সেখানে এখনও ভাঙা খোলামকুচির টুকরা ঊর্ধ্বে উঠিয়া অদৃশ্য, এই খোলামকুচির টুকরা অগণন দেহের পথ প্রদর্শন করে–যে দেহগুলি বীভৎস, ভয়াল, শ্লেষ্মবৎ এবং অশরীরী; তাহারা সকলেই তৃষ্ণার্ত, তাহারা সকলেই বৈজুর অন্তরঙ্গ; যাহাদের লইয়া সে খেলা করে। নববধূ উপলব্ধি করিলেন সেই প্রেতগুলির কাহারও হস্তে মরুভূমি, কাহারও হস্তে অপঘাত, কাহারও বা হস্তে চোরাবালির আজ্ঞা। ইহারা অগ্নিকে স্বীকার করে না। ইহারা অন্তঃসত্ত্বা ছাগলকে ভালবাসে…। এই ভয়ঙ্কর শোভাযাত্রা বৈজুর ঊর্ধেই প্রতিভাত, তাঁহার তালু শুষ্ক, যেখানে সিক্ততা নাই আর্দ্রতা নাই জল নাই, সেখানে শব্দও নাই; যশোবতী তৃষ্ণার্ত্ত; আর ভৌতিক দৃশ্য ক্রমশঃ অগ্রসর হয়।
বৈজুনাথ অনুচ্চ রবে হাসিল, এ সময় বক্ষখানি তুলিয়া ধরিয়াছিল, এবং একটি নিঃশ্বাস লইয়া কহিল, “কনে বউ, আমি ভূত নই, প্রেত নই… আমি বৈজু বটে গো।”
যশোবতীর সঘন, উপর্যুপরি নিঃশ্বাসে কবরী খুলিয়া গেল, তাঁহার মস্তক আন্দোলিত হয়।
“তবে বটে, ভূত প্রেতের সঙ্গে আমার কথা হয়, তারা আমার স্যাঙাৎ” বলিয়া মাটির নিকটে মুখ রাখিয়া হাস্য করিতে কিঞ্চিৎ ধূলা উড়িল এবং সে যুগপৎ কহিল, “আমাকে এক বেটা ও ঘুম এই ঘুম বলি ডাকে, আমি সে শালার বুকে লাথি মারি”–একথা শেষ হওয়ায় উর্ধস্থিত অশরীরী যাহারা তৃষ্ণার্ত্ত–তাহারা হা-হা করিয়া হাসিয়া খুসী হইল। পুনরায় ভগ্নস্বরে সে বলিতে আরম্ভ করিল, “তুমি জান…তুমি কি? দোসর…ভাঙ্গা কুলো। আমি বৈজুনাথ, আমার বটে মড়া পুড়বে সহ্য হয়” বলিয়া বালকের ন্যায় আহ্লাদিত হইয়া, ভঙ্গী সহকারে কহিল, “চিতায় যে কত লোক আমার হাতে ঠেঙা খায়, আমার দরদ নাই…” আবার অনুচ্চ হাসির শব্দ করিয়া দৃষ্টি নামাইল। পরক্ষণে বুকফাটা কণ্ঠে কহিল, “কিন্তু জ্যান্ত কেউ পুড়বে আমার আমার…কষ্ট হয়…” বলিয়া দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়া তাঁহার দিকে চাহিয়া, আপনার হস্ত ঠেটিতে ঘষিতে লাগিল; তাহার পশ্চাতে, নিম্নে, সমতল গঙ্গা স্রোতোময়ী।
“ওগো বাবু আমি ভাবের পাগল নই–আমি ভবের পাগল! তুমি পুড়বে চচ্চড় করে…ভাবতে আমার–চাঁড়ালের বুক ফাটছে গো” এবং বৈজুনাথ কহিল, “তুমি পালাও না কেনে।” এ স্বর যেমত বা দাড়িম্বকে বিদীর্ণ করিয়া উৎসারিত।
যশোবতী একথা শুনিবার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, তিনি আপনার হস্তের একটি বলয় তাহার প্রতি নিক্ষেপ করিবার মানসে প্রায় খুলিতে গিয়া মৃতপ্রস্তর; তিনি প্রমাদ গণিলেন।
বৈজুনাথকে নববধূর দেহস্থিত কিয়দংশে অবিড়ম্বিত চন্দ্রালোক যেন উৎসাহিত করিল, ধীরে ধীরে কহিল, “আমি বড় গতরক্যাঙলা লোক গো, কনে বউ, তুমি পুড়বে, আকাশ লাল হবে, ভয়ে গোরু পৰ্য্যন্ত বিইয়ে ফেলবে গো। তুমি গেলে, কি আর বলব আমি চাঁড়াল, দেশে আকাল দেখা দেবে…লাও…লাও তুমি পালাও…কনে বউ পালাও।”
ইতিমধ্যে হস্ত হইতে বলয়খানি বিচ্যুত হইয়া তাঁহার হিতাহিত জ্ঞানকে স্পষ্টতর করে, পুনরপি বলয়টি ঝটিতি তির্যকভাবে দেখিলেন, দেখিলেন গত সন্ধ্যায় তিনি সম্যক স্বাধীনতা দিয়া তিনিই বন্ধনলীলায় মুমুক্ষু; আর যে বন্ধন-তিতিক্ষার নামই ত স্বাধীনতা! এবং ভগবান তাঁহার কোলে, ফলে নয়ন নিমীলিত করত পথ অনুসন্ধান মানসে কিয়ৎক্ষণ যাপন করিলেন। অনন্তর যশোবতী বৈজুনাথের সকল কথা যাহা তখনও নিকটস্থ শূন্যতাকে বিচলিত করিয়া ঘূর্ণায়মান, তাহা শুনিতেছিলেন; কিন্তু কতখানি যে তাহার মর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা নির্ণয় করা কঠিন নহে। অসম্ভব রাগান্বিত হইয়া কি যেন বলিলেন; হায় এখনও তিনি তৃষ্ণার্ত অথবা ঊর্ধ্বলোকের বীভৎস প্রেতসকলের, যাহারা নিয়ত তৃষ্ণার্ত–তাহাদের প্রতিধ্বনি মাত্র; শুধু শব্দ হইল। যে শব্দের অর্থ নাই। ইহার পর তিনি শক্তি সঞ্চয় করিয়া মাটিতে একটি পদাঘাত করিলেন…।
…সঙ্গে সঙ্গে বৈজুনাথ গড়াইয়া কিছু দূরে গেল, তাহার গাত্র ধূসরিত হরিশোভা, সে সংযত চিত্তে বলিল, “কনে বউ তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছ, আকাশের লেগে ভয় পাও হে, মাটির লেগে ভয় কেনে?” বলিয়া আর এক পাক দিল; ইহার পরে বেলাতটের দিকে চাহিয়া কহিল, “তুমি আকাশ কালো করবে গো, হাতী হাতী ধোঁয়া উঠবে, সতী হবে, তোমার নামে কত মানত, কত নোয়া শাঁখা জমা হবে। তোমার নামে অপুত্রের পুত্র হবে, নিধনের ধন হবে।” ক্ষিপ্রবেগে মুখ ফিরাইয়া বলিল, “তোমার বরে হিজড়ে ঢ্যাঁড়া দিবে হাটে–হো সতীর বরে গো মানুষ হইলাম” বলিয়া হাসিয়া আরবার কহিল, “তোমার স্বল্প বাস হবে, পান তামাক পাবে। হ্যাঁ গা কনে বউ, স্বগটা কেমন গো-দুধ আলতায়?” ইহার পর অদ্ভুত হাস্য করত আপনকার মস্তক মাটিতে স্থাপনা করে; এ-মাটি বড় সুন্দর, তাহার কেশরাশিতে মৃত্তিকা লাগিল।
যশোবতীর হিম রোমাঞ্চ ক্ৰমে শব্দ হইয়া আসিল।
বৈজুনাথ, তদ্রূপ, পূৰ্ব্বের ন্যায় পাক দিয়া ঘুরিয়া গেল। বলিল, “কনে বউ ভাবের ঘরে চুরি…ভাল লয়…” এই বচনের মধ্যে শ্লেষময় সাবধানতার হুঙ্কার ছিল। কহিল, “ভাবের ঘরে চুরি ভাল লয়” মনে হয় সে যেন কানে কানে কথাটি কহিতেছে। বাণবিদ্ধ পশু যেমত মুখোনি হন্তার দিকে তুলিয়া চাহিয়া থাকে, সেইভাবে বৈজুনাথ মুখটি তুলিল। ক্রমে পতিতপাবনী গঙ্গার দিকে চাহিয়া উচ্চারণ করিল, “ভাবের ঘরে চুরি।” অবশেষে তাহার মুখটি নিস্তব্ধ না’য় পরিস্ফুট।
