এদিকে সোহানা বেগমও চিঠি পেয়ে পড়তে লাগলেন–
শ্রদ্ধেয়া,
আমি আপনাদের পরিচিত লোক। বিশেষ কারণবশতঃ পরিচয় দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত। সেলিমের সংগে লাইলীর বিয়ে হবে শুনে আপনাকে কয়েকটা কথা না বলে থাকতে পারলাম না। আপনারা বড়লোক ও উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। কেন জানি না, লাইলীর মতো একটা চরিত্রহীনা মেয়েকে ঘরের বৌ করতে যাচ্ছেন। তার সম্বন্ধে ভালভাবে খোঁজ-খবর নিলে দেখবেন, সে মোটেই ভালো মেয়ে নয়। তার চাচাত ভাইয়ের সাথে বিয়ের কথা হয়েছিল। লাইলী বিয়ের কয়েকদিন আগে পাড়ার একটা ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায়। কি করে যেন পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দিয়ে যায়। সেই জন্য তার চাচাতো ভাই তাকে বিয়ে করেনি। মেয়েটা শুধু দেখতেই যা রূপসী। রূপ দিয়ে অনেক ছেলের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করেছে। আপনারা নিশ্চয় জানেন, “অল দ্যাট গীটার ইজ নট গোল্ড”। বেশি কিছু আর বলতে চাই না, জ্ঞানী হলে অল্পতেই বুঝতে পারবেন।
ইতি–
আপনাদের শুভাকাখি।
চিঠি পড়ে সোহানা বেগম যেন গাছ থেকে পড়লেন। চিঠিতে অনেক অবান্তর কথা থাকলেও কিছু কথা ঠিক। ভাবলেন, ওদের মহল্লার অন্যান্য লোকের কাছে তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত ছিল। যদি সত্যিই লাইলীর চরিত্র খারাপ হয়? নাহ, কিছুই যেন তার মাথায় আসছে না। কে নাম ঠিকানা ছাড়া পত্র দিল? শেষে তার মনে হল, কেউ হয়তো এভাবে বিয়ে ভাঙ্গিয়ে দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। সেলিমও বাড়িতে নেই, চিটাগাং গেছে। সে বাড়িতে থাকলে তার সঙ্গে যুক্তি করা যেত। তারও খোঁজ খবর নেই। নানান চিন্তায় তিনি খুব অস্থির হয়ে পড়লেন। সেলিমকে আসার জন্য একটা টেলিগ্রাম করে দিলেন।
সেলিম আজ এক সপ্তাহ হল চিটাগাং এসেছে। সেখানে একটা বাড়ি কিনে নূতন অফিস খুলবে। সেই জন্য ম্যানেজারকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। সুন্দর দেখে একটা দোতলা বাড়ি কিনে নিচে অফিস ও উপরে থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অফিসের জন্য ফার্ণিচার কিনে ফেরার পথে সেলিমের গাড়ির সঙ্গে একটা ট্রাকের মখোমখী এ্যাক্সিডেন্ট। গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। মাথায় বেশি আঘাত পেয়েছে। ম্যানেজার সাহেবও একই গাড়িতে ছিলেন। অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে গেছেন। তার আঘাত সামান্য। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি সেলিমদের বাড়িতে টেলিগ্রাম করে দিলেন।
টেলিগ্রাম পেয়ে সোহানা বেগমের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। পিয়নকে দেখে আসমা ও রুবীনা এই দিকে আসছিল। মায়ের মুখ রক্তশূন্য দেখে ছুটে আসে টেলিগ্রামটা পড়ল, সেলিম সিরিয়াসলি উনডেড। হি ইজ ইন ডেঞ্জার। কাম সার্প।
রুবীনা মাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বলল, চল মা আমরা এখুনি রওয়ানা দিই।
সোহানা বেগম ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছেন। ডাইভারকে গাড়ি বার করতে বলে রুবীনাকে বললেন, আমি একা যাব’। তুমি আর আসমা এদিকে দেখাশুনা করবে। তারপর তৈরি হয়ে গাড়িতে উঠলেন। তিনি যখন চিটাগাং হসপিটালে পৌঁছালেন তখন রাত্রি নটা। আজ তিন দিন সেলিমের জ্ঞান ফিরেনি। মাথা পাষ্টার করা। সোহানা বেগম ছেলের অবস্থা দেখে মুষড়ে পড়লেন। অনেক টাকা খরচ করে কেবিনের ও স্পেশাল চিকিৎসার জন্য বড় ডাক্তারের ব্যবস্থা করলেন।
পরের দিন বেলা এগারটায় সেলিমের জ্ঞান ফিরল। ডাক্তার বললেন, রুগী এখন আউট অফ ডেঞ্জার। আপনারা ঘাবড়াবেন না। তবে আজও যদি জ্ঞান না ফিরত, তা হলে রুগীকে বাঁচান যেত কিনা সন্দেহ।
সোহানা বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই চিঠির কথা মনে পড়তেই ভাবলেন, লাইলী সুন্দরী হলে কি হবে, সে বড় অপয়া। তা না হলে বিয়ের তারিখ ঠিক হতে না হতে ছেলে আমার বিপদে পড়ল। আবার ভাবলেন, লাইলীর মতো মেয়ে অপয়া দুশ্চরিত্রা হতে পারে না। আর ঐ লোকটাই বা কেন উপযাজক হয়ে বেনামে তার দুর্ণাম দিয়ে বিয়ে ভাঙ্গাতে চাচ্ছে? এতে কি তার কোনো স্বার্থ আছে? নানা চিন্তায় তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। শেষে ভেবে ঠিক করলেন, সেলিম ভালো হোক, তারপর তাকে লাইলীর সব কিছু জানিয়ে যা করা যাবে।
সেলিমের জ্ঞান ফিরল ঠিকই, কিন্তু সে কথা বলতে পারছে না। সকলের দিকে শুধু চেয়ে চোখের পানি ফেলে। সোহানা বেগম এর কারণ ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেন।
ডাক্তার বললেন, এ রকম অনেক সময় হয়। ব্রেনে বেশি আঘাত পেলে অনেকে বাকশক্তি অথবা স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলে। কিন্তু ইনি তো দেখছি দুটোই হারিয়েছেন।
সোহানা বেগম আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে কি সেলিম আর কখন কথা বলতে পারবে না? স্মৃতি শক্তি ও কী ফিরে পাবে না?
সেটা আমরা এখন ঠিক বলতে পারছি না। দেখা যাক, রুগী আগে সুস্থ হয়ে উঠুক। আমরা নরম্যালে আনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছি, বাকি আল্লাহপাকের মর্জি।
সেলিম ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু সে কথা বলতে পারল না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে থাকে।
সোহানা বেগম ছেলেকে ঢাকায় এনে বড় বড় ডাক্তার দেখালেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। তার দৃঢ় ধারণা হল, লাইলী নিশ্চয় অপয়া মেয়ে। সেই জন্য ছেলের এই অবস্থা। তিনি বড় ভাই জাহিদ সাহেবকে একদিন বললেন, বিয়ের দিন তো প্রায় এসে গেছে। আমি এখন কি করব?
