ফারিহা আন্দাজে ঢিল ছুড়ল। বলল, বাইরে কোথাও খেয়েছিস, তাই না?
রিজিয়া হেসে ফেলে বলল, হ্যাঁ, খেয়েছি। কোথায় খেয়েছি, কি খেয়েছি, কে খাওয়াল সব বলব, আগে খেয়ে আয়।
ফারিহা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে খেতে চলে গেল।
প্রায় বিশ-পঁচিশ মিনিট পর ফিরে এসে বলল, যা বলবি সত্যি বলবি, মিথ্যে বললে তোর বারটা বাজিয়ে দেব।
এখন তুই আর কি বাজাবি, তার আগেই একজন চৌদ্দটা বাজিয়ে দিয়েছে।
ফারিহা রেগে উঠে বলল, হেঁয়ালি করবি না, সত্য ঘটনা বল।
তুই আগে বল, আমি কোনো ভুল বা অন্যায় তোর কাছে করলে মাফ করে দিবি!
তার কথা শুনে রাগের পরিবর্তে ফারিহা হেসে ফেলে বলল, কি ভুল করেছিস আগে বল। শোনার পর অন্যায়ের গুরুত্ব বুঝে মাফ করা যায় কি না চিন্তা করে বলব।
ফাজলামি করিস না, বল না মাফ করে দিবি?
আচ্ছা বাবা আচ্ছা, যে কোনো অন্যায় করিস না কেন মাফ করে দেব।
রিজিয়া কলেজ না যাওয়ার কারণ, হিমুর সঙ্গে চাইনিজ খাওয়া ও তার সঙ্গে যেসব কথা হয়েছে বলল।
ফারিহা আহত স্বরে বলল, তা হলে আমাকে তুই বিশ্বাস করিস না?
একশ পার্সেন্টের চেয়ে বেশি করি।
তা হলে আমার কাছে এসব গোপন করলি কেন?
গোপন করে মস্ত বড় ভুল করেছি। ওয়াদা করছি, আর কখনও এরকম ভুল করব না। বল মাফ করে দিয়েছিস। বলে ফারিহাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল।
ফারিহা তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলল, কাঁদছিস কেন? কম বেশি ভুল বা অন্যায় সবাই করে। যারা তা বুঝতে পেরে সংশোধন হওয়ার চেষ্টা করে তারা মহৎ। তারপর তার চোখ মুছে দিয়ে বলল, হিমু সাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিবি না?
রিজিয়া বলল, সে নিজেই তার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার জন্য তোকে নিয়ে যেতে বলেছে।
কবে নিয়ে যাবি তা হলে?
এবারে যখন তার সঙ্গে দেখা করতে যাব, তোকেও নিয়ে যাব।
৫-৬. রাগিব হাসান একদিন
০৫.
রাগিব হাসান একদিন ছেলেকে বললেন, আমি তোকে উচ্চশিক্ষা নেয়ার জন্য ফরেনে পাঠাতে চাই। কোথায় যেতে চাস বল।
বাবা এমন কথা বলবে হিমু চিন্তাই করতে পারে নি। তাই খুব অবাক হয়ে বলল, রেজাল্ট বেরোবার পর আমি যখন ফরেনে যেতে চাইলাম তখন তোমরা একমাত্র সন্তানের অসিলা দিয়ে রাজি না হয়ে বললে, এখানে চেম্বার করে দেব প্র্যাকটিস কর। এখন আবার এ কথা বলছ কেন?
রাগিব হাসান বললেন, তখন চিন্তাভাবনা না করে বলেছিলাম। এখন আমি ও তোর মা চাই কোনো এক বিষয়ে ফরেন থেকে স্পেশালিস্ট হয়ে আয়। তা না হলে আজকাল শুধু এম.বি.বি.এস. ডাক্তারকে কেউ মূল্যায়ন করে না। তা ছাড়া হাই সোসাইটিতে আমাদের সম্মানও থাকবে না।
আমি তোমাদের হাই সোসাইটির পরওয়া করি না। আর শুনে রাখ, টাকা উপার্জনের জন্য আমি প্র্যাকটিস করব না, গরিব ও সাধারণ মানুষদের অল্প খরচে চিকিৎসা করব।
রাগিব হাসান রেগে গিয়ে গম্ভীরস্বরে বললেন, তুই তা হলে আমাদের মনের আশা পূরণ করবি না?
দেখ বাবা, আমি তোমাদের ছেলে। তোমরা আমার স্বভাব-চরিত্র জান। আর এটাও জান, একবার কোনো ব্যাপারে না করলে, তা কিছুতেই হা করি না। তাই বলছি, এ ব্যাপারে আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করো না। যদি কর, যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাব।
রাগিব হাসান রাগ সামলাতে পারলেন না। চিৎকার করে বললেন, তাই যা, যে ছেলে মা-বাবার অবাধ্য তেমন ছেলের মুখ দেখতে চাই না।
সেখানে সাবিহা বেগমও ছিলেন। একমাত্র সন্তানের কথা শুনে আগেই ভয় পেয়েছিলেন। স্বামীর কথা শুনে আরো বেশি ভয় পেয়ে ভাবলেন, হিমু যদি সত্যি সত্যি বাবার ওপর রাগ করে বাসা ছেড়ে চলে যায়, তা হলে বাঁচবেন কি করে? তাই স্বামীকে রাগের সঙ্গে বললেন, বাবা হয়ে একমাত্র ছেলেকে এরকম কথা বলতে পারলে? তারপর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোর বাবার কথায় কিছু মনে করিস না। তুই ফরেনে যেতে না চাইলে আমরা জোর করব না। এখানে যা করতে চাচ্ছিস তাই করে দেব।
রাগিব হাসান রাগের সঙ্গে স্ত্রীকে বললেন, তোমার আশকারা পেয়েই তো ও আমার মুখের ওপর কথা বলতে শিখেছে। ছেলেমেয়েকে স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে মানুষ করলেও আশকারা দিতে নেই। দিলে তারা মা-বাবার অবাধ্য হয়। তারপর গজর গজর করতে করতে উঠে চলে গেলেন।
পরে এক সময় সাবিহা বেগম স্বামীকে বললেন, হিমু যখন ফরেনে যেতে চাচ্ছে না তখন জোর করা ঠিক হবে না। তার চেয়ে চেম্বার করে দিয়ে তাড়াতাড়ি একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়ে দাও। তা হলে ঐ মেয়েটার কথা ভুলে যাবে।
রাগিব হাসান বললেন, তোমার কথা যুক্তিসঙ্গত হলেও হিমু বিয়ে করতে রাজি হবে বলে মনে হয় না। তখন হয়তো বলবে, জোর করে বিয়ে দিলে বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও থাকবে।
তবু যা বললাম কর। বেকার থাকলে মেয়েটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। আর বিয়ের ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। যেমন করে হোক আমি ওকে রাজি করাব।
তা হলে শোন, আমার এক বন্ধুর মেয়ে আছে। ইংলিশে অনার্স করে মাস্টার্স করছে। দেখতে শুনতে খুব ভালো। মেয়েটা তাদের একমাত্র সন্তান। তোমাকে একদিন তাদের বাসায় নিয়ে যাব। দেখলে তোমারও পছন্দ হবে।
ঠিক আছে, যাব। হিমুকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। মেয়ের সঙ্গে পরিচয় থাকলে রাজি করাতে সুবিধা হবে।
বেশ, তাই হবে।
তোমার বন্ধু বা তার বৌ হিমুকে যদি পছন্দ না করে?
