আজ ফারিহার শরীর খারাপ, তাই কলেজে যায় নি। শুয়ে ছিল। বারান্দায় রিং বাজতে শুনে উঠে এসে ফোন ধরে সালাম দিয়ে বলল, কে বলছেন?
মেয়েলী কণ্ঠস্বর শুনে হিমু কিছুটা স্বস্তিবোধ করে সালামের উত্তর দিয়ে বলল, এটা কি শিহাব সাহেবের বাসা?
ফারিহা বলল, জি। আপনি কাকে চান?
শিহাব সাহেব কি বাসায় আছেন?
না, অফিসে আছেন। নাম্বার জানেন? না জানলে লিখে নিন, বলছি।
আমি ওনাকে চাচ্ছি না।
তা হলে কাকে চাচ্ছেন?
আপনি কে?
ফারিহা ক্ষেপে গেল। বলল, আমি কে জানার দরকার কি? কাকে চাচ্ছেন বলবেন তো?
আপনার পরিচয় পেলে বলতাম।
ফারিহার সন্দেহ হল, কোনো বখাটে ছেলে তাকে বা রিজিয়াকে ফোনে পেতে চায়। তাই আরো ক্ষেপে গিয়ে লাইন কেটে দিয়ে রুমে এসে শুয়ে পড়ল।
লাইন কেটে দিতে হিমু মনে করল, এমনি হয়তো লাইন কেটে গেছে। তাই আবার ডায়াল করল।
ফারিহা ফোনের রিং বাজার শব্দ শুনেও না শোনার ভান করে শুয়ে রইল।
ফারিহার মা আরিফা বেগম রান্নাঘরে ছিলেন। কেউ ফোন ধরছে না দেখে একটু উঁচু গলায় মেয়েকে উদ্দেশ করে বললেন, ফারিহা, ফোনটা ধর না। কখন থেকে রিং হচ্ছে।
ফারিহা বলল, তুমি ধর, আমি ধরতে পারব না।
আরিফা বেগম কাজের বুয়াকে বললেন, ফোনটা ধরে জিজ্ঞেস কর কে ফোন করেছে।
কাজের বুয়া হানুফা ফোন ধরে বলল, কে বলছেন?
হিমু বলল, আপনি কে বলছেন?
আমি বাসার কাজের বুয়া, আপনি কাকে চান?
একটু আগে কে ফোন ধরেছিলেন?
ছোট আপা, তাকে ডেকে দেব?
ছোট আপার নাম কি?
ফারিহা।
হিমু বুদ্ধি খাটিয়ে বলল, তা হলে বড় আপার নাম রিজিয়া তাই না?
হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কে বলছেন না কেন?
আমাকে তুমি চিনবে না। বড় আপা রিজিয়াকে ডেকে দাও। বলবে ডা. হিমু ফোন করেছেন।
বড় আপা বাসায় নেই, কলেজে গেছে।
ঠিক আছে, কলেজ থেকে ফিরলে বলবে, আমি ফোন করেছিলাম, বিকেল পাঁচটায় আবার করব।
জি বলব, বলে বুয়া ফোন ছেড়ে দিল।
মা বুয়াকে ফোন ধরতে বলেছে ফারিহা শুনেছে। বখাটে ছেলেটা হয়তা বুয়ার কাছে তাদের সব খবর জানতে চাইবে ভেবে চুপে চুপে বুয়ার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। বুয়া ফোন ছেড়ে দিতে জিজ্ঞেস করল, কে ফোন করেছিল?
ওনাকে চিনি না। বড় আপাকে চাইছিল। কলেজে গেছে শুনে বলল, বাসায় ফিরলে বলতে বলল ডা. হিমু ফোন করেছিল। বিকেল পাঁচটায় আবার করবে।
ঠিক আছে, তোকে কিছু বলতে হবে না, যা বলার আমি বলব। তারপর রুমে এসে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করল, তা হলে একটু আগে ডা. হিমুই ফোন করেছিল। ক্ষেপে গিয়ে ফোন ছেড়ে দেয়াটা ঠিক হয় নি। ডাক্তার সাহেব কি ভাবলেন কি জানি। বিকেলে ফোন করলে ক্ষমা চেয়ে নেবে ভেবে রাখল।
রিজিয়া কলেজ থেকে ফিরে ফারিহাকে শুয়ে জেগে রয়েছে দেখে বলল, কিরে? কেমন আছিস?
আগে শরীর খারাপ ছিল, সাড়ে এগারটার দিকে একজন ফোন করেছিল। তারপর থেকে মনটাও খারাপ হয়ে গেছে।
কে ফোন করেছিল? আর তার ফোন পেয়েইবা মন খারাপ হল কেন?
সে অনেক কথা। তুই আগে কাপড় পাল্টে খেয়ে আয় তার পর শুনিস।
রিজিয়া কাপড় পাল্টাতে পাল্টাতে বলল, তোর সব কিছু তো আমি জানি, অনেক কথা থাকার মতো ব্যাপার আবার কি?
আগে না থাকলেও কখনো কি থাকতে নেই? তুই শুনতে চাইলে বলব, চাইলে বলব না।
ততক্ষণে রিজিয়ার কাপড় পাল্টানো শেষ হয়েছে। রুম থেকে বেরুবার সময় বলল, শুনব রে শুনব। তোর কথা শুনব না তো কার কথা শুনব?
খেয়ে এসে ফারিহাকে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতে দেখে রিজিয়া বলল, কিরে ঘুমিয়ে পড়লি নাকি।
ফারিহা না বলে উঠে বসে বলল, ডা. হিমু ফোন করে তোকে চাচ্ছিলেন।
রিজিয়া চমকে উঠে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিরে, অমন করে তাকিয়ে আছিস কেন, বিশ্বাস হচ্ছে না?
আমার তো মনে হচ্ছে তুই পুরিয়া ছাড়ছিস।
যদি বলি পুরিয়া ছাড়ছি না, সত্যি বলছি!
রিজিয়া একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, অত সৌভাগ্য কি আমার হবে?
হবে কি, হয়ে বসে আছে! আল্লাহর কসম করে বলছি, ডা. হিমু ফোন করে তোকে চেয়েছিলেন।
আল্লাহর নামে মিথ্যে কসম খেতে নেই, সে কথা ফারিহা একদিন রিজিয়াকে বলেছিল। তাই ফারিহা কসম খেয়ে বলতে বিশ্বাস না করে পারল না। সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে তার হার্টবিট বেড়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে সামলে নিয়ে বলল, তুই কি বললি?
প্রথমে ব্যাপারটা একটু উলট-পালট হয়ে গিয়েছিল।
রিজিয়া হেসে ফেলে বলল, উলট-পালট মানে?
তবে আর বলছি কি? প্রথম যখন রিং করেন তখন আমি পরিচয় জিজ্ঞেস করি। পরিচয় না বলে আমার পরিচয় জানতে চায়। বখাটে ছেলে ভেবে রেগে গিয়ে লাইন কেটে দিই। কিছুক্ষণ পর আবার রিং বাজতে থাকলে ভাবলাম সেই ছেলেটাই করেছে। তাই মা ধরতে বললেও ধরি নি। শেষে মা বুয়াকে ধরতে বলে। জানিস তো বুয়া সাদাসিধে মেয়ে। তার কাছ থেকে মনে হয়। আমার ও তোর পরিচয় জেনে নিয়ে তোকে ফোন দিতে বলেন। বুয়া বলে তুই কলেজে। তখন বুয়াকে বলেছেন, কলেজ থেকে ফিরলে তাকে বলবে ডা. হিমু ফোন করেছিলেন, বিকেল পাঁচটায় আবার করবে।
তার কথা শুনে রিজিয়ার মনে আবার আনন্দের ঝড় বইতে শুরু করল। সেই ঝড়ের তাণ্ডব সহ্য করতে না পেরে ফারিহাকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ভাবল, এসব সত্য, না স্বপ্ন দেখছে?
রিজিয়ার চোখের পানিতে যখন ফারিহার কাঁধের গায়ের জামা ভিজে গেল তখন ফারিহা নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে বলল, এতদিন পর আজ মনের মানুষের সঙ্গে কথা বলবি, এটা তো আনন্দের খবর, কাঁদছিস কেন?
