তা অবশ্য ঠিক। শুনেছি অনেক ভালো ভালো সম্বন্ধ এসেছিল। রিজিয়া রাজি হয় নি। তারপর রাজি না হওয়ার কারণ বলল।
হিমু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুই রিজিয়াকে ও স্যারকে বলিস, ডাক্তারি পাস করার পর আমি রিজিয়াকে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়ে থাকব। স্যার আমাকে যেতে নিষেধ করেছেন, নচেৎ নিজেই গিয়ে বলতাম।
আশরাফ বলল, এটা খুব বাড়াবাড়ি করছিস। তুই তোর মা-বাবার একমাত্র সন্তান। রিজিয়ার জন্য তাদেরকে ছেড়ে চলে আসতে পারবি? তা ছাড়া তারা তোর এই হঠকারিতা কিছুতেই মেনে নেবেন না।
আমার মা-বাবাকে আমি চিনি। তারা একমাত্র ছেলের মতের বিরুদ্ধে কিছু করবেন না।
সে বিশ্বাস আমার আছে। তবু আমি তোর কথা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। আর রিজিয়া ও স্যারকে ঘরজামাই হয়ে থাকার কথা যে বলতে বললি, তা বলতেও পারব না।
হিমু খুব রেগে গিয়ে বলল, এটাই বুঝি বন্ধুর পরিচয়?
হ্যাঁ, এটাই প্রকৃত বন্ধুর পরিচয়। কারণ তোর সর্বনাশ হতে আমি কিছুতেই দেব না। তুই যাতে রিজিয়াকে বিয়ে করতে না পারিস সেই চেষ্টাই করব।
তুই যাকে সর্বনাশ বলছিস, সেটাই আমার জীবনের পরম পাওয়া। যতই বাধা দিস, আমি রিজিয়াকে যেমন করে তোক বিয়ে করবই।
আমিও দেখব তুই কেমন করে রিজিয়াকে বিয়ে করিস।
ততক্ষণে তারা বাড়িতে চলে এসেছে। হিমু নিজের কাপড়-চোপড় ব্রিফকেসে ভরে নিয়ে বলল, আজ থেকে আমাদের বন্ধুত্ব শেষ। জানিস তো আমি যা বলি তা করেই থাকি। কথা শেষ করে ব্রিফকেস নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
আশরাফ তাকে বাধা দিতে গিয়েও দিল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে ভাবল, হিমু, তুই এখন রিজিয়ার রূপে পাগল হয়ে আছিস, তাই আমাকে ভুল বুঝে চলে গেলি। একদিন না একদিন তোর ভুল ভাঙবেই। একসময় তার চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল।
হিমু আশরাফদের ঘর থেকে বেরিয়ে আযীয মাস্টারের বাড়িতে এল।
আযীয মাস্টার উঠোনের একপাশে তোলা পানিতে গোসল করছিলেন। তাকে দেখে খুব রাগের সঙ্গে বললেন, তোমাকে আসতে নিষেধ করেছি না?
হিমু বলল, আমি ঢাকা চলে যাচ্ছি। তাই একটা কথা বলার জন্য এসেছি।
আযীয মাস্টার জোর গলায় রাগের সঙ্গেই বললেন, আমি তোমার কোনো কথা শুনতে চাই না। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও।
আপনি শুনতে না চাইলেও আমি বলব। ডাক্তারি পাস করার পর আমি এসে আপনার নাতনিকে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়েই থাকব। এর মধ্যে অন্য কোথাও তার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন না। কথা শেষ করে হিমু হনহন করে হাঁটতে শুরু করল।
রিজিয়া রান্নাঘরে রান্না করছিল। নানার বড় গলা পেয়ে উঁকি মেরে হিমুকে দেখে ও তার কথা শুনে যতটা না অবাক হল, তার থেকে হাজার গুণ বেশি আনন্দিত হল। বিড়বিড় করে বলল, আল্লাহগো, তুমি মানুষের মনের গোপন কথা জান, তুমি আমার মনের নেক বাসনা পূরণ করো।
এরপর থেকে আযীয মাস্টার দিনের পর দিন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়তে লাগলেন। চলাফেরা মোটেই করতে পারেন না। মাতব্বরের কাছ থেকে আনা টাকা ফুরিয়ে যেতে- যেদিন উপোষ গেল, সেদিন রাতে নাতনিকে বললেন, তুই কাল মাতব্বরের কাছে গিয়ে কিছু টাকা চেয়ে নিয়ে আসবি।
রিজিয়া বলল, না খেয়ে মরে গেলেও আমি টাকা চাইতে মাতব্বরের কাছে যেতে পারব না। কথাটা বলল বটে, কিন্তু সারারাত চিন্তা করল, মাতব্বরের কাছ থেকে টাকা না নিয়ে এলে নানাজী না খেতে পেয়ে মারা যাবেন। আর সেইবা কতদিন না খেয়ে থাকতে পারবে? সারারাত নফল নামায ও কুরআন পড়ে আল্লাহর কাছে কেঁদে সাহায্য চাইল। রাত জাগার ফলে ফজরের নামায পড়ার পর তার চোখে ঘুম ভেঙে এল। ফলে নামাযের পাটিতেই ঘুমিয়ে পড়ল।
.
০৪.
শিহাব একদিন স্বপ্ন দেখল, আযীয মাস্টার মারা গেছেন। আর রিজিয়া পাগল হয়ে গেছে। স্বপ্নটা দেখার পর শিহাবের ঘুম ভেঙ্গে গেল। চিন্তা করল, স্যারের কিছু হয় নি তো? তারপর আর ঘুমোতে পারল না।
সকালে স্বামীর মন খারাপ দেখে স্ত্রী আরিফা জিজ্ঞেস করল, আজ তোমাকে যেন কেমন দেখাচ্ছে, রাতে কি ভালো ঘুম হয় নি?
শিহাব বাবার বন্ধু আরমান চৌধুরীর একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করেছে। আরমান চৌধুরী শিহাবদের গ্রামের লোক হলেও ঢাকায় ব্যবসা করে বাড়ি গাড়ি করেছেন। শিহাব লেখাপড়া শেষ করার পর তিনি তাকে ঢাকায় ব্যবসায় নামিয়েছেন এবং পরে মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য বিয়ের ব্যাপারটা শিহাবের বাবা ও আরমানের মধ্যে অনেক আগে থেকে পাকা কথা হয়ে ছিল।
আরিফার মা রেহানা ও বাবা আরমান চৌধুরী খুব ধার্মিক। মেয়ে আরিফা ছোটবেলা থেকে মা-বাবাকে অনুসরণ করেছে। তাই বড়লোকের একমাত্র মেয়ে কলেজ-ভার্সিটিতে পড়লেও যেমন ধর্মীয় জ্ঞান পেয়েছে তেমনি সেসব মেনেও চলে।
শিহাব এক সময় স্ত্রীকে বন্ধু রাকিবের বিয়ের কথা, কিভাবে সে মারা গেল ও রিজিয়াকে তার দাদা-দাদির অস্বীকার করার কথা যখন বলে তখন আরিফা দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিল, রিজিয়াকে নিয়ে এস, আমি তাকে মায়ের স্নেহ দিয়ে মানুষ করব।
শিহাব বলেছিল, তুমি আমার মনের কথাটা বলেছ। কিন্তু আযীয স্যার ওকে ছাড়া বাঁচবেন না।
আজ স্ত্রীর কথা শুনে বলল, ঘুম হয়েছে। তারপর স্বপ্নের কথা বলে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, ভাবছি স্যারের কিছু হয়ে গেল রিজিয়াকে এখানে নিয়ে আসব।
