রহমান সাহেব সোহানা বেগমের রাগ দেখে প্রথমে থতমত খেয়ে গেলেন। পরে সামলে নিয়ে ধীরভাবে বললেন, আপনারা আমার ও আমার মেয়ের বিরুদ্ধে কার কাছে কি শুনেছেন, তা আমি জানতে চাই না। বরং আপনি জেনে রাখুন, “এক জনের পাপের ফল আর একজনের উপর বার্তায় না।“(২) এটা কোরআন পাকের কথা। ওসব কথা থাক, আমি আপনাদের জিনিষগুলো ফেরৎ দিতে এসেছি। তারপর বালা দুগাছা ও হারটা এবং কাগজে মোড়া সোহানা বেগমের সাড়ি ও ব্লাউজ, যেগুলো পরে সেই ঝড় বৃষ্টির দিন লাইলী ঘরে ফিরেছিল, সেই প্যাকেটটা টেবিলের উপর রেখে দিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, সেলিম এখন কেমন আছে? আহা ছেলেটা বড় ভালো। দোয়া করি, আল্লাহপাক তাকে শিঘী ভালো করে তুলুন।
জিনিষগুলো ফেরৎ দিতে দেখে সোহানা বেগমের মনে খচখচ করে বিধল। কিন্তু সেলিমের কথা জিজ্ঞেস করতে আবার রেগে গেলেন। বললেন, সে কেমন আছে অত খোঁজের আর দরকার কি? যান চলে যান। আর কখনও আসবেন না।
যাব বোন যাব, আমি তো থাকতে আসিনি। আর টাকার জন্যও আসিনি। আপনি অত রাগ করছেন কেন? আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু লোভী না। শুধু ছেলেটাকে দেখতে চেয়েছিলাম। ফিরে গেলে মেয়ে যখন জিজ্ঞেস করবে সেলিম সাহেবকে কেমন দেখলেন? তখন কি বলব? না দেখে মিথ্যা করে তো কিছু বলতে পারব না। আর জেনে রাখুন, আপনারা বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছেন বলে আমার তেমন দুঃখ হয়নি। কারণ আল্লাহপাক প্রত্যেক নারীকে তার স্বামীর বাম পাঁজর থেকে তৈরি করেছেন। আমরা যার সঙ্গে যার বিয়ে ঠিক করি না কেন, তিনি যার সংগে যার জোড়া তৈরি করে রেখেছেন, সেখানে হবেই। তাকে যখন আমরা বিশ্বাস করি, তখন আর এ নিয়ে দুঃখ করলে তাকে অমান্য করা হবে। শুধু মেয়েটার জন্য বড় চিন্তা হয়। সে এখনও এতটা জ্ঞান লাভ করেনি। মা আমার চিঠি পড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল। যাক বোন, আল্লাহপাক তার বান্দাদের মঙ্গলের জন্য সবকিছু করেন। তাঁর কাজের উপর আমাদের অসন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয়। যাওয়ার সময় একটা কথা বলে যাই, আপনি বোধ হয় কোথাও ভুল করেছেন। যার ফলে আমার নিস্পাপ মেয়ের উপর দুর্ণাম দিয়ে কথা বলেছেন। এখন আসি, অনেক কথা বললাম, অন্যায় কিছু হলে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ হাফেজ বলে রহমান সাহেব ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সোহানা বেগম লাইলীর বাবার কথাগুলো শুনে ভাবলেন, লোকটাকে কত অপমান করলাম, অথচ সেসব গায়ে না মেখে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে কত উপদেশ দিয়ে গেলেন। এরকম লোক কোনোদিন ঠকবাজ হতে পারেন না। কিন্তু যখন তার চিঠি ও ছেলের বিপদের কথা মনে পড়ল তখন রাগটা আবার জেগে উঠল।
রহমান সাহেব সেলিমদের বাড়ি থেকে ফিরে সেই যে বিছানা নিলেন, আর উঠলেন না। রাতে হার্টের ব্যাথাটা জোর করল। লাইলী ডাক্তার নিয়ে এল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। ভোরে যখন ফজরের আযান হচ্ছিল তখন মারা গেলেন। লাইলী বাপের পা দুটো জড়িয়ে ধরে পাথরের মত বসে রইল। খবর পেয়ে চাচা চাচি, পাড়া-পড়শী সবাই এল। রহিমা ও জলিল সাহেব রাত জেগে সেখানে ছিল। সবাই লাইলীকে ঐভাবে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে গেল। মেয়েরা বলাবলি করতে লাগল, লাইলীর কি শক্ত জানরে বাবা? বাবা মরে গেল অথচ মেয়ের চোখে এক ফোঁটা পানি নেই।
রহিমা কিন্তু বুঝতে পারল, লাইলী ভীষণ শক পেয়েছে। দু’দুটো দুঃখজনক ঘটনায় তার অন্তরটা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। তাই কাঁদতে পারছে না।
সে লাইলীকে ধরে জোর করে নিজের ঘরে নিয়ে এলে লাইলী মন্ত্রচালিতের মত খাটে শুয়ে পড়ল। হামিদা বানু খুব কান্নাকাটি করছেন। রহিমা ফিরে এসে তাকে প্রবোধ দিতে লাগল। জলিল সাহেব খালুজানের দাফন করে যখন ফিরে এলেন তখন বেলা গড়িয়ে গেছে। লাইলীর চাচাদের বাড়ি থেকে ভাত এসেছিল। সাদেক ও ফিরোজকে খাইয়ে রহিমা স্বামীকে বলল, তুমিও একমুঠো খেয়ে নাও।
জলিল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, খালা আম্মা, লাইলী ওদেরকে খাইয়েছ?
না, খালা আম্মাতো কেঁদে কেঁদে পাগল। আর লাইলী সেই যে ঘুমিয়েছে এখনও উঠেনি।
জলিল সাহেব বললেন, সত্যি ওর জন্য খুব দুঃখ হয়। কি যে করবে মেয়েটা আল্লাহপাক জানেন। ওদেরকে খাওয়াবার চেষ্টা করে তুমিও কিছু খাও।
রহিমা অনেক চেষ্টা করেও হামিদা বানুকে খাওয়াতে পারল না। লাইলীকে তো ঘুম থেকে জাগাতেই পারল না। শেষে নিজে দু’মুঠো কোনো রকমে খেয়ে এসে স্বামীকে বলল, দেখ, খুব চিন্তার কথা, খালুজান মারা গেলেন, কিন্তু লাইলী একটুও কাদেনি। মনে হয় ওর কলিজা ফেটে গেছে, তাই কাঁদতে পারছে না।
জলিল সাহেব বললেন, ও এখন খুব ক্লান্ত। দু’দুটো শোক এক সঙ্গে পেয়েছে। তাই কাঁদতে পারছে না। ঘুম ভাঙলে যদি কান্নাকাটি করে তবে ভালো, নচেৎ ডাক্তার দেখাতে হবে। তা না হলে পাগল হয়ে যেতে পারে।
রাত্রেও লাইলী জাগল না। পরের দিন ভোরে উঠে ফজরের নামায পড়ে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করল। তারপর কেঁদে কেঁদে আর রুহের মাগফেরাতের জন্য আল্লাহপাকের দরবারে দোয়া করতে লাগল।
রহিমা ফজরের নামায পড়ে উপরে গিয়ে লাইলীকে কেঁদে কেঁদে দোয়া করতে দেখে নিশ্চিন্ত হল। নিচে এসে স্বামীকে সে কথা জানাল।
.
বাবার মৃত্যুর পর লাইলী আর হেসে কারও সঙ্গে কথা বলে না। সব সময় কি যেন চিন্তা করে।
