সাবিহা বেগম খুব অবাক হয়ে বললেন, একজন ডাক্তার ছেলের মুখে এ রকম কথা শুনব আশা করি নি। মনে হচ্ছে রিজিয়ার রূপের মোহে তুই অন্ধ হয়ে গেছিস। তাই আমাদের সমাজের উন্নত কালচার ভুলে গিয়ে গরিবদের কালচারকে ভালো বলছিস।
তোমার ধারণা ভুল। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আমাদের সমাজের কালচারকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারি নি। কেবলই মনে হয় এসব কালচার আমাদের নয়, পাশ্চাত্যের। যাই হোক, এ ব্যাপারে আমি আর কোনো কথা বলতে চাই না। তারপর হিমু মায়ের কাছ থেকে নিজের রুমে এসে চিন্তা করতে লাগল, মনে হয় রিজিয়া আমাকে চিনতে পারে নি। তাই সঙ্গের মেয়েটা কিছু বলতে আমার দিকে তাকিয়ে চলে গেল। তাই বা কি করে হয়? আমি একা না থাকলে না হয় সন্ত্রাসী ভেবে চলে যেত; কিন্তু মা আমার সঙ্গে ছিল। তবে কি চিনতে পেরেও না চেনার ভান করল। আবার চিন্তা করল, বিয়ে হয়ে যাই নি তো? তাই আমাকে চিনতে পেরে দ্রুত চলে গেল। তা হলে কি আমাকে চিরকুমার হয়ে থাকতে হবে? যেমন করে হোক ওর বাসার ঠিকানা জানতে হবে। হঠাৎ গাড়ির নাম্বারের কথা মনে পড়তে নিজেকে বোকা ভেবে হেসে ফেলল।
.
ঘুমাবার সময় সাবিহা বেগম স্বামীকে বললেন, বিকেলে তোমাকে হিমুর পছন্দ করা মেয়েটার কথা যে বলেছিলাম, সে ব্যাপারে হিমুর সঙ্গে আলাপ করেছি। তারপর মেয়েটার নাম ও তার পরিচয় বলে বললেন, এখন কি করবে?
রিজিয়ার পরিচয় জেনে রাগিব হাসান ছেলের ওপর খুব রেগে গিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
সাবিহা বেগম অধৈর্য গলায় বললেন, কি হল, কিছু বলছ না যে?
রাগিব হাসান রাগের সঙ্গে বললেন, হিমু এরকম একটা মেয়েকে পছন্দ করবে ভাবতেই পারছি না? আমাদের মান-সম্মানের কথা একটু ভাবল না? আমরা সোসাইটিতে মুখ দেখাব কি করে? শুনে তুমি তাকে কিছু বল নি?
বলি নি আবার। তারপর মা ছেলের সঙ্গে যে সব কথাবার্তা হয়েছে বললেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাগিব হাসান বললেন, যত শীগ্রী সম্ভব ওর বিয়ে দিতে হবে। নচেৎ যে ভূত ওর ঘাড়ে চেপেছে, তাকে নামান যাবে না।
সাবিহা বেগম বললেন, তোমার কথাটা ঠিক হলেও যুক্তিসঙ্গত নয়।
মানে?
মানে তুমি কি মনে করেছ আমরা বিয়ে ঠিক করব আর হিমু কোনো প্রতিবাদ না করে বিয়ে করে ফেলবে? ওর সিদ্ধান্তের কথা তোমাকে তো বললাম।
ও এখন ছেলেমানুষ। ওর সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিতে পারি না।
তা তো নিশ্চয়। আমি যা বলছি শোেন, কথাটা বাবাকে জানাও, উনি কি বলেন দেখ।
না, বাবাকে জানান যাবে না। বাবা হিমুকে ভীষণ ভালবাসেন। হিমু যদি একটা রাস্তার মেয়েকে পছন্দ করে, তাকেই নাতবৌ করতে চাইবেন। আমি কাল সকালে হিমুর সঙ্গে কথা বলব।
তা বল। কিন্তু মনে রেখ, হিমু আমাদের একমাত্র সন্তান। এই বংশের একমাত্র প্রদীপ। এমন কিছু বলল না, যেন সে রাগ করে বাসা ছেড়ে চলে না যায়।
সে কথা তোমাকে বলে দিতে হবে না। ভাবছি, উচ্চ ডিগ্রি নেয়ার জন্য ওকে ফরেনে পাঠিয়ে দেব।
হ্যাঁ, খুব ভালো কথা বলেছ। যত তাড়াতাড়ি পার সেই ব্যবস্থা কর।
.
পরের দিন সকালে হিমু দাদাজীকে জিজ্ঞেস করল, কোনো গাড়ির নাম্বার জানা থাকলে কিভাবে গাড়ির মালিকের ঠিকানা জানা যায় আপনি জানেন?
জাহিদ হাসান বললেন, তা জানব না কেন?
হিমু উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, তা হলে তাড়াতাড়ি বলুন।
জাহিদ হাসান নাতির উৎফুল্ল কণ্ঠ ও ব্যাগ্রতা দেখে বললেন, কী ব্যাপার, হঠাৎ গাড়ির মালিকের ঠিকানা জানার কি দরকার পড়ল?
সে কথা পরে বলব, যা জিজ্ঞেস করলাম বলুন।
আগে বল, ব্যাপারটা প্রতিশোধমূলক না প্রেম ঘটিত।
দাদু যে কি? ওসব কিছুই না। একজন পরিচিতকে অনেকদিন থেকে খুঁজছি, পাচ্ছি না। কাল তাকে একটা প্রাইভেট কারে যেতে দেখলাম। তখন গাড়িটার নাম্বার দেখে নিই। হল তো, এবার বলুন।
তা পরিচিতটা কে? মেয়ে না ছেলে?
হিমু কখনো মিথ্যা বলে না। তাই বলল, মেয়ে।
জাহিদ হাসান মৃদু হেসে বললেন, তা হলে এতদিনে কোনো মেয়ে তোমার মনে দাগ কেটেছে?
হিমু দাদুকে জড়িয়ে ধরে বলল, আপনার অনুমান ঠিক। প্লিজ দাদু, বলুন কিভাবে গাড়ির মালিকের ঠিকানা জানা যাবে?
ওয়াদা কর মেয়েটাকে দেখাবে?
হিমু অধৈর্য গলায় বলল, আপনাকেই তো আগে দেখাব।
তা হলে শোন, বি.আর.টি.এ. অফিস থেকে গাড়ির নাম্বার ও লাইসেন্স দেয়া হয়। সেখানে গিয়ে নাম্বারটা দিলে গাড়ির মালিকের ঠিকানা দিয়ে দেবে। তবে তাদেরকে মালপানি দিতে হবে। জান তো আজকাল বিনা মালপানিতে কোনো কাজই হয় না।
অসংখ্য ধন্যবাদ বলে হিমু দাদুর কাছ থেকে এসে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।
বি.আর.টি.এ. অফিস থেকে ঠিকানা জেনে যখন বাসায় ফিরল তখন বেলা দশটা।
সাবিহা বেগম ছেলেকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, নাস্তা না খেয়ে কোথায় গিয়েছিলি? তোর বাবা খুঁজছিল।
হিমু বলল, একটা জরুরি কাজে গিয়েছিলাম। বুয়াকে নাস্তা রেডি করতে বল, আমি গোসল সেরে আসছি।
নাস্তা খেয়ে রুমে এসে চিন্তা করতে লাগল। এক্ষুনি ওদের বাসায় যাওয়া ঠিক হবে কি না। গেলেও রিজিয়া কি তার সঙ্গে দেখা করবে? যদি সত্যি সত্যি বিয়ে হয়ে থাকে, তা হলেও দেখা করা তো দূরের কথা, শুনে ঐ নামে কাউকে চেনে না বলে কাজের বুয়াকে দিয়ে জানিয়ে দেবে। হঠাৎ তার মনে হল, ফোনে আলাপ করলে কেমন হয়? কথাটা মনে হতে বাবার রুম থেকে টেলিফোন গাইড এনে খুঁজে নাম্বার বের করল। তারপর টেলিফোন করার সময় ভাবল, যদি বাসার অন্য কেউ ধরে, তা হলে কি বলবে? রিজিয়াকে চাইলে যদি আমার পরিচয় জানতে চায়, তা হলেইবা কি বলবে? এইসব ভাবলেও ডায়াল করল।
