কি হল? আমার কথা শুনে চুপ করে আছেন কেন?
আমি সেই যন্ত্রণা ও অপেক্ষার জ্বালা নেভাতে চাই। তাই তো দেখা করতে চাচ্ছি।
স্থান ও সময় আপনিই বলুন।
হিমু অল্পক্ষণ চিন্তা করে বলল, নিশ্চয় পড়াশোনা করছেন?
জি, ইডেনে বি.এ. সেকেন্ড ইয়ারে।
কাল কলেজ আছে?
জি।
ছুটি হয় ক’টায়?
দেড়টায়।
ঐ সময়ে আমি গেটের কাছে থাকব।
ঠিক আছে। তবে ফারিহা যদি কাল কলেজ যায়, তা হলে সকালে ফোন করে কখন ও কোথায় দেখা হবে জানাব। ফোন নাম্বারটা বলুন।
হিমু ফোন নাম্বার বলে বলল, আমি সাতটার সময় ফোনের কাছে থাকব।
এমন সময় ফারিহা এসে বলল, অনেক হয়েছে এবার রাখ। মা খালার বাসায় ফোন করার কথা বলল। এক্ষুনি হয়তো এসে পড়বে।
কেউ রিজিয়ার সাথে কথা বলছে বুঝতে পেরে হিমু বলল, সকালে তোমার ফোন না পেলে দেড়টার সময় কলেজের গেটের কাছে থাকব।
ঠিক আছে, এবার রাখি। শামিমা ফোন করার জন্য আসছেন বলে রিজিয়া সালাম বিনিময় করে রিসিভার ক্র্যাডেলে রেখে দিল।
দেখা করার কথা ছাড়া হিমুর সঙ্গে যা কিছু কথা হয়েছে রিজিয়া বলল।
ফারিহা জিজ্ঞেস করল, তোর সঙ্গে দেখা করার কথা বলেন নি?
রিজিয়া মিথ্যে করে বলল, বলেছিলেন, আমি পরে জানাব বলেছি।
ওনার পরিচয় জেনেছিস?
না।
তুই একদম বুদ্ধ। যাকে জীবন সাথী করতে চাস তার পরিচয় জানবি না?
কি জানি বুদ্ধু বলে হয়তো সে কথা মনে আসে নি।
আবার যখন ফোনে কথা বলবি অথবা দেখা হবে তখন সব কিছু জেনে নিবি। তা না হলে মা-বাবার কাছে তোদের জন্য ওকালতি করব কি করে?
রিজিয়া অবাক হয় চোখ বড় বড় করে বলল, তুই আমাদের হয়ে মামা মামির কাছে ওকালতি করবি?
হা করব। এতে অবাক হওয়ার কি আছে? আমি ছাড়া তোর আর কে আছে যে ওকালতি করবে?
আমার যে খুব ভয় করছে, মামা-মামি আমাকে কি মনে করবেন?
শুনেছি, প্রেম-ভালবাসা যারা করে তারা কোনো কিছুকেই ভয় পায় না। তুই পাচ্ছিস কেন?
জানি না। তোকে একটা অনুরোধ করব, রাখবি বল।
বলেই দেখ না রাখি কি না!
আগে ওয়াদা কর।
করলাম।
আমার ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামিয়ে পড়াশোনার ক্ষতি করবি না। আর আমাকে জিজ্ঞেস না করে মামা-মামিকে আমাদের ব্যাপারটা জানাবি না।
আরে দূর, তোর ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামিয়ে পড়াশোনার ক্ষতি করব আমি? আর মা-বাবার কাছে ওকালতি করতে আমার বয়েই গেছে। তোকে একটু ভয় পাইয়ে দিলাম আর কি।
রিজিয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, কাল কলেজে যাচ্ছিস তো?
ফারিহা বলল, কালকের কথা কালকে, আজ বলব কি করে?
.
পরের দিন সকালে ফারিহাকে কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে দেখে রিজিয়া শুয়ে রইল।
ফারিহা বলল, কিরে শুয়ে রয়েছিস যে, কলেজ যাবি না?
রিজিয়া বলল, শরীরটা খারাপ লাগছে, যাব না।
সারারাত জেগে হিমু সাহেবের কথা ভেবেছিস নিশ্চয়?
না রে, ওসব কিছু নয়, এমনি মানুষের শরীর খারাপ হয় না? তোরও তো শরীর খারাপ হয়েছিল।
আমার যে শরীর খারাপের সময় দুতিন দিন খুব পেটে ব্যথা হয়, তা তো জানিস। তোর কখনো হতে দেখি নি, তাই বললাম।
রিজিয়া কিছু না বলে চুপ করে রইল।
কিছু বললি না যে?
কখনো হয় নি বলে এখন হবে না ভাবাটা কি ঠিক?
তা অবশ্য ঠিক নয়। তারপর চলি তা হলে বলে ফারিহা কলেজ চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে সাবিহা বেগম এসে বললেন, ফারিহার মুখে শুনলাম তোর শরীর নাকি খারাপ?
রিজিয়া কখনো মিথ্যে বলে নি। আজ ফারিহার কাছে বলে অপরাধবোধ করছিল। তাই মামিমার কাছে সত্য-মিথ্যা কোনোটাই বলতে না পেরে চুপ করে রইল।
সাবিহা বেগম বললেন, শরীর বেশি খারাপ লাগলে ডাক্তারের কাছে যা।
রিজিয়া জানে, একটু শরীর খারাপ হলে মামিমা তাকে ডাক্তারের কাছে পাঠাবেনই। তাই মিথ্যে না বলে পারল না। বলল, তেমন কিছু হয় নি, আজ নানাজীর কথা বারবার মনে পড়ছে। তাই কলেজে যেতে ইচ্ছা করল না। ফারিহাকে দুষ্টুমি করে শরীর খারাপের কথা বলেছি।
শুয়ে থাকলে তো নানার কথা আরো বেশি মনে পড়বে। কলেজে গেলেই ভালো করতিস।
হ্যাঁ, এখন তাই মনে হচ্ছে।
এমন সময় ফোন বেজে উঠতে সাবিহা বেগম বললেন, ফোনটা ধরত মা, চুলোয় তরকারি চাপিয়ে এসেছি, কি হল দেখি বলে চলে গেলেন।
রিজিয়া ফোন ধরে সালাম দিয়ে বলল, কে বলছেন?
হিমু সালামের উত্তর দিয়ে বলল, আপনি কলেজ যান নি?
ফারিহা গেছে। তাই শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে আমি যাই নি। এক্ষুণি ফোন করব ভাবছিলাম। তার আগেই আপনি করলেন। আচ্ছা, আপনি কি আমাদের বাসা চেনেন?
চিনি, আসব?
না না। এক কাজ করুন, আমাদের বাসার গলির মোড়ে একটা রেস্টুরেন্ট আছে। ওখানে আসুন, আমিও আসব। এবার রাখি তা হলে?
শুনুন, এখন নয়, দশটার সময় আসব।
ঠিক আছে, এবার রাখছি বলে রিজিয়া লাইন কেটে দিল। হিমুর সঙ্গে দেখা করার জন্য সে আজ মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই একের পর এক মিথ্যে বলে চলেছে। ফোনের কাছ থেকে মামিমার কাছে এসে বলল, আমার এক বান্ধবী বেশ কিছুদিন আগে একটা নোট নিয়েছিল। অসুখ করেছে বলে কয়েকদিন কলেজে আসে নি। সে ফোন করে তাদের বাসায় যেতে বলল।
সাবিহা বেগম বললেন, নাস্তা খেয়ে যা। বান্ধবীর সঙ্গে গল্প করলে মন। ভালো হয়ে যাবে।
দশটার সময় রিজিয়া মামিমাকে বলে বাসা থেকে বেরিয়ে এল। গলির মোড়ে এসে রেস্টুরেন্টের কাছে একটা প্রাইভেট কারের পাশে হিমুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। কাছে এসে সালাম বিনিময় করে বলল, কতক্ষণ আগে এসেছেন?
