রিজিয়া চোখ মুছে বলল, তুই বোধ হয় জানিস না, মানুষ শুধু দুঃখ পেলে কাঁদে না, বেশি আনন্দ পেলেও কাঁদে।
কথাটা জানি, মনে ছিল না।
পাঁচটার সময় তো বাসার সবাই একসঙ্গে চা-নাস্তা খাব, ফোন এলে মামা যদি ধরেন?
তুই চিন্তা করিস না, আমি ম্যানেজ করব। তবে তুই কথা বলার আগে আমি আলাপ করব। রাজি আছিস তো?
রাজি।
আর একটা কথা, ফোনে উনি যা কিছু বলবেন আমাকে বলতে হবে।
রিজিয়া হেসে উঠে বলল, বলব, তবে আমি যখন কথা বলব তখন তুই কাছে থাকবি না বল।
ফারিহা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, ঠিক আছে, তাই হবে।
.
বিকেল পাঁচটায় সবার সঙ্গে চা-নাস্তা খাওয়ার সময় রিজিয়া ও ফারিহা ফোন আসার অপেক্ষায় কান খাড়া করে রইল; কিন্তু সাড়ে পাঁচটা বেজে যাওয়ার পরও যখন ফোন এল না তখন রিজিয়া ফারিহাকে বলল, কিরে তুই যে বললি পাঁচটায় ফোন করবেন!
ফারিহা বলল, আমাকে তো বলেন নি, বলেছেন বুয়াকে। সে যা মেয়ে কি বলতে কি বলেছে আল্লাহ মালুম। তবে আমার মনে হয় কোনো কারণে হয়তো ঠিক সময়ে ফোন করতে পারেন নি। যে কোনো সময়ে করতে পারেন। এমন সময় ফোন বেজে উঠতে আবার বলল, মনে হয় ডা. হিমু করেছেন।
চা-নাস্তা খেয়ে দু’জনে রুমে বসে কথা বলছিল। ফারিহা ফোন ধরে রুমে নিয়ে আসার সময় ওপাশ থেকে পুরুষের গলায় সালাম শুনতে পেয়ে উত্তর দিয়ে বলল, কে বলছেন?
আমি ডা. হিমু, দয়া করে রিজিয়াকে একটু দেবেন?
কিন্তু উনি তো পাঁচটার সময় ফোন করবেন বলেছিলেন, এখন প্রায় পৌনে ছ’টা বাজে।
বিশেষ কারণে ঐ সময়ে করতে পারি নি। প্লিজ, দিন না রিজিয়াকে।
রিজিয়া বলছি।
আপনি রিজিয়া নন, ফারিহা।
কি করে বুঝলেন?
ও-বেলা আপনি ফোন ধরেছিলেন। আমি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একবার কারো সঙ্গে কথা বললে, পরবর্তীতে ঠিক বুঝতে পারি।
তা হলে আপনার স্মৃতিশক্তি খুব প্রখর?
খুব প্রখর না হলেও মোটামুটি। নচেৎ ডাক্তারি পাস করতে পারতাম না।
ও-বেলা আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি, সে জন্য ক্ষমা চাইছি।
রিজিয়াকে ফোনটা দিলে ক্ষমা করতে পারি।
আজ তিন থেকে সাড়ে তিন বছর রিজিয়ার খোঁজ করেন নি কেন?
তার কথা শুনে হিমু চিন্তা করল, তা হলে রিজিয়া কি তার সম্পর্কে সব কিছু ফারিহাকে বলেছে?
কি হল, চুপ করে আছেন কেন?
খোঁজ করেছি কি না আল্লাহ ভালো জানেন।
আমাদের ফোন নাম্বার পেলেন কি করে?
মানুষ চেষ্টা করলে কি না পারে।
বাসার ঠিকানা জানার চেষ্টা করেন নি?
প্রথমে চেষ্টা করে বাসার ঠিকানা জেনেছি, তারপর ফোন নাম্বার। রিজিয়াকে দিচ্ছেন না কেন? বাসায় নেই না কি?
কেন, আমার সঙ্গে কথা বলতে বিরক্ত লাগছে বুঝি?
না-না বিরক্ত লাগবে কেন? বরং ভালোই লাগছে।
তা হলে রিজিয়াকে বারবার চাচ্ছেন কেন?
এই কথার উত্তরে কি বলবে ভেবে না পেয়ে হিমু চুপ করে রইল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফারিহা বলল, কিছু বললেন না যে?
আপনার প্রশ্নের উত্তর পরে এক সময় দেব। এখন রিজিয়াকে ফোনটা দিলে আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।
থাক, আপনাকে আমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে না, ধরুন ওকে দিচ্ছি। তারপর রিজিয়ার হাতে রিসিভার ধরিয়ে দিয়ে বলল, ডাক্তার সাহেব তোর সঙ্গে কথা বলবে বলে অস্থির হয়ে পড়েছেন। কথা শেষ করে ফারিহা রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
হিমু ফোন করেছে জানার পর থেকে রিজিয়ার সারা শরীরে আনন্দের শিহরণ বইছে। লজ্জায় তার গলা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই রিসিভার কানের কাছে ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
ফারিহা রিসিভার রিজিয়াকে দিয়ে যে কথা বলেছে, হিমু শুনতে পেয়েছে। তাই রিজিয়াকে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকতে দেখে বলল, চুপ করে আছেন কেন? আজ তিন সাড়ে তিন বছর আপনাকে দেখার ও আপনার গলার সুমিষ্ট কথা শোনার জন্য অধীর হয়ে আছি। আপনি হয়তো ভেবেছিলেন শহরের ছেলেরা প্রতারক। তারা কথা দিয়ে কথা রাখে না। এরকম ভাবাটা ঠিক হয় নি আপনার। কারণ সবাই একরকম হয় না। প্লিজ, কিছু অন্তত বলুন।
রিজিয়া আর চুপ করে থাকতে পারল না। সালাম দিয়ে বলল, কেমন আছেন?
হিমু সালামের উত্তর দিয়ে বলল, শারীরিক সুস্থ থাকলেও আপনার কারণে এতদিন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলাম। কাল আড়ং-এ আপনাকে দেখার পর থেকেই সেই যন্ত্রণা আরো বেড়ে গেছে। আপনি কেমন আছেন?
সে কথা আল্লাহ ভালো জানেন।
আল্লাহ তো সব কিছু জানেন। আমি আপনার শারীরিক অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করছি।
আল্লাহর রহমতে ভালো।
ফোনে কথা বলে শান্তি পাচ্ছি না, সামনা-সামনি বলতে চাই। কখন কোথায় দেখা হবে বলুন। অবশ্য আপনার যদি আপত্তি না থাকে এবং আজও আমার কথা মনে থেকে থাকে যদি।
আপনি আশরাফ ভাইয়ের বন্ধু এতটুকু ছাড়া আপনার সম্পর্কে আর কিছুই জানি না। তবু কেন আপনার ছবি আমার হৃদয়ের আয়নায় সব সময় জোনাকির আলোর মতো একবার জ্বলছে ও একবার নিভছে আজও বুঝতে পারি না। যখন জ্বলে উঠে তখন স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করি। আর যখন নিভে যায় তখন অমানিশার অন্ধকারে হারিয়ে যাই। এই আলো আর অন্ধকারের কি যে অসহ্য যন্ত্রণা, তা আমি ও আমার একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। আপনি শুধু মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন। আর আমি আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বের যন্ত্রণার সাথে সাথে অপেক্ষার প্রহরে অহরহ জ্বলছি।
তার কথা শুনে হিমুর অন্তর জুড়িয়ে গেল। সেই সাথে সারা শরীরে আনন্দের স্রোত বইতে শুরু করল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সেই স্রোত অনুভব করতে লাগল আর ভাবতে লাগল, রিজিয়া তা হলে আমাকে ভীষণ ভালবাসে। তাই আজও আমাকে ভুলতে পারে নি।
