কি হল তুমি আমার কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন? নামটা শুনে খুব অবাক হয়েছ দেখছি।
দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে নাজমুল বলল, লাইলী আমার বড় চাচার মেয়ে। তার সঙ্গে আমার বিয়ের কথা হয়েছিল।
বিয়ের কথা হয়েছিল? হল না কেন?
আপনি যখন তার কথা জানতে চান তখন সব কথা খুলে বলছি শুনুন, অনেক দিন থেকে চাচাদের সাথে আমাদের মনোমালিন্য। কিন্তু আমি ছেলেবেলা থেকে লাইলীকে ভালবাসি। বেশ কিছুদিন আগে আমি তাকে আমার মনের কথা বলে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। আমার কথা শুনে লাইলী বলল, দেখ নাজমুল ভাই, তুমি যে রকম ছেলে, সেই রকমের মেয়েকে বিয়ে করা তোমার উচিত। আর একটা কথা মনে রেখ, বামন হয়ে চঁাদে হাত বাড়াতে যেও না। তার কথা শুনে আমি খুব রেগে যাই। সেই সময় প্রতিজ্ঞা করি, যেমন করেই হোক আমি তার দেমাগ ভাঙব। শেষে বাবাকে দিয়ে চাচার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিই। তারা কেউ রাজি হয়নি। আমিও দেখব, কেমন করে অন্য জায়গায় বিয়ে হয়।
মনিরুল বলল, তুমি কি তাকে এখনও ভালবাস? আমি যদি তোমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করি, তা হলে কী তাকে বিয়ে করবে?
নাজমুল ছোট সাহেবের কথা শুনে যেন হাতে চাদ পেল। বলল হাঁ স্যার, তাকে এখনও আমি প্রাণ অপেক্ষা বেশি ভালবাসি। সে ভাগ্য কি আমার হবে স্যার? তা ছাড়া আপনি আমার জন্য এত কিছু করবেন কেন?
মনিরুল বলল, তুমি যদি আমার কথামত কাজ কর, তা হলে তোমার মনোস্কামনা পূর্ণ হতে দেরি হবে না।
আপনি যা বলবেন তাই শুনব স্যার। আপনাকে বলতে আমার আর কোনো লজ্জা নেই, আমি যদি ওকে না পাই, তবে সারাজীবন আর বিয়েই করব না।
ঠিক আছে, আমি তার সঙ্গে তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দেব। তবে তার আগে তোমাকে নিয়ে ওর নামে আমি দুর্ণাম রটাতে চাই। তোমাকে খুলে বলি, ওর সঙ্গে আমার এক আত্মীয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আমি চাই না তার সঙ্গে ওর বিয়ে হোক। তাই তোমার সংগে ওর দুর্ণাম রটিয়ে বিয়েটা ভাঙ্গাতে চাই। কিন্তু তুমি জীবনে কোনোদিন এই কথা কারো কাছে প্রকাশ করবে না। করলে এতে তোমারই বেশি ক্ষতি হবে। আর বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে তুমি লাইলীকে বিয়ে করতে পারবে এবং আমি তোমার প্রমোশনও দিয়ে দেব।
নাজমুল আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বলল, আপনি মনিব, আপনার কথার বিরুদ্ধে আমি এতটুকুও কিছু করব না। কেউ কি স্যার তার নিজের ভবিষ্যৎ কোনোদিন নষ্ট করতে চায়?
মনিরুল বলল, আমি সময় মত সব কিছু তোমাকে জানাব। এখন যাও কাজ করগে। তারপর সে দুটো চিঠি লিখে অফিসের পিওনের হাতে দিয়ে একটা রহমান সাহেবকে ও অন্যটা সোহানা বেগমকে দেওয়ার নির্দেশ দিল। পিওন মনিবের কথা মত কাজ করে ফিরে এলে মনিরুল জিজ্ঞেস করল, দুটো চিঠিই ঠিক লোকের হাতে দিয়েছ তো?
পিওন বলল, হ্যাঁ সাহেব, আমি আগে চিঠির মালিকের নাম জেনেছি, তারপর দিয়েছি।
রহমান সাহেব, পিওনের হাত থেকে চিঠি নিয়ে ঘরে এসে পড়তে লাগলেন।
শ্রদ্ধেয় রহমান সাহেব,
প্রথমে সালাম নেবেন। পরে জানাই যে, আপনি আপনার একমাত্র মেয়ে লাইলীর বিয়ে যে ছেলের সঙ্গে ঠিক করেছেন, তার খোঁজ-খবর নিয়েছেন? ঐশ্বর্যের প্রতি গরিবদের কী এতই লোভ? একমাত্র মেয়েকে না জেনে, না দেখে বড়লোকের ছেলের সাথে বিয়ে দিতে যাচ্ছেন। বড়লোকের ছেলেরা যে কত চরিত্রহীন হয়, তার খোঁজ যদি রাখতেন, তা হলে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে রাজার ছেলেকে জামাই করার স্বপ্ন দেখতেন না। এতটুকুও ভেবে দেখেন নি, অত বড় লোকের ছেলে কেন আপনার মতো গরিব লোকের মেয়েকে বিয়ে করতে চাচ্ছে? মেয়েরা তো তাদের কাছে খেলার সামগ্রী। দুদিন পরে ভালো না লাগলে ব্যবহৃত খেলনার মত ছুঁড়ে ফেলে দেয়। বিয়ে করা মেয়েকে তো আর সে ভাবে ছুঁড়ে ফেলতে পারে না। নেহাত বেকায়দায় পড়ে ঘরে ফেলে রাখে। আর তারা মদ খেয়ে অন্য মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করে বেড়ায়।
যাক আমি আপনার হিতাকাঙ্খী। সেলিমের দুশ্চরিত্রের কথা জানি বলে আপনাকে বাধা দিলাম। আপনার মেয়ে সুন্দরী ও শিক্ষিতা। যদি বলেন, আমি তার জন্য একটা ভালো ছেলে দেখে দেব। সে আপনাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। আশা করি, আপনার মেয়েকে বাদীগিরী করার জন্য বড়লোকের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবেন না। যদি আমাকে শত্রু মনে করে জিদ করে এই কাজ করেন, তবে আপনার মেয়ের শেষ পরিণতির জন্য আপনি দায়ী হবেন। দরকার মনে করলে নিচের ঠিকানায় পত্র দিয়ে জানাবেন।
ইতি।
আপনার জনৈক হিতাকাঙ্খী।
ঠিকানা ও পোস্ট বক্স নাম্বার………….।
চিঠি পড়ে রহমান সাহেব খুব মুষড়ে পড়লেন। তার মনের মধ্যে তখন অনেক রকম চিন্তা হতে লাগল। চিঠিটা যেই লিখুক না কেন, সত্যিই বড়লোকের ছেলেদের চরিত্র আজকাল খুব নিচে নেমে গেছে। খবরের কাগজ খুললে প্রায় প্রতিদিন তা দেখতে পাওয়া যায়। কি করবেন ভেবে ঠিক করতে পারলেন না। ভাড়াটিয়া জলিল সাহেবকে চিঠিটা দেখালেন। উনি বললেন, চিঠিটা যে দিয়েছে, তার নিশ্চয় কোনো মতলব আছে।
রহমান সাহেব বললেন, কার কি এমন মতলব আছে জানি না বাবা, আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না।
জলিল সাহেব বললেন, আপনি বেশি চিন্তা করবেন না। বিয়ের তো এখনও একমাস দেরি। দেখা যাক, এর মধ্যে কোনো কিছু ঘটে কিনা। লাইলীকে এ ব্যাপারে কিছু বলার দরকার নেই।
