তিনি বললেন, এ অবস্থায় তো আর বিয়ে হতে পারে না? ওদের সবকিছু জানিয়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিয়ের দিন পিছিয়ে দাও।
সোহানা বেগম বললেন, আমি এ বিয়ে একদম ভেঙ্গে দেব। আমার মনে হয়, মেয়েটা অপয়া। তা না হলে এরকম হবে কেন?
জাহিদ সাহেব বললেন, তুমি যা ভালো বোঝ তাই কর।
সেখানে রুবীনা ও আসমা ছিল। শুনে রুবীনা খুশি হল। কারণ লাইলীকে সে মোটেই পছন্দ করে না। বড় সেকেলে বলে তার মনে হয়। রেহানাকে এ বাড়ির উপযুক্ত বলে সে মনে করে। কিন্তু আসমার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। লাইলীর ব্যবহার তাকে খুব ভালো লাগে। অমন সুন্দরী মেয়ে চরিত্রহীনা, অপয়া এটা যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না।
সেলিমের খবর পেয়ে রেহানা এ বাড়িতে ঘনঘন যাতায়াত করতে আরম্ভ করল। সে প্রতিদিন এসে প্রায় সারাদিন সেলিমের তত্ত্বাবধান করে।
বিয়ের তিন দিন আগে সোহানা বেগম অনেক ভেবে চিন্তে একটা পত্র লিখে ড্রাইভারের হাতে লাইলীদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন।
রহমান সাহেব পত্র পড়ে সেইখানেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
লাইলী বাপের অবস্থা দেখে ছুটে এসে বলল, কি হল আরা, তুমি অমন করছ কেন? তারপর চিঠিটা দেখতে পেয়ে বলল, দেখি কার চিঠি?
রহমান সাহেব যন্ত্রচালিতের মত চিঠিটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
লাইলীর কথা শুনতে পেয়ে হামিদা বানুও হাতের কাজ রেখে ছুটে এলেন। লাইলী চিঠি নিয়ে জোরে জোরে পড়তে লাগল।
রহমান সাহেব,
আপনাকে অত্যন্ত দুখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমরা অনেক কারণে এ বিয়ে ভেঙ্গে দিলাম। তার মধ্যে প্রধান কারণ হল, সেলিম একসিডেন্ট করে বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। আর এটা হয়েছে আপনার মেয়ে লাইলীর মতো অপয়া, দুশ্চরিত্রা ও কুলক্ষণা মেয়ের জন্য। তার দৃশ্চরিত্রের কথা বাইরের লোক এসে জানাবে কেন? মনে করেছেন, সুন্দরী মেয়েকে দিয়ে আমাদের মতো সরল মানুষকে ঠকিয়ে ঐশ্চর্য্য ভোগ করবেন? গরিব হয়ে অত লোভ কেন? মনে রাখবেন, পাপ কোনোদিন ঢাকা থাকে না। বারেক বিয়ের আগে আমরা সব কথা জানতে পারলাম। নচেৎ বিয়ে হয়ে গেলে যে কি হত আল্লাহকে মালুম।
আশা করি, ভবিষ্যতে যা কিছু করবেন, ভেবে চিন্তে করবেন।
ইতি–
সেলিমের মা সোহানা বেগম।
চিঠি পড়তে পড়তে লাইলী নীল হয়ে গেল। পড়া শেষ হতে কয়েক মুহুর্ত নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল, তারপর গাছ কাছাড় খেয়ে পড়ে জ্ঞান হারাল।
মেয়ের অবস্থা দেখে হামিদা বানু কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আল্লাহ গো, এ তুমি কি করলে, আমার মাসুম কলিজার টুকরা এত ব্যথা কি করে সহ্য করবে?
রহমান সাহেবের চোখ থেকে পানি পড়ছিল। বললেন, তুমি আল্লাহকে দোষ দিচ্ছ? ছি ছি, গোনাহগার হবে যে। তিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। যখন যা প্রয়োজন ঠিক সময়ে তা করে থাকেন। আমরা বর্তমানকে খারাপ দেখে তাকে দোষারুপ করলে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন। সুখে দুঃখে সব সময় তার উপর সন্তুষ্ট থাকা উচিত। ও ছেলেমানুষ, খবরটা জেনে সহ্য করতে পারেনি। তুমি ওর মাথায় পানি দিয়ে পাখার বাতাস দাও।
বেশ কিছুক্ষণ মাথায় পানি ঢালার পর লাইলী জ্ঞান ফিরে পেয়ে উঠে বসল। তারপর হাত থেকে বালা দটো ও গলা থেকে নেকলেস খুলে বাপের হাতে দিয়ে বলল, এগুলো এক্ষুণি ওদের ফিরিয়ে দিয়ে এস। আর সেলিম সাহেব কেমন আছেন দেখে আসবে। তুমি যেন আবার তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করো না। শুধু বলবে, গরিবদের সঙ্গে আত্মীয়তা না হয় না করলেন, তাই বলে তাদের নামে দুর্ণাম দেবেন কেন? আপনারা বড় লোক হতে পারেন, কিন্তু আল্লাহপাকের ন্যায় বিচারের কাছে সবাই সমান।
রহমান সাহেব বললেন, তাই হবে মা। এত তাড়া কিসের? আমরা তো আর তাদের জিনিষ বিক্রি করে খেয়ে ফেলছি না? জলিল সাহেবকে সবকিছু জানাই, তারপর যা হয় করা যাবে।
লাইলী আর কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে নিজের রুমে চলে গেল।
রাত্রে রহমান সাহেব জলিল সাহেবকে চিঠিটা দিলেন।
জলিল সাহেব চিঠি পড়ে খুব মর্মহত হলেন। বললেন, আল্লাহপাকের কি মহিমা তা তিনিই জানেন। আমরা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারি না। সেই পরম করুণাময়ের কাছে সবর করে থাকেন। তিনি কালাম পাকে বলেছেন “আল্লাহ সাবেরীনেদের সঙ্গে থাকেন।“(১) তারপর জিজ্ঞেস করলেন, লাইলী খবরটা শুনেছে?
হ্যাঁ, চিঠিটা পড়ে মেয়ে তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। জ্ঞান ফিরে পেয়ে গহনাগুলো খুলে দিয়ে বলল, যাদের জিনিষ তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়ে এস।
জলিল সাহেব বললেন, লাইলী ঠিক কথা বলেছে। কাল সকালে আপনি ওগুলো ফিরিয়ে দিয়ে আসবেন।
পরের দিন রহমান সাহেব বেলা নটার সময় বালা ও হার নিয়ে সেলিমদের বাড়িতে গেল। একজন সাধারণ অচেনা লোককে ভিতরে ঢুকতে দেখে দারোয়ান বাধা দিল।
রহমান সাহেব বললেন, আমি সেলিমের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। দারোয়ান তবুও যখন যেতে দিল না তখন বললেন, ওঁকে গিয়ে বল, লাইলীর আব্বা এসেছে।
দারোয়ান তাকে অপেক্ষা করতে বলে ভিতরে গেল। একটু পরে ফিরে এসে যেতে বলল।
সোহানা বেগম তৈরি ছিলেন। রহমান সাহেব ঘরে ঢুকতে বললেন, আপনি আবার এসেছেন কেন? আপনার মেয়ের জন্য আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। আপনার চরিত্রহীনা মেয়ের জন্য যদি সাফাই গাইতে এসে থাকেন, তা হলে ভুল করেছেন। চলে যান। এভাবে মেয়েকে দিয়ে টোপ ফেলে আর কতদিন রোজগার করবেন?
