পুকুর থেকে গোসল করে এসে খাওয়ার পর বিশ্রাম নেয়ার সময় হিমু বলল, আমার একটা উপকার করবি?
আশরাফ বলল, বন্ধু বন্ধুর উপকার করবে না তো শত্রুর করবে? বল কি করতে হবে।
আমি রিজিয়াকে বিয়ে করব, তোকে সব কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।
তোর কি মাথা খারাপ হল? এরকম বাজে চিন্তা করবি না।
মাথা আমার খারাপ হয় নি, আর বাজে চিন্তাও করছি না। তোকে কাল বললাম না, রিজিয়াকে দেখে আমার মনে হয়েছে এই প্রথম কোনো মেয়েকে দেখছি।
তা বলেছিস, তাই বলে চাল-চুলোহীন, পাড়াগাঁয়ের অল্প শিক্ষিত এরকম একটা মেয়েকে বিয়ে করার কথা বলতে মুখে বাধল না? তোর কি রুচি বলতে কিছু নেই। না-না, এ কখনই সম্ভব নয়। তুই রিজিয়ার রূপ দেখে মাতাল হয়ে গেছিস। কোনো সুস্থ মানুষ মাতালের কথামতো কাজ করতে পারে না।
তা হলে তুই আমার উপকার করবি না?
এটা তো উপকার করা নয়, বরং সর্বনাশ করা। এটা ফাইনাল ইয়ার। এক বছর পর তুই ডাক্তার হবি। আমার চেয়ে তুই ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। তুই ই বল না, এ সময় তোর কি বিয়ে করা উচিত? জেনেশুনে আমি তোর সর্বনাশ করতে পারব না।
আমার ভালোমন্দ তোকে চিন্তা করতে হবে না। সাফ সাফ বল, উপকার করবি কি না।
আশরাফ কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করে বলল, মাফ কর, আমার দ্বারা একাজ করা সম্ভব নয়।
ঠিক আছে, তোকে আর কিছু বলব না, যা করার আমি নিজেই করব।
তুই রাগ করছিস কেন? একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখলেই বুঝতে পারবি কত বড় সর্বনাশের পথে পা বাড়াতে যাচ্ছিস?
এক কথা বারবার বলবি না তো, তোকে কথাটা বলাই ভুল হয়েছে।
আশরাফ চিন্তা করল, এখন ওকে যত ভালো কথাই বলি না কেন, ওর মগজে ঢুকবে না। তাই আর কিছু না বলে চুপ করে রইল। পরের দিন সকালে আশরাফ ও হিমু আযীয মাস্টারকে দেখতে গেল।
রিজিয়া তখন বৈঠকখানা আঁট দিচ্ছিল। তাদেরকে দেখে আঁটা রেখে ওড়নাটা ভালো করে গায়ে-মাথায় দিয়ে সালাম দিল।
আশরাফ সালামের উত্তর দিয়ে বলল, স্যার আজ কেমন আছেন?
রিজিয়া বলল, কালকের থেকে ভালো।
চল, তবু স্যারকে একটু পরীক্ষা করে দেখব।
আযীয মাস্টার চা-বিস্কুট খেয়ে ঘরের বারান্দায় বসেছিলেন। রিজিয়া কারো সঙ্গে কথা বলছে শুনে একটু উঁচু গলায় নাতনিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কার সঙ্গে কথা বলছিস?
রিজিয়া তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আসার সময় বলল, আশরাফ ভাই ও তার বন্ধু আপনাকে দেখতে এসেছেন।
কাছে এসে আশরাফ সালাম বিনিময় করে বলল, রিজিয়ার কাছে শুনলাম আজ আপনি ভালো আছেন। তবু একটু পরীক্ষা করব।
আযীয মাস্টার রিজিয়াকে বললেন, আশরাফের বন্ধুকে একটা টুল এনে দে বসুক।
রিজিয়া ঘরের ভেতর থেকে টুল এনে হিমুকে বলল, আপনি বসুন। তারপর রান্না ঘরের দিকে চলে গেল।
হিমু আশরাফকে বলল, তুই টুলে বস, আজ আমি স্যারকে পরীক্ষা করব। এই কথা বলে পরীক্ষা করে বলল, ভীষণ দুর্বল। রোদে একদম হাঁটাহাঁটি করবেন না। কয়েকদিন সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেবেন। তারপর বলল, আপনি যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলতে চাই।
আযীয মাস্টার বললেন, তোমরা আমারা নাতির বয়সী। তার ওপর শিক্ষিত। আজ বাদে কাল ডাক্তার হবে। তোমাদের কথায় মনে কিছু করব কেন? বল কি বলতে চাও।
রিজিয়া একটা থালায় দুকাপ চা ও কয়েকটা বিস্কুট নিয়ে আসার সময় হিমুর ও নানাজীর কথা শুনেছে। তাই থালাটা বিছানার পাশে রেখে রান্না ঘরে গিয়ে হিমু কি বলে শোনার জন্য কান খাড়া করে রইল।
আশরাফ বুঝতে পেরেছে হিমু কি কথা বলবে। সে কিছু বলার আগে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, আগে চা খেয়ে নে তারপর যা বলার বলবি।
হিমু চা খেয়ে কাপটা নামিয়ে রেখে আযীয মাস্টারের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আপনার নাতনিকে বিয়ে করতে চাই।
মেয়ের মতো নাতনির জীবনেও একই ট্র্যাজেডি ঘটতে দেখে আযীয মাস্টার চমকে উঠে এতো রেগে গেলেন যে, অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলেন না।
আর রিজিয়া কথাটা শুনে তার তনুমনুতে অজানা শিহরণ বইতে শুরু করলেও লজ্জায় তার মুখটা লাল হয়ে গেল।
কথাটা বলে হিমু মুখ নিচু করে নিয়েছিল। স্যারকে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকতে দেখে মুখ তুলে দেখল, তিনি খুব রাগের সঙ্গে একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভয়ে ভয়ে বলল, জীবনসঙ্গী পছন্দ করার অধিকার ইসলাম নর-নারীকে দিয়েছে। তাই…।
আযীয মাস্টার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, তা আমি জানি। তুমি বড়লোকের ছেলে হও আর গরিব লোকের ছেলে হও, যাই হও না কেন তোমার প্রস্তাব মেনে নিতে পারছি না। তুমি আর কখনও এখানে এসো না। তারপর আশরাফের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি একে সঙ্গে নিয়ে আর আসবে না। এখন তোমরা যাও।
হিমুর কথা শুনে স্যার যে খুব রেগে গেছেন ও তার প্রতিও খুব অসন্তুষ্ট হয়েছেন আশরাফ বুঝতে পারল। তাই কিছু না বলে হিমুকে নিয়ে বেরিয়ে এল। ঘরে ফেরার পথে হিমু বলল, বিয়ে করার কথা শুনে স্যার অত রেগে গেলেন কেন বলতে পারিস?
আশরাফ বলল, তা আমি কি করে বলব। তবে মনে হয় শহরের ছেলেদের ওপর ওনার খুব রাগ। রিজিয়ার বাবাও শহরের ছেলে ছিল কি না।
তাতে কি হয়েছে। তিনি তো স্ত্রীর সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করেন নি। তাকে ত্যাগও করেন নি। এ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন। এতে তো ওনার কোনো হাত ছিল না।
