিল, পানির বিল, গ্যাসের বিল ও পৌর ট্যাক্স অনেক বাকি পড়েছে।
এদিকে মনিরুল চিন্তা করল, সেলিম ভালো হয়ে গেলে জেনে যাবে, চিঠিটা কেউ শত্রুতা করে দিয়েছে। তখন সে লাইলীকে বিয়ে করবেই। তাই নাজমুলকে দিয়ে লাইলীদের সব খবর রাখছে। একদিন নাজমুলের সঙ্গে তাদের বাড়িতে গিয়ে তার বাবার সঙ্গে পরিচয় করার পর নাজমুলের বিয়ের কথা পাড়ল।
উনি বললেন, আমি তো বিয়ে দিতে চাই, কিন্তু ওতো ওর চাচাতো বোন লাইলীকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করতে চায় না। আপনি ওকে বোঝান তো বাবা?
মনিরুল বলল, লাইলীর সঙ্গে বিয়ে দেননি কেন?
আমি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলুম, ওরা না করে দিয়েছে।
মনিরুল বলল, সে তখন ওর বাবা বেঁচে ছিলেন। এখন আর একবার দিয়ে দেখুন। আমার মনে হয় রাজি হয়ে যাবে।
ঠিক আছে, আপনি যখন বলছেন তখন না হয় আর একবার বলেই দেখব। মনিরুল বলল, দেখব নয়, আজ এক্ষুণি যান। আমি ফলাফল শুনে যেতে চাই।
ছেলের মনিবকে এভাবে কথা বলতে দেখে নাজমুলের বাবা ভাবলেন, ছেলে হয়তো তাকে এই জন্যে ডেকে এনেছে। তিনি তখুনি লাইলীদের বাড়ি গিয়ে বড় ভাবির কাছে আবার বিয়ের প্রস্তাব দিলেন।
চাচাকে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে দেখে লাইলী দরজার আড়ালে দাঁডল।
হামিদাবানু বললেন, লাইলীর আব্বা যে বিয়েতে অমত ছিলেন, এখন আমি তো সে কাজ করতে পারি না। তা ছাড়া মেয়ে আমার বড় হয়েছে। লেখাপড়া করেছে। তারও তো একটা মতামত আছে। আমি যে কি করব ভাই, ভেবে কিছু ঠিক করতে পারছি না।
লাইলী মায়ের বিচলিত অবস্থা দেখে ঘরের ভিতরে ঢুকে বলল, চাচাজান, আমার মন মেজাজ ভালো নেই। আমি এখন বিয়ে করব না। চাকরি করব চিন্তা করছি। আপনি নাজমূল ভাইয়ের বিয়ে অন্য কোথাও ঠিক করুন।
ভাইঝীকে মুখের উপর না করে দিতে দেখে নাজমুলের আরা খুব রেগে উঠে বললেন, বড় ভাই-এর এতিম মেয়েকে বেঁচে বউ করব বলে এসে ছিলাম। নিজেকে কি মনে কর তুমি? চিরকাল কুমারী থাকবে নাকি? আমার কথা মেনে নিলে ভালো করতে। আজকাল মেয়েরা লেখাপড়া করে একদম বেহায়া হয়ে যাচ্ছে। বাপ চাচাদের সামনে নিজের বিয়ের কথা বলতে লজ্জা বোধ করে না। যা খুশি কর, কিন্তু বংশের মুখে চুনকালি দিও না। এইতো একটা বড় লোকের ছেলেকে ফাসিয়ে ছিলে? কেন তারা বিয়ে ভেঙ্গে দিল? তারপর রাগে গর্জন করতে করতে চলে গেল।
ফিরে এসে নাজমুলের আ মনিরুলকে বললেন, মেয়ে তো নয়, যেন দাজ্জাল। সে এখন বিয়ে করবে না, চাকরি করবে। চাকরি যেন হাতের মোয়া। ইচ্ছে করলেই গালে পুরে দেবে। মেয়ের না হয় একটু রূপ আছে। তা বলে অত অহংকার ভালো নয়। আল্লাহ তাঁর রাসূলের (দঃ) অহংকার রাখেননি। আপনি একটা মেয়ে দেখে যদি ওকে বুঝিয়ে বিয়েটা দিয়ে দেন, তা হলে ওদেরকে দেখিয়ে দিতাম, আমার ছেলে অত ফেলনা নয়। উপযাজক হয়ে দু’বার গেছি। দু’বারই অপমান করে ফিরিয়ে দিয়েছে। বেঁচে থাকি তো দেখব, কোন রাজপুত্রের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়।
মনিরুল চেষ্টা করব বলে ফিরে আসার সময় চিন্তা করল, যত সহজে কাজটা হবে ভেবেছিলাম তা হবে না। তবে সেলিমের সঙ্গে ওর বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছি। নাজমুলের সঙ্গে লাইলীর বিয়ে হোক আর না হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। সেলিম ভালো হয়ে কিছু করার আগে রেহানা যেন তাকে কবজা করে নেয়, সে কথা ওকে বলে দিতে হবে।
———
(১) সূরা বাকারা, ১৫৩-আয়াত, পারা-২।
(২) সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-১৫, পারা-১৫।
০৮. লাইলী প্রতিদিন খবরের কাগজে
লাইলী প্রতিদিন খবরের কাগজে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে। মনের মত পেলে সেখানে দরখাস্ত করে। কয়েক জায়গায় ইন্টারভিউও দিয়েছে। কিন্তু চাকরি হয়নি। তার মনে হয়েছে, বোরখা পরে যাই বলে চাকরি হয়নি। বোরখা না পরে গেলে তার রূপ দেখে নিশ্চয় হত। একদিন কাগজে চিটাগাং-এ একটি নূতন অফিসের জন্য একজন ষ্টেনো দরকার। মহিলারাও দরখাস্ত করতে পারে। এক কপি পাশপোর্ট সাইজ ছবি ও বায়োডাটাসহ স্বহস্তে লেখা দরখাস্ত চেয়েছে। লাইলী অনেক চিন্তা ভাবনা করে বোরখা পরে শুধু মুখটা খোলা রেখে ফটো তুলে বায়োডাটাসহ সেখানে দরখাস্ত পাঠাল। তার হাতের লেখা খুব ঝরঝরে ও অতি সুন্দর। এর মধ্যে সে সর্টহ্যাণ্ড ও টাইপ শিখেছে।
