এই পাঁচ মিনিট বলে হিমু ড্রাইভিং সিটে বসে পাশের দরজা খুলে দিল। রিজিয়া উঠে বসার পর হিমু গাড়ি ছেড়ে দিয়ে বলল, প্লিজ, মুখের নেকাব সরিয়ে দিন।
রিজিয়া বলল, এদিকের অনেকে আমাকে চেনে, পরে দেখা যাবে।
কোথায় বসে নিরিবিলি আলাপ করা যায় বলুন তো?
আমি পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, মাত্র তিন সাড়ে তিন বছর হল ঢাকায় এসেছি। আপনার জন্ম এখানে, সে কথা আপনিই তো ভালো জানবেন।
গুলশানে আমার এক বন্ধুর বাসা। তার মা ও একজন কাজের বুয়া ছাড়া কেউ নেই। যাবেন সেখানে?
না, কারো বাসায় যাওয়া ঠিক নয়। তা ছাড়া বন্ধুর মাকে আমার কি পরিচয় দেবেন? তার চেয়ে কোনো পার্কে চলুন।
এতক্ষণে কপোত-কপোতিরা পার্কের নিরিবিলি জায়গা দখল করে ফেলেছে।
তবুও পার্কেই চলুন কোথাও না কোথাও পেয়ে যাব।
আমার মনে হয় পার্কের চেয়ে কোনো চায়নিজ রেস্টুরেন্টে বসলে ভালো হয়। আলাপও হবে, খাওয়া-দাওয়াও হবে। পার্কে পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পরে। সঙ্গে বোরখা পরা মেয়ে দেখলে বিয়ে করেছি ভেবে অনেক কিছু বলবে।
তা হলে রেস্টুরেন্টেই চলুন।
হিমু গুলশানের একটা চায়নিজ রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি পার্ক করল। তারপর ভেতরে ঢুকে এক কোনের টেবিলে বসে বলল, এবার মুখের নেকাবটা সরান, আপনার মুখ দেখে মনের পিপাসা মেটাই।
রিজিয়া বলল, আপনি কি জানেন, যে চৌদ্দজনকে বিয়ে করা হারাম, তাদের ছাড়া অন্য মেয়েদের দিকে তাকানো ইসলামে নিষেধ?
না, জানি না।
মনে হচ্ছে ইসলাম সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না?
আপনার ধারণা ঠিক। কি করে জানব বলুন, ছোটবেলায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছি, তারপর হাই স্কুল ও কলেজে পড়ে মেডিকেলে পড়াশোনা করেছি। ভালো রেজাল্ট করার জন্য সে সময় পাঠ্য বই নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করার সময় কোথায়? তা ছাড়া গার্জেনরাও কেউ ইসলাম সম্পর্কে কোনো শিক্ষা দেয় নি।
এখন তো সময়ের অভাব নেই, ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করুন। মুসলমানদের ধর্ম হল ইসলাম। একজন মুসলমান হয়ে সেই ইসলামকে জানবেন না, এটা কি ঠিক?
এতদিন পর রিজিয়াকে প্রাণভরে দেখার জন্য হিমু কত চেষ্টা করে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আর সে কিনা ধর্ম নিয়ে আলাপ করছে? খুব বিরক্ত বোধ করলেও তা প্রকাশ না করে বলল, না ঠিক নয়। আজ থেকে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করব।
এমন সময় বেয়ারা এসে দাঁড়াতে হিমু রিজিয়াকে জিজ্ঞেস করল, এখন কি খাবেন?
রিজিয়া বলল, এখন কিছু খেতে পারব না, পানীয় কিছু চলতে পারে। পরে না হয় কিছু খাওয়া যাবে।
হিমু বেয়ারাকে বলল, ম্যাডাম কি বললেন শুনলেন তো? এখন শুধু দু’টো ম্যাংগো জুস দিয়ে যান।
বেয়ারা ম্যাংগো জুস দিয়ে যাওয়ার পর হিমু বলল, দেখার ব্যাপারে ইসলামের যে নিষেধের কথা বললেন, তা কি শুধু পুরুষদের বেলায়?
না, নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য।
তা হলে আপনি কেন মুখ ঢেকে রেখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন?
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে রিজিয়া বলল, ইসলামের আইন না মেনে অন্যায় করছি।
আপনি যদি অন্যায় করতে পারেন, তা হলে আমিও করব। প্লিজ, নেকাবটা সরান।
রিজিয়া নেকাব সরিয়ে বলল, এভাবে বেশি দিন আমরা মেলামেশা করতে পারি না। এটাও ইসলামে নিষেধ।
আমিও চাই না এভাবে মেলামেশা করতে। তাই তো একে অপরের মনের কথা জেনে ইসলামিক বিধি মোতাবেক যাতে মেলামেশা করতে পারি, সেই সম্পর্কে আলাপ করার জন্য এখানে আসা। আপনি জানেন কিনা জানি না, ডাক্তারি পাস করার পর আমি আপনাদের গ্রামে গিয়েছিলাম। লোকজনের কাছে জানতে পারলাম, আপনার নানা মারা যাওয়ার ও আপনার ঢাকা আসার কথা। ফিরে এসে আপনাকে অনেক খুঁজেছি। কাল আড়ং-এ মাকে নিয়ে কাপড় কিনতে গিয়ে আপনাকে দেখতে পেয়ে মাকেও দেখাই এবং তোমার সঙ্গে আলাপ করে ঠিকানা জেনে নিতে বলি। তারপর কিভাবে বাসার ঠিকানা ও ফোন নাম্বার জোগাড় করেছে বলে বলল, তোমার মতামত জানতে পারলে শুভস্য শীঘ্রম করে ফেলব।
তার কথা শুনে রিজিয়া খুব লজ্জা পেলেও মনে আনন্দের ফোয়ারা ছুটল। অল্পক্ষণের মধ্যে চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল। হিমু যাতে চোখের পানি দেখতে না পায়, সে জন্যে মুখ নিচু করে নিল।
রিজিয়া মুখ নিচু করার আগেই হিমু তার চোখের পানি দেখে ফেলেছে। ভয়ে ভয়ে বলল, কি ব্যাপার? মতামত জানতে চাইতে তোমার চোখে পানি? তা হলে কি বিয়েতে তোমার…কথাটা শেষ করতে না পেরে দৃষ্টি নামিয়ে নিল। তখন তারও চোখে পানি আসার উপক্রম হল।
রিজিয়া চোখ মুছে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ফোনে সব কিছু শোনার পরও একথা ভাবলে কি করে? আমিতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তোমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করব।
হিমু দৃষ্টি তুলে তার হাসি মুখ দেখেও কথা শুনে ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে পেল। বলল, আমিও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তোমাকে না পেলে চিরকুমার থাকব। তোমার চোখে পানি দেখে যা ভয় পেয়েছিলাম না।
ওটা আনন্দ অশ্রু। আপনি কিন্তু ঘরজামাই হয়ে থাকবেন বলেছিলেন!
ডাক্তারি পাস করার পর সেইজন্যই তোমাদের গ্রামে গিয়েছিলাম। আর এখনো রাজি আছি।
কেন ঐ কথা বলেছিলাম, তা তো আপনি জানেন। নানাজী মারা গেছেন। এখন আর সে প্রশ্নই আসে না। কথাটা এমনিই বললাম। আপনি কিছু মনে করবেন না।
