আযীয মাস্টার চিন্তা করতে লাগলেন, আশরাফের মতো ছেলের সঙ্গে যদি রিজিয়ার বিয়ে হত, তা হলে শান্তিতে মরতে পারতাম।
ফেরার পথে হিমু বলল, তোর স্যারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ, তাই?
আশরাফ বলল, হ্যাঁ, তবে আগে অবস্থা খুব ভালো ছিল। তারপর স্যারের বাবা অন্য জেলার লোক হয়েও কিভাবে এখানে এসে বসবাস করলেন এবং স্যারের অবস্থা কেন খারাপ হল বলল।
মেয়েটা স্যারকে নানাজী বলছিল, ওনার কোনো ছেলে নেই?
না। সাবেরা নামে একটাই মেয়ে ছিল। তারই একমাত্র সন্তান রিজিয়া। রিজিয়া যখন দু’বছরের তখন তার মা মারা যায়। তার কয়েক বছর পর রিজিয়ার নানিও মারা যান। তারপরের ঘটনা তো একটু আগে বললাম।
রিজিয়ার বাবার কথা তো কিছু বললি না?
আশরাফ হেসে উঠে বলল, ওদের ব্যাপারে তুই এত কথা জানতে চাচ্ছিস কেন?
হিমু বলল, বারে, একজন শিক্ষকের সম্পর্কে জানতে চাওয়া কি অন্যায়? এমনি মানবতার খাতিরে জানতে চাচ্ছি।
আশরাফ আবার হেসে উঠে বলল, আমার কিন্তু তা মনে হচ্ছে না।
হিমুও হেসে উঠে বলল, কি মনে হচ্ছে বল তো শুনি।
তুই রিজিয়ার দিকে বারবার যেভাবে তাকাচ্ছিলি যেন কখনো মেয়েছেলে দেখিস নি।
হিমু এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল, তোর কথা অস্বীকার করব না। রিজিয়াকে দেখে সত্যিই আমার মনে হয়েছে যেন এই প্রথম কোনো মেয়েকে দেখলাম।
এইতো ধরা পড়ে গেলি বন্ধু। আসলে রিজিয়াকে দেখে তুই মুগ্ধ হয়েছিস। তাই তাদের সব কিছু জানতে চাচ্ছিস। কিন্তু একটা কথা ভুলে যাচ্ছিস কেন, যে কোনো সুন্দর জিনিস দেখলে মানুষ মুগ্ধ হবেই। তাই বলে তাকে নিয়ে বেশি কচলাকচলি করা বোকামি।
হিমু রাকিবের বড় ভাই রাগিবের ছেলে। শিহাবের সঙ্গে আযীয মাস্টার যখন নাতনিকে তার দাদা-দাদিকে দিতে গিয়েছিলেন তখন হিমুর বয়স আট বছর হলেও ঘটনাটা তার মনে ছবির মতো গেঁথে আছে। বাবা ও দাদাজী যা কিছু বলেছিল তাও মনে আছে। এমনকি আযীয মাস্টারের করুণ মুখের ছবিও মনে আছে। বন্ধু আশরাফের বাড়িতে বেড়াতে এসে আযীয মাস্টারকে দেখে মনে হয়েছে, ইনিই নাতনিকে নিয়ে তাদের বাসায় গিয়েছিলেন। তাই রিজিয়ার সব কিছু জেনে নিশ্চিত হতে চায়। বলল, আমি তো কচলাকচলি করি নি, শুধু তার সব কিছু জানতে চাচ্ছি। তা ছাড়া সব কিছু জানার পেছনে এমন একটা কারণ আছে, যা এখন তোকে বলতে পারব না। তুই রিজিয়ার বাবার কথা বল।
আশরাফ রিজিয়ার বাবা কি ভাবে তার মাকে বিয়ে করল ও কিভাবে মারা গেল বলে বলল, স্যার দু’বছরের রিজিয়াকে নিয়ে ঢাকায় তার দাদা-দাদির কাছে দিতে গিয়েছিলেন। তারা স্যারকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছেন।
হিমু জিজ্ঞেস করল, তুই এত কিছু জানলি কি করে? তখন তো ছোট ছিলি?
আশরাফ বলল, বড় হয়ে বাবার মুখে শুনেছি।
হিমু প্রায় নিশ্চিত হয়েও জিজ্ঞেস করল, রিজিয়ার বাবার নাম জানিস?
জানতাম ভুলে গেছি, বাবাকে জিজ্ঞেস করে তোকে বলব।
তোকে আর জিজ্ঞেস করতে হবে না, আমিই জেনে নেব।
ততক্ষণে তারা বাড়ি পৌঁছে গেল।
আশরাফের বাবা মাতব্বর করিম সেখ বৈঠকখানায় বসে গড়গড়ার পাইপ মুখে দিয়ে তামাক খাচ্ছিলেন। তাদের দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আযীয মাস্টার এখন কেমন আছেন?
আশরাফ বলল, ভালো আছেন। আমি ওষুধ ও হরলিক্স কিনে দিয়ে এসেছি।
করিম সেখ বললেন, ভালই করেছ। মনে হয় বেশি দিন বাঁচবেন না। তারপর আবার বললেন, বেলা হয়েছে, এক্ষুণি জোহরের আজান হবে। তোমরা গোসল করে নাও।
আশরাফ জি যাচ্ছি বলে বলল, হিমু রিজিয়ার বাবার সম্পর্কে কিছু জানতে চায়।
করিম সেখ হিমুর দিকে তাকিয়ে বললেন, কি জানতে চাও বল।
হিমু বলল, রিজিয়ার বাবার নাম ও তাদের বাসার ঠিকানা জানতে চাই।
করিম সেখ হিমুর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু যেন চিন্তা করলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি রিজিয়ার মা-বাপের বিয়ের ঘটনা জান?
জি আশরাফ বলেছে। তবু আপনার মুখে শুনতে চাই।
রিজিয়ার বাপের নাম রাকিব হাসান। বাড়ি ঢাকায়, তবে তার বাবার নাম ও ঠিকানা জানি না। তারপর সাবেরা ও রাকিবের বিয়ের ঘটনা বলে বললেন, পাশের গ্রামের শিহাব তাদের সব কিছু জানে।
রিজিয়ার বাবার নাম শুনে মনের ভেতর চমক খেল হিমু। নিশ্চিত হল, রিজিয়া তার ছোট চাচার মেয়ে।
এমন সময় আশরাফ এসে হিমুকে বলল, আয়, পুকুরে গোসল করতে যাব। তারপর যেতে যেতে বলল, আব্বার কাছে সব কিছু জেনেছিস?
হিমু বলল, হ্যাঁ। রিজিয়ার বাবার নাম রাকিব হাসান। তবে রাকিবের বাবার নাম ও ঢাকার ঠিকানা বলতে পারলেন না। বললেন, পাশের গ্রামের শিহাব সব কিছু জানে। তুই শিহাবকে চিনিস?
পাশের গ্রামে বাড়ি, চিনব না কেন?
বিকেলে নিয়ে যাবি, আমি ওনার সঙ্গে দেখা করব।
তিনি তো গ্রামে থাকেন না, ঢাকায় থাকেন। সেখানে ব্যবসা করে গাড়ি বাড়ি করেছেন। খুব ভালো লোক। গ্রামে এলেই স্যারের বাড়িতে এসে খোঁজখবর নেন।
ওনার ঢাকার ঠিকানা জানিস?
না বলে আশরাফ জিজ্ঞেস করল, সত্যি করে বল তো, তুই রিজিয়ার বাবার সব কিছু জানতে চাচ্ছিস কেন?
একটু আগে বললাম না, এখন বলতে পারব না? তবু জিজ্ঞেস করছিস কেন?
তা হলে বল, কখন বলতে পারবি?
মনে কিছু নিস না, কখন বলতে পারব তাও এই মুহূর্তে বলতে পারছি, তবে একদিন না একদিন তোকে বলবই। এখন আর কিছু জিজ্ঞেস করবি না।
