একমাত্র ছেলের বিয়ে দেয়ার জন্য সাবিহা বেগম ও স্বামী রাগিব হাসান অনেক সুন্দরী সুন্দরী মেয়ে দেখিয়েছেন। তা ছাড়া অনেক মেয়ের ফটোও দেখিয়েছেন। তাদের কাউকেই হিমুর পছন্দ হয় নি। আজ হঠাৎ তার মুখে এরকম কথা শুনে সাবিহা খুব অবাক হলেও রিজিয়ার মুখের দিকে তাকালেন।
ফারিহার কথা শুনে রিজিয়া তাদের দিকে একপলক তাকিয়ে মুখে নেকাব দিয়ে বলল, হ্যাঁ চল। তারপর দু’জনে ত্রস্তপদে বেরিয়ে এসে পার্ক করা গাড়িতে উঠে ফারিহা ড্রাইভারকে যেতে বলল।
হিমু মাকে অপেক্ষা করতে বলে বেরিয়ে তাদেরকে একটা প্রাইভেট কারে উঠতে দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। গাড়িটা চলতে শুরু করলে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর নাম্বারটা দেখে নিয়ে মায়ের কাছে ফিরে এসে বলল, দোতলায় চল।
রাস্তার দিকে কাচের দেয়াল থাকায় সাবিহা বেগম মেয়ে দু’টিকে গাড়িতে উঠে চলে যেতে দেখেছেন। ছেলের কথা শুনে হাসি চেপে রেখে বললেন, তুই সো-পিস কিনবি না?
আজ আর কিনব না, অন্য দিন কিনব। তুমি চল তো।
তুই ওদেরকে চিনিস?
হিমু বলল, যাকে দেখালাম, তাকে একটু একটু চিনি। অন্য মেয়েটাকে চিনি না।
সাবিহা বেগম মৃদু হেসে বললেন, বাসায় ফিরে এ ব্যাপারে তোর সঙ্গে কথা বলব, এখন উপরে চল কাপড় কিনব।
ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দেয়ার পর ফারিহা পেছনে ফিরে হিমুকে তাদের গাড়ির দিকে চেয়ে থাকতে দেখে রিজিয়াকে বলল, দেখ দেখ, ছেলেটা রাস্তায় এসে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে চিনিস না কি?
রিজিয়া হিমুকে এক নজর দেখেই চিনতে পেরেছে। যেদিন সে আশরাফের সঙ্গে তাদের বাসায় গিয়েছিল, সেদিন তাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিল ঠিক; কিন্তু কল্পনাও করে নি তাকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার। তারপর যেদিন হিমু তাদের বাড়িতে এসে নানাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তখন তার তনুমনুতে আনন্দের শিহরণ বইতে শুরু করে। তারপর নানার কথা শুনে সেই শিহরণ থমকে বন্ধ হয়ে যায়। ঐ দিনই পর ঢাকা ফেরার পথে হিমু নানাকে যে কথা বলেছিল, তা শুনে থমকে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিহরণ আবার সমস্ত শরীরে বইতে শুরু করে। তারপর থেকে আজ তিন বছর হিমুকে স্বামী হিসাবে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে আসছে। ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আল্লাহকে জানায়, হিমুর সঙ্গে যেন অন্তত একবার কোথাও না কোথাও দেখা হয়ে যায়। আজ আড়ং-এ হিমুকে দেখে চমক খেলেও তা বাইরে প্রকাশ হতে দেয় নি। কয়েক সেকেন্ড মনের পিপাসা মিটিয়ে মুখের নেকাব দিয়ে ফারিহার কথা শুনে যন্ত্রচালিতের মতো এসে যখন গাড়িতে উঠেছে তখন তার মনের অবস্থা বেসামাল। আল্লাহ তার একটা আশা পূরণ করেছেন ভেবে মনে মনে তাঁর শুকরিয়া আদায় করছিল আর ভাবছিল, আল্লাহ একবার যখন তার মনের মানুষকে দেখিয়েছেন তখন আবার নিশ্চয় দেখাবেন। এইসব কথা ভাবছিল বলে ফারিহার কথা তার কানে গেল না।
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে ফারিহা আবার বলল, কি ভাবছিস? ছেলেটাকে চিনিস কি না বললি না যে?
ফারিহাকে তার মনের কথা বলা ঠিক হবে কিনা রিজিয়া চিন্তা করতে লাগল। এক সময় তার চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল।
ফারিহা অধৈর্য হয়ে তার মুখের নেকাব সরিয়ে রাগের সঙ্গে কিছু বলতে গিয়ে চোখে পানি দেখে অবাক হয়ে বলল, কিরে কাঁদছিস কেন?
রিজিয়া চোখ মুছে সামলে নিয়ে ড্রাইভারকে দেখিয়ে বলল, বাসায় গিয়ে বলব।
দু’জনে এক রুমে থাকে। দুটো আলাদা খাটে ঘুমায়। আলাদা চেয়ার টেবিলে পড়াশোনা করে। রিজিয়া দু’বছরের বড় হলেও ফারিহা তুই-তোকারি করে। বাসায় ফিরে বোরখা খুলে রিজিয়াকে বলল, এবার বল।
রিজিয়া বলল, ওয়াদা কর কাউকে বলবি না।
আমাকে বিশ্বাস করিস না?
করি।
তা হলে ওয়াদা করতে বলছিস কেন?
ঘটনাটা শোনার পর বুঝতে পারবি কেন ওয়াদা করতে বলছি।
করলাম, কাউকে বলব না।
রিজিয়া বলল, ছেলেটা আমাদের গ্রামের মাতব্বরের ছেলে আশরাফ ভাইয়ের বন্ধু। প্রায় তিন সাড়ে তিন বছর আগে আশরাফ ভাইয়ের সঙ্গে একবার বেড়াতে গিয়েছিল। তারপর যা কিছু ঘটেছিল বলল।
তা এতে তোর কাঁদবার কি হল?
সে তুই বুঝবি না।
বললে বুঝব কি করে? মনে হচ্ছে ছেলেটাকে দেখে ও তোর নানাকে ছেলেটা যে কথা বলেছিল, তা শুনে তুই তাকে নিয়ে যে স্বপ্ন বুনেছিলি; তা আজও মনে পুষে রেখেছিস?
হ্যাঁ, তুই ঠিক বলেছিস। ওর সঙ্গে কোনো আলাপ না হলেও এত বেশি ভালবেসে ফেলেছি যে, আজও ভুলতে পারি নি। তাই ওকে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে তখন থেকে প্রত্যেক নামাযের পর ফরিয়াদ করি।
কেউ কাউকে একবার মাত্র দেখে যে এত ভালবাসতে পারে তা ফারিহা জানত না। তাই অবাক হয়ে বলল, তুই কি সে সময় ছেলেটার পরিচয় জানতিস?
না। শুধু জানতাম আশরাফ ভাই ও সে একসঙ্গে ডাক্তারি পড়ে। ঢাকায় বাড়ি। আরো জানি, তারা তখন ফাইনাল ইয়ারে পড়ত।
ছেলেটার নাম ও জানিস না?
হা জানি, হিমু।
হিমু তো তোর নানাকে বলেছিলেন ডাক্তারি পাস করে তোকে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়ে থাকবেন, গিয়েছিলেন কি না জানিস?
কি করে জানব? নানাজী মারা যাওয়ার পরপরই তো মামা, মানে তোর আব্বা আমাকে এখানে নিয়ে চলে এলেন।
ফারিহা মুখে চুক চুক শব্দ করে বলল, দারুণ ভুল করে ফেলেছি। অবশ্য ব্যাপারটা যদি আগে বলতিস, তা হলে ভুলটা করতাম না। মনে হচ্ছে হিমু তোদের গ্রামে গিয়ে তোকে না পেয়ে আজও বিয়ে করেন নি। সঙ্গের মহিলা নিশ্চয় ওনার মা। তাই তোকে দেখিয়ে উনি মাকে কিছু বলছিলেন। তুইও ভুল করেছিস। আমি যখন চলে আসতে বললাম, তখন আমাকে অপেক্ষা করতে বলে তার সঙ্গে আলাপ করা তোর উচিত ছিল। যাকগে, যা হওয়ার হয়েছে। ভবিষ্যতে এ রকম ভুল আর করবি না।
