রেহানা ভিতরে ভিতরে গুমরাচ্ছিল। কোনো কথা বলতে পারল না। চিন্তা করল, সে এতদিন সেলিমের সঙ্গে মেলামেশা করেও তাকে আকর্ষণ করেত পারল না। মাত্র কয়েক দিনের পরিচয়ে তাদের প্রেম এতদূর গড়িয়ে গেল? লাইলীর উপর রাগ বেশি হল। তার মনে হল, গরিব ঘরের মেয়ে ঐশ্বর্যের লোভে সেলিমকে রূপের ফাঁদে ফেলেছে।
রেহানাকে চুপ করে ভাবতে দেখে মনিরুল আবার বলল, তুই যদি বলিস, আমি ওদের বিয়ে ভেঙ্গে দিতে পারি।
রেহানা চমকে উঠে বলল, কিন্তু বিয়ে ভেঙ্গে গেলে সেলিম যে আমাকে বিয়ে করবে তার কোনো নিশ্চয়তা আছে? তা ছাড়া আমি কি এতই ফেলনা যে, আমাকে পছন্দ না করলেও তোমরা তার সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চাও। আমি শুধু দেখব লাইলীকে বিয়ে করে সে কত সুখী হয়।
মনিরুল বলল, তুই কিছু ভাবিস না, দেখি আমি কতদুর কি করতে পারি। একটা কথা ভুলে যাচ্ছিস কেন? মাঝপথে লাইলী না এলে সেলিম তোকে ঠিকই বিয়ে করত। তা ছাড়া সে তো তোকে ডিনাই করেনি। যত গণ্ডগোলের মূল হল, লাইলী। ওর বাড়ির ঠিকানাটা দিতে পারিস?
যেদিন নিউ মার্কেটে লাইলীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সেদিন কথায় কথায় রেহানা তার ঠিকানা জেনে নিয়ে পরে এক টুকরো কাগজে লিখে রেখেছিল। রেহানা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে লাইলীর ঠিকানাটা এনে দিয়ে বলল, দেখ, তুমি যেন আবার এমন কিছু করো না, যাতে করে সেলিম না মনে করে আমরা তাদের বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছি।
আরে না না। আমি কী কচি থোকা? সে কথাও তোকে বলে দিতে হবে। এমনভাবে কাজ করব লাঠিও ভাঙবে না, আর সাপও মরবে না। তারপর ঠিকানাটা পড়ে বলল, আরে এই ঠিকানায় নাজমুল নামে একটা ছেলে আমাদের অফিসের টাইপিষ্ট। দাঁড়া, কালকেই তাকে জিজ্ঞেস করলে সবকিছু জানা যাবে।
নাজমুল লাইলীর চাচাতো ভাই। সে কোনো রকমে ম্যাট্রিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। পাড়ার ও কলেজের লম্পট ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বেড়াত। তাদের সঙ্গে বেশ কয়েকটা হাইজ্যাক ও নারীঘটিত কেসে ধরা পড়ে হাজৎ খেটেছে। তারপর তার বাবা তাকে অনেক শাসন করেও যখন বাগে আনতে পারলেন না তখন তাকে নিজের রেশন দোকানে বসান। সেখানেও সে অনেক টাকা পয়সা নষ্ট করে ফেলে। শেষে টাইপ শিখিয়ে একজনকে অনেক টাকা ঘুষ দিয়ে মনিরুলদের অফিসে চাকরিতে ঢুকিয়েছেন। ছেলের মতিগতি ভালো করার জন্য তার বাবা কয়েক জায়গায় মেয়ে দেখেছেন। কিন্তু সে রাজি হয়নি। শেষে তার মায়ের জেদাজেদীতে বলেছে, চাচাতো বোন লাইলীকে ছাড়া বিয়ে করবে না। তার বাবা কথাটা শুনে প্রথমে খুব রাগারাগি করেন। কারণ বড় ভাইয়ের সাথে কয়েক বছর আগে থেকে আকসা-আকসি। কোন মুখে সেখানে বিয়ের কথা বলবে। ছেলেকে অনেক বুঝিয়েও যখন কাজ হল না, তখন একদিন বড় ভাইকে ডেকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
ছোট ভাইয়ের কথা শুনে রহমান সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে চিন্তা করলেন। ভাইপোর সঙ্গে বিয়ে দিলে মেয়েকে সব সময় কাছে পাবেন। কিন্তু ছোট ভাইতো হারাম টাকা রোজগার করে। ছেলেটা আবার নামায রোযার ধার ধারে না। তার চরিত্রের অধঃপতনের কথা লাইলী ও নিশ্চয় শুনেছে। মেয়ে আমার ধর্মের আইন মেনে চলে। তা ছাড়া ছেলে, মেয়ের চেয়ে কম শিক্ষিত।
বড় ভাইকে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এতক্ষণ কি ভাবছ? তোমার মতামত বল?
রহমান সাহেব বললেন, এসব ব্যাপারে ভেবেচিন্তে উত্তর দিতে হয়। ঠিক আছে, আমি লাইলীর মায়ের সঙ্গে কথা বলে পরে জানাব। ঘরে ফিরে স্ত্রীকে ছোট ভাইয়ের কথা বললেন।
হামিদা বানু শুনে খুব রেগে গেলেন। বললেন, আমার অমন সোনার চাদ মেয়েকে ঐ লম্পট ছেলের হাতে দিতে পারব না। দেওরপুত হলে কি হবে? চরিত্রহীন। তা ছাড়া লাইলী এখন বড় হয়েছে, লেখাপড়া করেছে, তারও তো একটা মতামত আছে? আমি একদম নারাজ। তুমি তোমার ভাইকে জানিয়ে দাও, এ বিয়ে হওয়া একদম অসম্ভব।
লাইলী কি দরকারে আবার কাছে যাচ্ছিল। আব্বাকে মায়ের সঙ্গে তার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে শুনে দরজার আড়াল থেকে সব কথা শুনল। আর কথা শুনে প্রথমে সে খুব রেগে গিয়েছিল, শেষে মায়ের কথা শুনে তার মনটা হালকা হয়ে গেল।
দু’দিন পর রহমান সাহেব ছোট ভাইকে অমতের কথা জানালেন।
এতদিন পর ছেলের বিয়ের কথা বলে নাজমুলের বাবা বড় ভাইয়ের উপর কিছুটা নরম হয়েছিলেন। বিয়েতে অমত শুনে খুব রাগের সঙ্গে বললেন, আমিও দেখব, কোন রাজপুত্র এসে তোমার মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে যায়।
আব্বাকে চাচার সঙ্গে কথা বলতে নাজমুল গোপনে তাদের কথাবার্তা শুনতে ছিল চাচা তার সঙ্গে বিয়ে দেবে না জেনে সেও খুব রেগে গেল। আর মনে মনে ভাবল, দেখে নেব কেমন করে লাইলীর অন্য জায়গায় বিয়ে হয়।
পরের দিন মনিরুল অফিসে নাজমুলকে বলল, তোমাকে একটা মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করব, তার সম্বন্ধে তুমি যা জান সব আমাকে বলবে।
নাজমুল বলল, বলুন কোন মেয়ের সম্বন্ধে কি জানতে চান?
মনিরুল ঠিকানাটা তার সামনে ধরে জিজ্ঞেস করল, এটা কি তোমাদের বাড়ির ঠিকানা?
নাজমূল একবার চোখ বুলিয়ে বলল, হ্যাঁ স্যার। লাইলী নামে একটা মেয়েরও এই ঠিকানা, সে তা হলে কি হয় তোমার?
ছোট সাহেবের মুখে তার স্বপ্নের রাণীর নাম শুনে নাজমুল অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইল।
