চতুর্দোলার আসনে যজ্ঞবাট করা হইয়াছে, চারিভিতে ছোঁড়া কদলীবৃক্ষ লাল সূতা দিয়া গণ্ডীবদ্ধ, উপরে মালাকার মেঢ় ঝুলাইতে ব্যস্ত, প্রতিটি মেঢ়ে দশমহাবিদ্যার এক এক রূপ আলেখ্য, শেষ কয়েকটি মালাকরের ছেলেরা আঁকিতেছে, তাহাদের বধূরা ফুলমালা গাঁথে, ধান্য কঙ্কন, খৈয়ের সাত নহর তৈয়ারী হয়। দিকে দিকে হরিধ্বনি, কাঁসর ঘণ্টা ঢাক বাজিতেছে, পক্ষীরা ভয়ার্ত পলায়মান, গাছে গাছে ‘চালকা’ কাপড়ের নিশান উড়িতেছে। কীৰ্ত্তন হয়, কোথাও খাঞ্চে করিয়া সামলা মাথায় একজনা। ঢপ গাহিতেছে, তাহার সামলার চুমকী পুঁতি আবেগে চঞ্চল। সিন্দুর বিক্রেতা গেরী মাটিতে লা। মিশাইয়া ভাটি বসাইয়াছে; নূরীরা রুলী গড়ে, তাঁতিরা এবং কাঁপালিরা সূতা কাটিয়া আলতায় রঙ করিতেছে, ছুতার আপন মনে তুলসীমালা গাঁথিতে ব্যস্ত; বাটাদার কড়ির পাহাড় করিয়াছে; লোয়াদার বাতাসাওয়ালারা একদিকে বাতাসা কাটিতেছে (যাহা অসম্ভব কারণ লোয়াদা এইস্থান হইতে, পদব্রজে, প্রায় চল্লিশ মাইল)। পুণ্যলোভী স্ত্রীলোকেরা স্থানচ্যুত হইবার আশঙ্কায়, পার্শ্ব পরিবর্তন পর্য্যন্ত করিতেছেন না, ফলে অনেকেই স্থান অপবিত্র করিতেছেন। কেহ কেহ উত্তম স্থানের লোভে দৌড়াদৌড়ি করিতেছেন। ব্রাহ্মণেরা শশব্যস্তে পাঁজী পাঠ করিতেছেন, অন্যান্যেরা পরামর্শে নিশ্চল, সহসা নস্য লইয়া পুনৰ্ব্বার শাস্ত্রীয় বুদ্ধিযুক্ত। যশোবতী একভাবে বসিয়াছেন, বর্গভীমা মন্দিরে ইষ্টকে প্রতিমা উল্লিখিত ভঙ্গীতে; অভিজাত গৃহের রমণীরা তাঁহাকে সাজাইতে ব্যস্ত, তাঁহারা আপন আপন গৃহ হইতে প্রসাধন সামগ্রী আনিয়াছেন, গোলাপ-পাশে সূক্ষ্ম কারুকার্য্য, ইঁহাদের আনীত দর্পণের পিছনে কলাইকৃত প্রসাধনরত রাধা প্রতিমা, জড়োয়া সুখপক্ষী অঙ্কিত কাজললতা। স্বর্ণভৃঙ্গার হইতে তাঁহাকে উম্মল-পানি দেওয়া হইতেছে, তিনি সহাস্যবদনে তাহা পান করিতেছেন এবং তাঁহার চক্ষু আরক্ত। হায় মোহিনী মায়া! গোলাপের সহচরী, ফলে গোলাপের ম্লান তাঁহাকে পাইয়াছিল। নিকটে বন্ধ-চিত্র জাঁতি দিয়া একজন গুবাক কাটিতেছেন। জাঁতির সুরত ক্রীড়ারত স্ত্রী-পুরুষের হেবজ হাস্য, লোকক্ষয়কারী প্রবৃদ্ধকালের অহঙ্কারকে চূর্ণ করিতেছে! এয়োস্ত্রীগণ চুল দিয়া পথ মার্জনা করিলেন, জল সিঞ্চিত হইল। অধুনা যশোবতী চতুর্দোলায়, তিনি যেন লক্ষ্মীমূৰ্ত্তি, একহস্তে প্রস্ফুটিত পদ্ম, কখনও বা দেখিলেন পঞ্চ পল্লব, অন্য হাতে বরাভয়। যশোবতী ইদানীং সাক্ষাৎ চম্পক ঈশ্বরী। তাঁহাকে নামান হইল। হাজার হাজার স্ত্রী শরীর তাঁহার পায়ের কাছে কাছে গড়াইয়া পড়িতেছে। কাহারও মস্তকে তাঁহার পা পড়িয়া পিছলাইতেছে; কোন কোন রমণী অজ্ঞান হইতেছেন। কত শাঁখা তাঁহার পায়ে লাগিতেছে সিঁন্দুর পড়িতেছে। চতুর্দোলা হইতে নামিবার পরে অনেকেই তাঁহার স্মৃতি সংগ্রহের জন্য কেশ আকর্ষণ করিতে তৎপর…, একটি একটি চুল গেল, অনেক কিছুই গেল, ক্রমে বীভৎস রূপ ধারণ করিলেন। তিনি দৌড়াইয়া চিতায় উঠিলেন…অগ্নি সংযোগ করা হইল, শাঁখা কড়ি স্বর্ণালঙ্কার উড়িল। লেলিহান শিখায় গৃহাভিমুখী সুখপক্ষীর দল ছত্রাকার, কোনটি বা বিমোহিত হইয়া চিতার মধ্যে নিশ্চিহ্ন। প্রলয়ের শব্দ ধ্বনিত হইল। একটি রমণী তাঁহাকে দেখিয়া অচেতন হইলেন, ক্রোড়ের শিশু স্তন্যপান করিতে লাগিল আর কাঁদিতে লাগিল। চিতা হইতে দেখিলেন–পার্থিব মায়াবন্ধনে অধীর হইয়া একটি লোক লাঠির উপরে মুখ ন্যস্ত করিয়া আছে, আর কখনও কখনও লোকটির দৃষ্টি ধূম উদগীরণকে অনুসরণ করিতেছে।
যশোবতীর ভ্রম দর্শন অপগত হইল। তিনি যেন বা ঝুঁকিয়া পড়িতেছিলেন, কোনক্রমে টাল সামলাইয়া কহিলেন, “বাবা তুমি” বলিয়া লক্ষ্মীনারায়ণের কানে কানে কহিলেন, “ভয়!”ভয় বাক্যটিতে যে তৃণগুল্ম জড়াইয়াছিল তাহা সকলই কাঁপিয়া উঠিল।
“কোন ভয় নেই মা, তোমার ছেলেরা রইল, আমিও যত তাড়াতাড়ি…”
যশোবতী আশ্বস্ত হইলেন।
লক্ষ্মীনারায়ণ অন্য পার্শ্বে, বেলাতটে শায়িত বলরাম ও হরেরাম উদ্দেশ্যে কহিলেন, “তোমাদের বাড়ীতে কি খবর দেবে…।”
“একটা খবর…চিড়ে গুড় ত বহু আছে…এখন,…থাক আপনি তাড়াতাড়ি আসবেন” বলরাম কহিল।
৪. সীতারাম চক্ষু বুজিয়াছিলেন
সীতারাম চক্ষু বুজিয়াছিলেন। তাঁহাকে বিরক্ত করা বাঞ্ছনীয় নহে। যশোবতী সম্মুখের কলাপাতা হইতে একমুঠা ধান্য লইয়া পিতৃঋণ শোধ করিবার কালে অসম্বরণ করিতে পারিলেন না। বন্ধনের সকল কিছু সামগ্রীর উপর তিনি ভাঙ্গিয়া পড়িলেন। লক্ষ্মীনারায়ণের বুক ফাটিয়া গেল, তিনি চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে স্থান ত্যাগ করিলেন; অন্যান্য ব্রাহ্মণেরা তাঁহার জন্য ভেড়ীর উপরে অপেক্ষা করিতেছিলেন, এবং পরে তাঁহাদের আর দেখা গেল না।
একমাত্র, যশোবতী এই দিবালোকে, মানুষের সহজাত বেদনা লইয়া রোরুদ্যমানা, এ সময় একখানি ভয়ঙ্কর হাত তাঁহার চোখের সম্মুখে গাছ কৌটা এবং বিক্ষিপ্ত ধান্যের মধ্যে ভেকের মত স্তব্ধ। নড়িল। পাখীরা উড়িয়া গেল। হাতখানি যশোবতাঁকে আশ্বাস দিয়া উঠানামা করে, ধীরে আপন সম্বিতের সুক্ষ্মতার কলমকাটা পথ বহিয়া তাঁহার, যশোবতীর মুখমণ্ডলে উঠিল। এখনও তাঁহার মুখে চোখে ধান লাগিয়া আছে, তথাপি বৃদ্ধের দিকে তাকাইলেন, কাল আহত, বৃদ্ধ কুঞ্চিত, অভিজ্ঞ ওষ্ঠদ্বয় কম্পিত, তাহা হইতে, “আমি আছি…আছি.” একথা আসিল।
