.
বাসায় ফিরে ছেলেকে গাড়ি নিয়ে বেরুতে দেখে সাবিহা বেগম বললেন, এখন আবার কোথায় যাবি?
একটু কাজ আছে বলে হিমু গাড়ি ছেড়ে দিল।
অফিস থেকে স্বামী ফেরার পর চা-নাস্তা দিয়ে সাবিহা বেগম বললেন, আজ হিমুকে নিয়ে আড়ং-এ কাপড় কিনতে গিয়েছিলাম। তারপর মেয়ে দেখার ব্যাপারে যা কিছু ঘটেছে বললেন।
রাগিব হাসান হেসে উঠে বললেন, তাই নাকি?
তবে আর বলছি কি? মেয়েটা বোরখা পরে থাকলেও মুখ খোলা ছিল। এত সুন্দর মুখ কখনো দেখি নি। ঠিক যেন পটে আঁকা ছবি।
তা তোমার যখন পছন্দ তখন দেরি না করে বিয়ের ব্যবস্থা কর।
বিয়ের ব্যবস্থা তো তুমি করবে। তার আগে মেয়ে দেখ, তার মা-বাবার সঙ্গে আলাপ কর।
ঠিক আছে, মেয়ের বাসার ঠিকানা দাও।
ঠিকানা আমি পাব কোথায়? আর হিমুও বোধ হয় জানে না। তাই ঠিকানা জেনে নিতে বলেছিল; কিন্তু সে সুযোগ আর পেলাম কই? তার আগেই তো চলে গেল।
হিমু নিশ্চয় জানে, তার কাছ থেকে ঠিকানা জেনে আমাকে বলবে।
তুমি যে কি, এক্ষুনি বললাম না, সেই তো মেয়েটার সঙ্গে আলাপ করে ঠিকানা জেনে নিতে বলেছিল।
ঠিকানা না জানলে মেয়ের মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করব কি করে? আচ্ছা, হিমু মেয়েটাকে কিভাবে চেনে? কতটা চেনে, সে সব কিছু বলেছে?
কতটা চেনে বলে নি। জিজ্ঞেস করতে বলল, একটু একটু চিনি।
তা হলে তাকেই ঠিকানা জোগাড় করতে বল।
হ্যাঁ, তা ছাড়া আর কোনো উপায় কি? বাসায় ফিরলে ওর সঙ্গে আলাপ করব।
রাতে এক সময় সাবিহা বেগম ছেলেকে বললেন, আড়ং-এ যে মেয়েটাকে দেখালি তাকে একটু একটু চিনিস বললি। কতটা চিনিস বা কিভাবে চিনিস বল তো?
হিমু বলল, প্রায় তিন সাড়ে তিন বছর আগে আশরাফ নামে এক বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানেই মেয়েটিকে দেখি। মেয়েটা ছোটবেলাতেই মা-বাবাকে হারায়। নানা-নানি ওকে মানুষ করেন। নানা স্কুলের মাস্টার ছিলেন। আমি যখন গিয়েছিলাম তখন উনি অসুস্থ ছিলেন। একদিন বন্ধুর সঙ্গে ওনাকে দেখতে গিয়েছিলাম। সেদিন বন্ধুই মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
গ্রামের গরিব ঘরের এতিম মেয়ে জেনে সাবিহা বেগমের মন খারাপ হয়ে গেল। বললেন, মেয়েটি দেখতে খুব ভালো ঠিক কথা; তাই বলে এরকম একটা মেয়েকে পছন্দ করা তোর উচিত হয় নি। গ্রামের অল্প শিক্ষিত আনকালচার্ড মেয়ে আমাদের মতো হাই সোসাইটিতে মানায় না। তা ছাড়া সেও আমাদের সোসাইটিতে এ্যাডজাস্ট করতে পারবে না। তোর বাবা শুনলে রেগে যাবে। ঐ মেয়ের কথা ভুলে যা। আমাদের হাই সোসাইটিতে কি সুন্দরী মেয়ের অভাব আছে? তাদের মধ্যে দেখেশুনে তোর বিয়ে দেব। একই সোসাইটির মেয়ে না হলে আমরা যেমন সুখ-শান্তি পাব না, তেমনি তুইও পাবি না।
মা, তোমার কথা অস্বীকার করছি না। কিন্তু মেয়েটি শুধু সুন্দরই নয়, গুণবতীও। তার গুণের কথা গ্রামের লোকের মুখে মুখে। সে অল্প শিক্ষিতও নয়। এস.এস.সি.তে খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। কলেজ অনেক দূরে বলে ওর নানা আর পড়ান নি। ওকে দেখে আমি এত মুগ্ধ হয়েছি যে, তখনই সিদ্ধান্ত নিই ওকে বিয়ে করব। তাই তোমরা এতদিন অনেক মেয়ে দেখালেও কাউকেই পছন্দ করি নি।
মেয়েটির কথা তোর বাবাকে বলেছি। শুনে বলল, মেয়েটির বাসার ঠিকানা দাও যোগাযোগ করব। এখন পাড়াগাঁয়ের গরিব ঘরের এতিম মেয়ে শুনলে তোর ওপর খুব রেগে যাবে। আমিও চাই না এরকম একটা মেয়ে আমাদের বাড়ির বৌ হয়ে আসুক। আচ্ছা, তুই তো বললি, ওর কেউ নেই, ঢাকাতে কার কাছে থাকে? এমনও তো হতে পারে এ সে মেয়ে নয়। এতদিনে তার হয়তো বিয়ে হয়ে গেছে। এই মেয়েটা সেই মেয়ের মতো দেখতে। আমার তো মনে হচ্ছে তোর চোখের ভুল। নচেৎ পরিচিত মেয়ে হলে আলাপ না করে তাড়াতাড়ি চলে গেল কেন?
তোমার কথা হয়তো ঠিক, তবু বলব রিজিয়াকে চিনতে আমার ভুল হয় নি। একশ বছর পরে দেখলেও ওকে আমি ঠিক চিনতে পারব।
তাই যদি হয়, তা হলে তোর সঙ্গে আলাপ না করে চলে গেল কেন?
হয়তো আমাকে চিনতে পারে নি অথবা অন্য কোনো কারণ আছে। শোন মা, বিয়ে করলে রিজিয়াকেই করব, নচেৎ সারাজীবন বিয়েই করব না।
সাবিহা বেগম বুঝতে পারলেন মেয়েটির নাম রিজিয়া। একটু রাগের সঙ্গে বললেন, আমরা যদি রিজিয়াকে বৌ করতে না চাই?
তোমরা চাইবে না কেন? গরিবরা কি মানুষ না?
আমি তো সে কথা বলি নি। বলেছি, প্রত্যেক মানুষের উপযুক্ত স্থান নিজ নিজ সমাজে। এক সমাজের মানুষ অন্য সমাজে বেমানান।
আমি তোমার সঙ্গে এ ব্যাপারে তর্ক করতে চাই না। আমার সিদ্ধান্ত আমি জানালাম, এবার তোমরা কি করবে না করবে, সেটা তোমাদের ব্যাপার।
একটা কথা ভাবছিস না কেন, যে মেয়ে বোরখা পরে সে কি করে আমাদের হাই সোসাইটিতে মিশবে? তুই-ই বল না, কোনো ফাংশানে বা পার্টিতে বোরখা পরা বৌ নিয়ে কি যেতে পারব? আর পারলেও বৌকে দেখে সবাই যখন হাসাহাসি করবে তখন সেই অপমান তুই বা আমরা সহ্য করতে পারব?
বোরখা পরা ওদের সমাজের নিয়ম, তাই পরে। আমাদের সমাজে এলে আমাদের নিয়মনীতি মেনে চলবে। তবে তুমি যাই বল মা, বোরখা কিন্তু মেয়েদের সম্রম বজায় রাখার একটা শ্রেষ্ঠ উপাদান। আমার মতে বর্তমান যুগে সমাজের অবক্ষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য মেয়েদের বোরখা পরেই ঘরের বাইরে যাতায়াত করা উচিত। আজকাল মেয়েরা এমন অশালীন জামা-কাপড় পরে চলা-ফেরা করে, তাদের দিকে তাকানই যায় না।
