শিহাব মৃদু হেসে আযীয মাস্টারের দিকে তাকিয়ে বলল, রিজিয়া অন্যায় কিছু বলে নি। আমি ঐ রকম ছেলের খোঁজ করব। এখন আসি স্যার বলে সালাম বিনিময় করে চলে এল।
.
রিজিয়া ছোটবেলায় নানিকে জিজ্ঞেস করেছিল, তার আব্বা নেই কেন?
মাসুদা বিবি চোখের পানি ফেলতে ফেলতে নাতনিকে আদর করে বলেছিলেন, তুই যখন মায়ের পেটে তখন তোর আব্বাকে আল্লাহ দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছে। যাকে আল্লাহ দুনিয়া থেকে তুলে নেয়, সে আর ফিরে আসে না।
বড় হয়ে রিজিয়া নানাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আব্বার গ্রামের বাড়ি কোথায়?
আযীয মাস্টার বলেছিলেন, ঢাকায়।
রিজিয়া আবার জিজ্ঞেস করেছিল, আব্বার মা-বাবা ভাইবোন নিশ্চয়ই আছেন?
তা তো আছেই।
জানেন নানাজী, তাদেরকে দেখতে আমার খুব ইচ্ছা করে। আচ্ছা তারা কি আমার কথা জানেন?
নাতনির কথা শুনে আযীয মাস্টার একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, তুই যখন দু’বছরের তখন আমি আর তোর শিহাব মামা তোকে তাদের কাছে দিয়ে আসার জন্য গিয়েছিলাম। তারা আমাদের কথা বিশ্বাস করলো না, অপমান করে তাড়িয়ে দিলেন।
আব্বা কি ওনাদের অমতে মাকে বিয়ে করেছিলেন?
তোর আব্বা শিহাবের সঙ্গে বেড়াতে এসেছিল। তারপর বিয়ের ঘটনা বলার পর কিভাবে মারা গেল বললেন।
চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে রিজিয়া বলল, আল্লাহ আব্বাকে জান্নাত নসিব করুন। তারপর জিজ্ঞেস করল, আপনি আব্বাদের বাসার ঠিকানা জানেন? দু’মণ ধান নেন। এইসব করে ধনী হয়েছেন। এখন এসব কথা বললে কেউ বিশ্বাস করবে?
আযীয মাস্টার বললেন, আল্লাহ কখন কাকে কি উসিলায় হেদায়েত করেন তা কেউ বলতে পারে না। আমার মনে হয় এ বছর হজ্ব করতে গিয়ে মাতব্বরের মন বদলে গেছে। ওপাড়ার হাশেম মিয়া একদিন বলল, মাস্টার সাহেব, আমাদের মাতব্বর হজ্ব করে এসে হুজুর হয়ে গেছেন। আমার যে জমিটা আধামূল্যে নিয়েছিলেন, গতকাল ডেকে পাঠিয়ে বাকি অর্ধেক টাকা দিয়ে বললেন, জমি নেয়ার সময় ন্যায্য দাম না দিয়ে যে ভুল করেছিলাম হজ্ব করতে গিয়ে সেই ভুল আল্লাহ ভেঙ্গে দিয়েছেন। তাই শুধু তোমাকে নয়, আরো যাদেরকে ঠকিয়ে জমি কিনেছি, তাদের সবাইকে ন্যায্য মূল্য দেব। আর যারা টাকা দিয়ে জমি ফেরৎ নিতে চাইবে, তাদের জমি ফেরৎ দিয়ে দেব।
মাতব্বরের ছোট ছেলে আশরাফও খুব ভালো। ঢাকায় ডাক্তারি পড়লেও নামায-রোযা করে। এখনও ডাক্তারি পাস করে নি। তবু গ্রামে এলেই গরিবদের কারো অসুখ-বিসুখের কথা শুনলে চিকিৎসা করে। এত কথা বলে আযীয মাস্টার হাঁপাতে লাগলেন।
রিজিয়া বলল, মাতব্বরের কথা পরে বলবেন। এখন চুপ করে ঘুমাবার চেষ্টা করুন।
.
প্রায় ঘণ্টা খানেক পর আশরাফ বন্ধুকে সঙ্গে করে ফিরে এসে ঘরের বাইরে থেকে বলল, আসতে পারি?
রিজিয়া গায়ে-মাথায় ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে বলল, আসুন।
আশরাফ ওষুধের প্যাকেট ও এক বোতল হরলিক্স নিয়ে ঘরে ঢুকে বলল, স্যার এখন কেমন আছেন?
আযীয মাস্টার বললেন, এখন ভালো আছি।
আশরাফ হরলিক্সের বোতলটা টেবিলের উপর রেখে প্যাকেট থেকে ওষুধ বের করে খাওয়ার নিয়ম বলে দিল।
আশরাফ থেমে যেতে হিমু বলল, প্রেসক্রিপশনে কখন কোন ওষুধ খাবে লিখে দে।
আশরাফ লিখে দিয়ে রিজিয়াকে বলল, গ্লাসে পানি আন, আমি এক্ষুণি একটা ওষুধ খাইয়ে দিই। রিজিয়া পানি নিয়ে এলে আশরাফ স্যারকে ওষুধ খাইয়ে বলল, যে কয়েকদিন আছি প্রতিদিন একবার এসে আপনাকে দেখে যাব। এবার আসি বলে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আযীয মাস্টার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই রিজিয়া বলল, ওষুধ ও হরলিক্সের দাম কত।
আশরাফ বলল, ছাত্র হিসেবে স্যারকে আমি দিলাম। দামের কথা জিজ্ঞেস করছ কেন? তারপর আযীয মাস্টারকে উদ্দেশ্য করে বলল, কয়েক মাস পরে আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা। দোয়া করবেন যেন আমরা ভালো রেজাল্ট করতে পারি।
আযীয মাস্টার বললেন, নিশ্চয় দোয়া করব ভাই।
রিজিয়াকে দেখে হিমু মুগ্ধ হয়েছে। হিমুকে দেখে রিজিয়াও মুগ্ধ হয়েছে। তাই একে অপরের দিকে মাঝে মাঝে তাকাতে গিয়ে বারবার চোখাচোখি হয়েছে এবং দুজনই লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে।
নানার কথা শেষ হতে লজ্জা মিশ্রিত কণ্ঠে রিজিয়া আশরাফকে উদ্দেশ্য করে বলল, আপনার বন্ধু আমাদের বাড়িতে প্রথম এলেন, আমরা গরিব, ভাল কিছু আপ্যায়ন করাতে না পারলেও অন্তত এক কাপ চা না খাইয়ে যেতে দেয়া কি উচিত হবে? আপনারা বৈঠকখানায় বসুন আমি চা বানিয়ে নিয়ে আসছি।
আশরাফ কিছু বলার আগে হিমু বলল, ওসব ফরমালিটি আমি পছন্দ করি না। আপনি ওনার মাথায় বাতাস দিতে থাকুন। আমরা আসার সময় চা খেয়ে এসেছি। আল্লাহ রাজি থাকলে আবার যখন আসব তখন খাব।
হিমু থেমে যেতে আশরাফ বলল, এবার তা হলে আসি। তারপর বিদায় নিয়ে চলে গেল।
তারা চলে যাওয়ার পর আযীয মাস্টার বললেন, দেখলি তো আরাফ কত ভালো ছেলে?
রিজিয়া নানার কথার উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে গেল। একটু পরে এক গ্লাস গরম পানি নিয়ে এসে হরলিক্স তৈরি করার সময় বলল, আশরাফ ভাই যে ভালো তা আমি অনেক আগে থেকে জানি। স্কুলে পড়ার সময় যেসব ছেলেমেয়ে বেতন ও পরীক্ষার ফি দিতে পারত না তাদের বেতন ও পরীক্ষার ফি আশরাফ ভাইকে দিতে দেখেছি। এখন আর কথা না বলে এটা খেয়ে ঘুমান। আমি সামসু মামার দোকান থেকে চাল-ডাল এনে রান্না চাপাব। নানাকে হরলিক্স খাইয়ে রিজিয়া গ্লাস নিয়ে বেরিয়ে গেল।
