পছন্দ করবে না মানে? সেই তো একদিন কথায় কথায় হিমুকে জামাই করার কথা বলে ফেলল। আমি বলেছি হিমু বেকার অবস্থায় বিয়ে করতে রাজি হবে না। বন্ধু বলল, সেজন্যে চিন্তার কিছু নেই। বিয়ের পর আমি হিমুকে ফরেনে পাঠিয়ে দেব। সেখান থেকে উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে এলে আমিই চেম্বার করে দেব।
তাই নাকি? তা এতদিন কথাটা আমাকে জানাও নি কেন?
রোজই বলব বলব মনে করি, কিন্তু ভুলে যাই।
ঠিক আছে, দেরি না করে দু’একদিনের মধ্যে যাই চল।
.
রাগিব হাসানের বন্ধু মফিজ সাহেবও একজন বড় ব্যবসায়ী। তার একমাত্র মেয়ে উঁই। জুঁই যখন তের-চৌদ্দ বছরের তখন তার মা মারা যান। মফিজ সাহেব আর বিয়ে করেন নি। মেয়েকে মা-বাবার স্নেহ দিয়ে মানুষ করেছেন। বকাবকি তো দূরের কথা, এতটুকু চোখও রাঙান নি। যা আবদার করেছে তৎক্ষণাৎ পূরণ করেছেন। ফলে জুঁই খুব মেজাজি, একগুঁয়ে ও বেশ একটু উদ্ধৃঙ্খল ধরনের। সুন্দরী ও ধনীর একমাত্র দুলালী বলে অহঙ্কারীও। আর খুব অল্টা মডার্ন। লজ্জা-শরম নেই বললেই চলে। সব সময় অশালীন পোশাক পরে।
রাগিব হাসান এক ছুটির দিন স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে বন্ধুর বাসায় বেড়াতে এলেন। অবশ্য সে কথা বন্ধুকে আগেই বলে রেখেছিলেন। জুঁইকে দেখে সাবিহা বেগমের খুব পছন্দ হল। ভাবলেন, এ রকম মেয়েই তাদের বাড়ির বৌ হওয়ার উপযুক্ত।
জুঁইকে হিমুর একদম পছন্দ হল না। তার পোশাক দেখে হিমুর যেমন লজ্জা পেল তেমনি রাগ হলেও তা প্রকাশ করল না। উঁইয়ের বাবা যখন তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন তখন হিমু মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে আলাপ করল। পরে যখন উঁই একাকী তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে মিশতে চাইল হিমু অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে উঁইয়ের অহঙ্কার ক্ষুণ্ণ হল। ভাবল, ভার্সিটির কত বড় বড় ধনী ঘরের ও হাই সোসাইটির ছেলেরা তার সঙ্গে একটা কথা বলতে পারলে ধন্য হয়ে যায়, যে কেউ তার দিকে তাকালে চোখ ফেরাতে পারে না, আর হিমু কিনা তার দিকে ভালো করে তাকাচ্ছে না? তাই এক ফাঁকে তাকে বলল, আপনি ডাক্তারি পড়ার সময় মেয়েদের লাশ কাটাছেঁড়া করেছেন, মেয়েদের সঙ্গে পড়াশোনা করেছেন, হৈ-হুঁল্লোড় করেছেন, তবু আমাকে এড়িয়ে চলছেন কেন?
হিমু বলল, আমার স্বভাবই এরকম। সব সময় আমি মেয়েদের এড়িয়ে চলি।
কেন?
কেনর উত্তর এই মুহূর্তে দিতে পারছি না, সেজন্য ক্ষমা চাইছি।
আপনি ডাক্তার হলেও মনটা সেকেলে রয়ে গেছে। মনটাকে মডার্ন যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করুন। নচেৎ হাই সোসাইটিতে মিশবেন কি করে?
হাই সোসাইটিতে মিশতেও আমার মন চায় না।
আমার সঙ্গে কিছুদিন মেলামেশা করুন, দেখবেন সব কিছু ভালো লাগছে।
আপনাকেও আমার ভালো লাগছে না। মেলামেশা করব কি করে?
এই কথা শুনে জুঁই খুব রেগে গেল। রাগের সঙ্গে বলল, আমাকে ভালো লাগছে না কেন বলুন তো?
মাফ করবেন, তাও এখন বলতে পারছি না।
আপনি একটা পুরুষত্বহীন কাপুরুষ বলে উঁই তার কাছ থেকে চলে গেল।
হিমু তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল।
বাসায় ফিরে সাবিহা বেগম ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, জুঁইকে কেমন মনে হল?
বাবার বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে হিমু মা-বাবার মতলব বুঝতে পেরে রেগে গিয়েছিল। তাই উঁইয়ের কাছে পুরুষত্বহীন ও কাপুরুষের মতো ব্যবহার করেছে। এখন মায়ের কথা শুনে বলল, যদি জানতাম বাবার বন্ধুর ঐ রকম যাচ্ছেতাই একটা মেয়ে আছে, তা হলে কিছুতেই যেতাম না। তোমাদের আবার বলছি, আমার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করো না। আমার সিদ্ধান্তের কথা জানাবার পরও কেন যে তোমরা মেয়ে দেখাতে নিয়ে গেলে বুঝতে পারছি না।
সাবিহা বেগম খুব রেগে গিয়ে বললেন, আমিও বলে রাখছি, পাড়াগাঁয়ের আনকালচার্ড গরিব ঘরের এতিম মেয়েকে কিছুতেই এ বাড়ির বৌ করব না।
ঠিক আছে, তোমরা যদি তোমাদের ছেলেকে চিরকুমার করে রাখতে চাও তাই থাকব। এই কথা বলে হিমু বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।
.
রাগিব হাসানকে ব্যবসার কাজে দু’মাসের জন্য কানাডা যেতে হল। যাওয়ার সময় স্ত্রীকে বলে গেলেন, কানাডা থেকে ফিরে হিমুর ব্যাপারে যা করার করব।
হিমু একদিন দাদুকে বলল, আমি একটা গল্প লিখেছি। কিন্তু কিভাবে নায়ক-নায়িকার মিল দেব ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনি যদি একটু হেল্প করতেন, তা হলে গল্পটা শেষ করতে পারতাম।
জাহিদ হাসান বললেন, বেশ তো, গল্পটা যতদূর লিখেছ শোনাও। শোনার পর বলব কিভাবে নায়ক নায়িকার মিল দেয়া যায়।
হিমু প্রথমে আযীয মাস্টারের পরিচয় ও তার মেয়ে সাবেরার বিয়ের ঘটনা এবং সাবেরার পেটে সন্তান থাকা অবস্থায় স্বামীর মৃত্যুর ঘটনা, রিজিয়ার জন্ম ও সাবেরার মৃত্যু এবং আযীয মাস্টার দু’বছরের রিজিয়াকে দাদা-দাদির কাছে ফেরত দিতে যাওয়ার ঘটনা বলার পর জিজ্ঞেস করল, রিজিয়াকে তার দাদার ফিরিয়ে দেয়া কি উচিত হয়েছে?
গল্পটা শুনে জাহিদ হাসান মনে চমক খেলেও তা প্রকাশ না করে ভাবলেন, এই গল্পের সঙ্গে ছোট ছেলে রাকিব হাসানের অনেক কিছু হুবহু মিল রয়েছে।
দাদুকে চুপ করে থাকতে দেখে হিমু বলল, উচিত হয়েছে কি না বললেন যে?
নাতির কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে জাহিদ হাসান হেসে উঠে বললেন, এটা খুব সস্তা ধরনের গল্প। আজকাল আমাদের দেশের সিনেমাগুলোতে এইধরনের ছবি দেখাচ্ছে।
