রাকিবের বড় ভাই রাগিব হাসান রাগের সঙ্গে বলল, আমাদের প্রমাণ নেয়ার দরকার নেই। তুমি ওদেরকে নিয়ে চলে যাও।
শিহাব বলল, জানতাম আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করবেন না। তবু এসেছি, রাকিবের বন্ধু হিসেবে তার মেয়ের ভালোমন্দ চিন্তা করে। আপনারা যখন নিজের বংশধরকে মেনে নিতে পারলেন না তখন আমার আর কিছু করার নেই। তারপর সালাম দিয়ে আযীয মাস্টারকে আসতে বলে বেরিয়ে এল।
আযীয় মাস্টার চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতে জাহিদ হাসান বললেন, দাঁড়ান। তারপর ভেতরে গিয়ে ফিরে এসে একটা খাম আযীয মাস্টারের হাতে দেয়ার সময় বললেন, এতে হাজার দশেক টাকা আছে। এখন এটা রাখুন, পরে মাঝে মাঝে আসবেন তখন আবার দেব।
আযীয মাস্টার টাকার খামটা না নিয়ে বললেন, একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে একজন শিক্ষককে অপমান করতে পারলেন? আমি টাকার জন্য আসি নি? এসেছিলাম আপনার বংশের সন্তানকে দিতে। তারপর নাতনিকে বুকে তুলে নিয়ে হন হন করে বেরিয়ে গেলেন।
শিহাব বেরিয়ে এসে একটা স্কুটার ভাড়া করে অপেক্ষা করছিল। আযীয মাস্টার আসার পর স্কুটারে উঠতে বলে নিজেও উঠে বসল। স্কুটার চলতে শুরু করলে জিজ্ঞেস করল, বেরোতে দেরি হল কেন?
আযীয মাস্টার টাকা দেয়ার ঘটনাটা বলে বললেন, তোমার কথাই ঠিক হল, আমার জন্য ওনাদের কাছে তোমাকেও অপমানিত হতে হল।
শিহাব বলল, ও কিছু না স্যার। আমার কর্তব্য আমি করেছি, এটাই যথেষ্ট। তাতে কে কি বলল তা নিয়ে আমার কোনো যায় আসে না। তারপর বলল, একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করব করব করেও মনে থাকে না, আচ্ছা, এবারে যখন সেটেলমেন্টের মাপ হল তখন আপনাকে একদিন বলেছিলাম, ঐ জায়গাটা আপনার নামে করে নিতে, নিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, করে নিয়েছি।
খুব ভালো করেছেন। ভবিষ্যতে কেউ আর ঐ জায়গাটা দখল করার চেষ্টা করতে পারবে না।
পরের দিন ঘরে ফিরে আযীয মাস্টার স্ত্রীকে রিজিয়ার বড় চাচা ও দাদাজী যা কিছু বলেছেন ও করেছেন জানালেন।
মাসুদা বিবি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, আমাদের কর্তব্য আমরা করেছি। এখন আল্লাহ রিজিয়ার তকদিরে যা লিখেছেন তাই হবে।
রিজিয়া যখন ক্লাস এইটে পড়ে তখন হঠাৎ একদিন মাসুদা বিবি মারা গেলেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আযীয মাস্টার কেমন যেন হয়ে গেলেন। মাস্টারিতে ইস্তফা দিয়ে দিনরাত ঘরে থাকেন। সব সময় বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গে কথা বলেন। জমি-জায়গা বিক্রি করে সংসার চালালেন আর রিজিয়াকে এস.এস.সি. পর্যন্ত পড়ালেন। তারপর তার বিয়ে দেয়ার অনেক চেষ্টা করলেন।
রিজিয়া রাজি না হয়ে বলল, আমার বিয়ে হয়ে গেলে আপনার কি হবে? কে আপনাকে দেখাশোনা করবে?
তার কথা শুনে আযীয মাস্টার বললেন, আমি মরে গেলে তোর কি হবে? তোকে কে দেখাশোনা করবে? তোর ভরণ-পোষণ চলবে কি করে?
রিজিয়া বলল, যে ছেলে ঘরজামাই হয়ে থাকবে তাকে বিয়ে করব।
রিজিয়া দেখতে খুব সুন্দরী। স্বাস্থ্যও খুব ভালো। পাত্রপক্ষরা দেখতে এসেই পছন্দ করে ফেলে, কিন্তু যখনই শুনে ছেলেকে ঘরজামাই হয়ে থাকতে হবে তখনই তারা রাজি না হয়ে চলে যায়।
অনেকগুলো সম্বন্ধ ফিরে যাওয়ার পর আযীয মাস্টার ভেবে রাখলেন, শিহাব গ্রামে এসে দেখা করতে এলে নাতনির বিয়ের ব্যাপারে আলাপ করবেন।
৩-৪. শিহাব ঢাকায় ব্যবসা করে
০৩.
শিহাব ঢাকায় ব্যবসা করে গাড়ি-বাড়ি করেছে। স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নিয়ে সেখানে থাকে। বছরে দু’তিনবার যখন গ্রামে আসে তখন আযীয মাস্টারের বাড়িতে এসে ভালোমন্দ খোঁজ নেয়। বন্ধুর মেয়ে হিসাবে রিজিয়ারও ভালোমন্দ খোঁজ নেয়। শিক্ষকের সম্মানস্বরূপ কিছু টাকা-পয়সা আযীয মাস্টারকে দেয়।
এবারে গ্রামে এসে শিহাব দেখা করতে এলে আযীয মাস্টার বললেন, তোমার বন্ধুর মেয়ে রিজিয়ার বিয়ে দিতে চাই; কিন্তু সে তো কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। তারপর রাজি না হওয়ার কারণ বললেন।
গত বছর রিজিয়া এস.এস.সি. পাস করার পর শিহাব তাকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে কলেজে পড়াতে চেয়েছিল। আযীয মাস্টার রাজি হলেও রিজিয়া রাজি না হয়ে ঐ একই কথা তাকে বলেছিল। আযীয মাস্টার থেমে যেতে জিজ্ঞেস করল, রিজিয়া কি তার বাবার পরিচয় জানে?
হ্যাঁ, জানে। বড় হওয়ার পর আমি তাকে তার বাবার সব কিছু জানিয়েছি।
শিহাব কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, ওকে ডাকুন, আমি এ ব্যাপারে ওর সঙ্গে কথা বলব।
আযীয মাস্টার একটু উঁচু গলায় নাতনির নাম ধরে ডেকে বললেন, তোর শিহাব মামা এসেছে, চা করে নিয়ে আয়।
কিছুক্ষণের মধ্যে রিজিয়া দুকাপ চা নিয়ে এসে সালাম দিয়ে বলল, মামা, কেমন আছেন? তারপর চায়ের কাপ দু’টো দু’জনকে দিল।
শিহাবকে সালামের উত্তর দিয়ে বলল, ভালো আছি মা। তুমি কেমন আছ।
আমি আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। নানাজীর মাঝে মাঝে শরীর খারাপ হয়। আর হবে নাইবা কেন, সারাদিন গ্রামে ঘুরে বেড়ান, সময়মতো গোসল ও খাওয়া-দাওয়া করেন না। আমি কতবার নিষেধ করি, আমার কথা কানেই নেন নি। আপনি একটু বুঝিয়ে বলবেন তো।
ঠিক আছে মা বলব। এখন তোমাকে দু’একটা কথা বলছি, স্যার তোমার বিয়ে দিতে চাচ্ছেন, তুমি নাকি রাজি হচ্ছ না?
বিয়ের কথা শুনে রিজিয়া লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমি স্বামীর ঘরে চলে গেলে নানাজীকে কে দেখাশোনা করবে? তাই বলেছি, যে ছেলে ঘরজামাই হয়ে থাকবে তাকে….বলে লজ্জায় কথাটা শেষ করতে না পেরে ছুটে পালিয়ে গেল।
