কথাটা যে এমনিই বলেছ, তা আমি জানি। কিছু মনে করার প্রশ্নই আসে। কথা শেষ করে মৃদু হাসল। তারপর বলল, এবার একটা কথা বলি?
বলুন।
প্রথম দিকে আমরা আপনি করে কথা বললেও পরে তুমি করে বলেছি। এখন পর্যন্ত আমি তোমাকে তুমি করেই বলছি; কিন্তু শেষের দিকে তুমি আমাকে আপনি করে বলতে শুরু করেছ। এটা ঠিক হচ্ছে না, তুমি করেই বল।
রিজিয়া অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বলল, তাই হবে। তারপর বলল, আর দেরি করতে পারব না। তোমার সঙ্গে একাকী দেখা করব বলে ফারিহাকে শরীর খারাপের মিথ্যে অজুহাত দেখিয়েছি। মামিমাকেও মিথ্যে করে এক বান্ধবীর কাছে নোট নেয়ার কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়েছি। ফারিহা বাসায় ফেরার আগে আমাকে ফিরতে হবে।
খুব ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছ। আমাকেও তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে। আমি ফেরার পর ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে অফিস থেকে বাবাকে আনতে যাবে। তারপর বেয়ারাকে ডেকে মেনু দেখে অর্ডার দিল।
খাওয়ার পর রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে হিমু বলল, চল তোমাকে গলির মুখে নামিয়ে দিই।
রিজিয়া বলল, তোমার দেরি হয়ে যাবে না? আমি একটা স্কুটার নিয়ে চলে যেতে পারব।
পাগল হয়েছ? যতই দেরি হোক তবু তোমাকে পৌঁছে দিয়ে যাব।
ফেরার পথে হিমু জিজ্ঞেস করল, আবার কবে আমাদের দেখা হবে?
এখন বলতে পারছি না, ফোন করে জানাব।
আমি তোমার শিহাব মামার সঙ্গে দেখা করতে চাই, তোমার আপত্তি আছে?
ভয়ার্তস্বরে রিজিয়া বলল, আজই দেখা করতে চাও নাকি?
কি ব্যাপার? তোমার মামার সঙ্গে দেখা করার কথা বলতে ভয় পেলে কেন?
না, মানে, আমাদের সম্পর্কের কথা জানতে পারলে মামা-মামি কি মনে করবেন? আর আমিই-বা কি করে তাদেরকে মুখ দেখাব?
হিমু হেসে ফেলে বলল, তুমি আমাকে এত বোকা মনে করেছ? আমি তো আজই তোমাদের বাসায় যাওয়ার কথা বলি নি। আপত্তি আছে কি না জিজ্ঞেস করেছি। যেদিন যাব, তার আগের দিন তোমার সঙ্গে পরামর্শ করেই যাব। তোমার শিহাব মামার ছেলেমেয়ে কয়জন?
দুই মেয়ে এক ছেলে। সবার বড় ফারিহা। তারপর সাজিদা ও রায়হান। তুমি ফারিহার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছ।
মনে হয় ফারিহা তোমার আমার ব্যাপারটা জানে, তাই না?
হ্যাঁ, জানে। আড়ং-এ তোমাকে দেখে আমি বেসামাল হয়ে পড়ি। তাই দেখে ওর ধারণা হয় আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে। বাসায় ফিরে জানার জন্য খুব চাপ দেয়। ওর সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক থাকায় বলতে বাধ্য হই।
শোনার পর আমার ওপর খুব রেগে যায় নি?
না বরং খুব খুশি হয়েছে।
তা হলে তাকে গোপন করে আসাটা তোমার উচিত হয় নি।
হ্যাঁ, এখন আমারও তাই মনে হচ্ছে। শুনলে খুব দুঃখ পাবে। ভাবছি, বাসায় ফিরে সব কিছু বলে ক্ষমা চেয়ে নেব।
হ্যাঁ, সেটাই ভালো হবে।
ততক্ষণে রিজিয়াদের বাসার গলির মুখে তারা এসে গেল। গাড়ি একপাশে থামিয়ে হিমু দরজা খুলে দিয়ে বলল, ফোন করতে ভুলো না যেন?
রিজিয়া গাড়ি থেকে নেমে হাসিমুখে সালাম বিনিময় করে বলল, ইনশাল্লাহ ভুলব না।
.
শিহাব অফিস থেকে দুপুরে বাসায় খেতে আসার সময় গলির মুখে রিজিয়াকে একটা প্রাইভেট কার থেকে নামতে দেখে ভীষণ অবাক হলেন। ভাবলেন ভুল দেখলাম না তো? তাই ঘাড় ঘুরিয়ে আবার দেখলেন, রিজিয়া বোরখা পরে থাকলেও মুখে নেকাব নেই। ড্রাইভিং সিটে বসা একটা হ্যাঁন্ডসাম ছেলের সাথে হাসি মুখে কথা বলছে। ঘটনাটা দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন। যাকে ছোটবেলা থেকে খুব ধার্মিক বলে জেনে এসেছেন, তাকে এভাবে
দেখবেন কল্পনাও করেন নি। ভেবে রাখলেন, ব্যাপারটা তলিয়ে দেখতে হবে, ছেলেটাইবা কে? আর রিজিয়ার সঙ্গেইবা তার কি সম্পর্ক?
স্বামীকে চিন্তিত মুখে বাসায় ফিরতে দেখে আরিফা বেগম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি শরীর খারাপ?
শিহাব বললেন, শরীর ভালো আছে।
তা হলে তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
ব্যবসা ও সংসার ধর্ম করতে হলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, চিন্তা তো থাকবেই। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে এসে খেতে বসে জিজ্ঞেস করলো, মেয়েরা কলেজ থেকে ফিরেছে?
ফারিহা একা কলেজ গেছে। এখনও ফেরে নি। রিজিয়ার আজ নানার কথা মনে পড়তে মন খারাপ করে ঘরেই ছিল। দশটার দিকে এক বান্ধবীর কাছে নোট আনতে গিয়েছিল। তুমি আসার পর ফিরেছে।
শিহাব আর কিছু না বলে খেয়ে উঠে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার অফিসে চলে গেলেন।
রিজিয়া ও ফারিহা কেউ কাউকে ছাড়া এক ওয়াক্তও খায় না। আজ ফারিহা কলেজ থেকে ফিরে রিজিয়াকে জিজ্ঞেস করল, এখন কেমন আছিস?
ভালো।
তা হলে শুয়ে আছিস কেন? তাড়াতাড়ি উঠে হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিং রুমে গিয়ে ভাত রেডি করতে বল, আমি আসছি। ক্ষিধেয় পেট চো চো করছে।
রিজিয়া হিমুর সঙ্গে চায়নিজ খেয়ে এসেছে। কি বলবে ভাবতে লাগল।
ফারিহার ততক্ষণ কাপড় পাল্টানো হয়ে গেছে। তাকে শুয়ে থাকতে দেখে পাশে বসে বলল, এখন ভালো আছিস বললি, তবু শুয়ে রয়েছিস কেন?
শরীর ভালো আছে, তবু আমি খাব না। তুই খেয়ে আয়। কেন খাব না। খেয়ে আসার পর বলব।
মা কিছু বকেছে?
মামিমা তোকে মাঝে মধ্যে বকলেও আমাকে কখনও কিছু বলেন নি। বললাম না, তুই খেয়ে আসার পর বলব।
তোকে ছাড়া আমি কোনো দিন খেয়েছি? কেন খাবি না আগে বল তারপর আমি খেতে যাব।
বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। ক্ষিধেয় পেট চোঁ-চোঁ করছে বললি না? তাই বলছি খেয়ে আসার পর বলব।
