আরিফা বলল, আমি তো অনেক আগেই তোমাকে বলেছি ওকে এখানে নিয়ে চলে এসো। অনেক স্বপ্ন সত্য হয়। তুমি আজই একবার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে স্যারের খোঁজ নাও।
শিহাব বলল, হ্যাঁ, আমিও তাই ভেবেছি। আজ রাতের গাড়িতেই যাব।
.
কারো ডাকে রিজিয়ার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাড়াতাড়ি উঠে নামায পাটি তুলে রেখে বাইরে এসে শিহাবকে দেখে সালাম দিয়ে বলল, মামা কেমন আছেন?
শিহাব সালামের উত্তর দিয়ে বলল, ভালো আছি। তারপর জিজ্ঞেস করল, স্যার কেমন আছেন? তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিলি?
রিজিয়া লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে বলল, নানাজীর শরীর ভালো নয়। বিছানা থেকে উঠতে পারেন না।
সে কি রে, চল তো দেখি বলে শিহাব ঘরের ভেতরে ঢুকল।
রিজিয়া নানাজী-নানাজী বলে দুতিনবার ডেকে সাড়া না পেয়ে গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠে বলল, মামা দেখুন না, নানাজীর গা বরফের মতো ঠাণ্ডা।
তার কথা শুনে শিহাবও চমকে উঠে গায়ে হাত দিয়ে বুঝতে পারল, অনেক আগে মারা গেছেন। ইন্নালিল্লাহে…রাজেউন পড়ে বলল, স্যার চার পাঁচ ঘণ্টা আগে মারা গেছেন।
রিজিয়া না… বলে নানাজীকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
শিহাব দুই গ্রামের লোকজনদের স্যারের মৃত্যুর খবর জানিয়ে দাফন কাফনের ব্যবস্থা করল। তারপর তাদেরকে রিজিয়ার সব দায়িত্ব নেয়ার কথা জানিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে এলো। কয়েকদিন বাড়িতে থেকে রিজিয়াকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে এসে স্ত্রীকে সব কিছু জানাল।
আরিফা রিজিয়াকে মেয়ের মতো গ্রহণ করল। তার সঙ্গে কি রকম ব্যবহার করবে ছেলেমেয়েদেরকে বুঝিয়ে বলে দিল।
শিহাবের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়ে দুটো বড়। নাম ফারিহা ও সাজিদা। আর ছেলের নাম রায়হান। ফারিহা এ বছর কলেজে ভর্তি হয়েছে। সাজিদা এইটে ও রায়হান সিক্সে পড়ে।
আরিফা একদিন স্বামীকে বলল, রিজিয়া বাসায় সব সময় মন খারাপ করে থাকে। ও তো এস.এস.সি. পাস করেছে। ওকে ফারিহাদের কলেজে ভর্তি করে দাও। দুজনে একসঙ্গে কলেজে যাবে, একসঙ্গে পড়াশোনা করবে। তা হলে মন খারাপ করার সময় পাবে না।
শিহাব বলল, তুমি ঠিক কথা বলেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি সেই ব্যবস্থা করব।
প্রথম দিকে রিজিয়া মন খারাপ করে থাকলেও কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এলো। ফারিহা শহরের বড় লোকের মেয়ে হয়েও তার কোনো অহঙ্কার নেই জেনে এবং তাকে খুব ধার্মিক দেখে রিজিয়া অবাক হলেও খুব খুশি হল। কিছুদিনের মধ্যে তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠল। একসঙ্গে শুধু কলেজে যাতায়াত ও পড়াশোনা নয়, খাওয়া-দাওয়া, বেড়ান ও ঘুমান পর্যন্ত একসঙ্গে করে।
এখন তারা বি.এ. পড়ছে। এটা তাদের ফাইনাল ইয়ার। একদিন দু’জনে মালিবাগে আড়ং-এর দোতলা থেকে দু’জনের থ্রিপিস কিনে নিচতলায় হ্যাঁন্ডিক্রাফটের সো-পিস দেখছিল। বোরখা পরে মুখে নেকাব দিয়ে এলেও তখন দু’জনের মুখ খোলা ছিল। হঠাৎ ফারিয়া লক্ষ্য করল, একটা হ্যাঁন্ডসাম ছেলে রিজিয়াকে দেখিয়ে সঙ্গের বয়স্ক মহিলার কানের কাছে মুখ নিয়ে কিছু বলছে। রিজিয়াকে কনুয়ের গুঁতো মেরে ব্যাপারটা বলে বলল, মুখে নেকাব দিয়ে কেটে পড়ি চল।
আশরাফের সঙ্গে রাগারাগি করে তাদের বাড়ি থেকে চলে আসার পর হিমু তার সঙ্গে আর মেলামেশা করে নি। এমনকি কথাবার্তাও বলে নি। একসঙ্গে ক্লাস করার সময় দেখা হলে না দেখার ভান করে সরে গেছে। তারপর ডাক্তারি পাস করে একবছর ইন্টারনিশিপ করার পর মা-বাবাকে বন্ধুর বাসায় বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে একদিন আযীয মাস্টারের বাড়িতে এসে অবাক। সেখানে বিরাট হাসপাতাল হয়েছে। লোকজনদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, প্রায় দু’তিন বছর আগে আযীয মাস্টার মারা গেছেন। ওনার নাতনি রিজিয়ার কথা কেউ বলতে পারল না। হিমু একবার ভেবেছিল আশরাফের বাবাকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো রিজিয়ার খবর তিনি দিতে পারেন। আবার ভাবল, আশরাফ ইন্টারনিশিপ করে বাড়িতে আছে। তার বাবার কাছে রিজিয়ার খবর জানতে গেলে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। তাই চিন্তাটা বাদ দিয়ে গ্রামের লোকের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, পাশের গ্রামের শিহাব রিজিয়ার বাবার বন্ধু। সে রিজিয়াকে ঢাকায় নিয়ে চলে গেছে। শিহাবের ঢাকার ঠিকানা যেমন করে হোক জানার চেষ্টা করবে ভেবে ফিরে আসে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও শিহাবের ঠিকানা পেল না। এখন সে ঢাকাতেই চেম্বার খুলে প্র্যাকটিস করার চিন্তা-ভাবনা করছে। এর মধ্যে তার মা-বাবা বিয়ে দেয়ার কথা অনেক করে বলেছেন। হিমু রিজিয়ার কথা ভুলতে পারে নি। তার ধারণা, রিজিয়াকে একদিন না একদিন খুঁজে পাবেই। তাই মা বাবাকে বলেছে, এখন আমি বিয়ে করব না। তোমরা এত তাড়াহুড়ো করছ কেন? চেম্বার খুলে প্র্যাকটিস করে রোজগার-টোজগার করি, তারপর না বিয়ের ব্যাপার।
আজ তার মা সাবিহা বেগম তাকে নিয়ে আড়ং-এ কাপড় কেনার জন্য এসেছেন।
দোতলায় উঠতে গিয়ে হিমু একটা মেয়ের সঙ্গে রিজিয়াকে দেখে চিনতে পেরে মাকে বলল, পরে দোতলায় যাব। তার আগে নিচতলায় হ্যাঁন্ডিক্র্যাফটের সো-পিস কিনব। তারপর সো-পিস দেখতে দেখতে মাকে বলল, ঐ যে দুটো বোরখা পরা মেয়ে দেখছ, বাম দিকের মেয়েটাকে ভালো করে দেখ, তোমার পছন্দ কিনা। যদি হয়, তা হলে তাদের কাছ থেকে বাসার ঠিকানা জেনে নাও।
