বিকেলের দিকে চাদর গায়ে দিয়ে ইন্দুবালাকে বেরোতে দেখে পথ আটকায় ধনঞ্জয়। “চললে কোথায় শুনি?” ইন্দুবালা বলেন “হেতালের মাকে একটু বলে আসি। যদি একটু কচি কচু পায়”। ধনঞ্জয় রেগে যায়। “সেটা কাল সকালে বললেও হবে। এক্ষুনি সন্ধ্যে নামবে। রাতে ভালো দেখতেও পাও না। আমি হোটেল ছেড়ে বেরোতে পারবো না। একা কী করে যাবে শুনি?” ইন্দুবালা ধনঞ্জয়ের নাক ফোলানো দেখে হাসেন। “জানিস না আমার যে একজোড়া বেড়ালের চোখ আছে। রাতেও দেখতে পায় ভাল”। ধনঞ্জয় বিরক্ত হয়। “কচুবাটা করতেই হবে? যে যা বলবে তোমাকে তাই করতে হবে? না বলতে পারো না তুমি, তাই না?” ইন্দুবালা বলেন, “ওমা সে কী কথা! মেয়েটা মুখ ফুটে একটু কচুবাটা খেতে চেয়েছে, না বলবো কী করে?” ধনঞ্জয় চিৎকার করে। “তুমি কিন্তু বলেছিলে লছমী মারা যাওয়ার পরে এই বাড়িতে কচুবাটা হবে না”। কেমন যেন ধাক্কা খান ইন্দুবালা। সন্ধ্যে নামছে সবে শীত আসা শহরে। ছেনু মিত্তির লেনে যে কটা পুরোনো বাড়ি রয়ে গেছে, যেগুলো এখনও ফ্ল্যাট হয়ে যায়নি সেগুলোর জানলা বন্ধ। অনেক উঁচু উঁচু
ফ্ল্যাটগুলোতে বাইরে থেকে বোঝা যায় না সেখানে মানুষ থাকে কিনা। কিংবা থাকলেও প্রাণের কোনো অস্তিত্ব আছে কিনা। মাঝে মাঝে কাপড়জামা জানলা কিংবা বারান্দায় ঝুললে বোঝা যায় ওখানে কেউ বাস করে। ইন্দুবালার এই মুহূর্তে নিজেকে বড় একা মনে হয়। কবেকার লছমীর কথা মনে পড়ে যায়। সারাক্ষণ চারপাশে যাদের সাথে কথা বলেন তাদের মধ্যে যে লছমী নেই সেটাই ভাবতে পারেন না তিনি। চান না। কেন তিনি এতদিন বেঁচে আছেন এই ভাবনা মাথায় চাগাড় দেবার আগেই হনহন করে হাঁটতে থাকেন ইন্দুবালা হেতালের মায়ের ঝুপড়ি ঘরের দিকে।
বাজার থেকে ফেরার পথে লছমী বলে “কই মা দাও দেখি ভাত খাই তোমার কচুবাটা দিয়ে”। শীতের বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে গেছে লছমী। ইন্দুবালা আলমারি থেকে নিজের একটা কাপড় বের করে দেন। লছমীর বারণ করা সত্ত্বেও গরম জল করে দেন স্নানের জন্য। আসন পেতে গরম ভাত খেতে দেন লছমীকে। কচুবাটা দিয়ে ভাত মেখে লছমী মুখে তোলে। “এটা কী করেছিস মা?” অবাক হয়ে তাকায় ইন্দুবালার দিতে। “ভালো লাগেনি তোর?” ভয়ে ভয়ে জানতে চান ইন্দুবালা। লছমী বলে “ভালো মানে বহুত ভালো”। শুধু কচুবাটা দিয়ে সব ভাতটা খেয়ে নেয় লছমী। কত দিন পরে তাকে এইভাবে বসে কেউ খাওয়ালো। কতদিন পর? বয়েস যখন বারো কি চোদ্দ শাদি হয়ে গিয়েছিল তার। ইন্দুবালা অবাক হন “এত ছোটোবেলায়?” লছমী বলে “তা নয়তো কি? বাপ তো মেয়েকে বিদাই দিতে পারলে বাঁচে। গ্রামে তো আর আমার বয়সী একটা মেয়েও ছিল না। তারপর বাবা চারটে ভইষ সওদা করে টাকা দেয় আমার মরদকে। তখন রাজি হয় সে। তোমার কত সওদা হয়েছিল মা?” ইন্দুবালা হাসেন। সবটা তো আর বাবা বলেনি। তবে গা ভর্তি গয়না পরিয়ে দিয়েছিল মা। সেই গয়নার আজ একটাও নেই। বাবু মাস্টার রতনলাল মল্লিকের হাত দিয়েই সব খরচ হয়ে গেছে অনেক দিন আগে। লছমীরও কোনো গয়না নেই। মন খারাপ করে বসে থাকে দুজনে। গয়নার জন্য কি শুধু? মোটেই না। “কবে তুই শেষ তোর গ্রামে গেছিস লছমী?” লছমী বলে “তাও বছর দশ আগে। বাবা মা কলেরায় মারা গেল। তারপর কমলা নদীতে বান এলো। ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল। সব কুছ। আমাদের গাঁওটা আছে জানি। কিন্তু আর কার কাছে যাবো মা?” লছমীর গল্পে ইন্দুবালাও যেন কেমন খুঁজে পান নিজেকে। বিয়ের পরে একবারও যাওয়া হয়নি কলাপোতায়। কার কাছে যেতেন? কেউ ছিল না সেই পোড়া ভিটেয়। সেদিন ইন্দুবালা লছমীকে আর যেতে দেননি। পরের দিন বনধ। অনেক করে বলেছিলেন থেকে যা না লছমী। সারা রাত দুজনে গল্প করবো। সত্যি করেও ছিলেন তাই। কত কত যে গল্প দুজন দুজনের জন তুলে রেখেছিলেন তার হিসেব ওই জাবদা খাতাও দিতে পারতো না। “তুই যদি আমাদের গাঁও কি দরওয়াজার কাহানী শুনিস না মা তাজ্জব বনে যাবি”। ইন্দুবালা অতশত হিন্দি জানেন না। লছমীর সাথে থেকে একটু একটু করে কয়েকটা শব্দ বোঝেন। “গাঁও কি দরওয়াজা সে আবার কী রে?” শুনে লছমী জিভ কেটেছিল লম্বা করে। “হাই রাম! তুই গাঁও কি দরওয়াজা জানিস না মা? তাহলে শোন। গাঁওয়ের বাইরে একটা ছাউনি করে রাখা থাকে। সেখানে এসে বসে দূর গাঁও থেকে আসা মেহমান। রাম দুলার ওখানে বসেই ভজন করে। বরাতির থাকা হুয়া মেহমান ওখানেই রাতে নিন্দ যায়। ছররা সিং ওখানেই রাতে ছাগলগুলোকে বেঁধে রাখে। আরও কত কী যে হয়! ওখানেই তো আমাদের মুখিয়া তার মেয়ের শাদিতে দশ গাঁওয়ের লোককে বৈঠ কর খিলালো। ওটা যখন দূর থেকে দেখতে পেতাম না মা, মনে হতো আমার গাঁও চলে এসেছি। আর যাবার সময় মনে হতো এই যে ছেড়ে যাচ্ছি আবার কখন ফিরতে পারবো?” মাঝরাতে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ইন্দুবালা হালকা করে দেন। “আরে আমাদের জলসত্রের মতো। বিশালাক্ষ্মী তলায় ছিল তো। দূরের অচেনা অজানা পথিক তেষ্টার জল পেয়ে বিশ্রাম করতো। বোষ্টম বোষ্টমী ওখানেই সিধে পেয়ে দুটো চালে ডালে ফুটিয়ে খেত। গাঁয়ের বুড়োরা আচ্ছা জমাতো ওখানেই”। দুটো মেয়ে তাদের দুজনের সবচেয়ে ভালোলাগা জায়গা দুটোর গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে।
