বাদলার কথায় হিংস্র থাবা থেকে শিকার ফসকে যাওয়া জন্তুর মতো চোখ করে পিছন ফিরে তাকালেন মান্নান মাওলানা। এই ফাঁকে ফিরোজা যেন জান ফিরে পেল। ঝটকা মেরে মান্নান মাওলানার হাত কাঁধ থেকে নামিয়ে দিল, খাদা বুকের কাছে ধরে হন হন করে হেঁটে মন্তাজদের সীমানার দিকে চলে গেল।
ততক্ষণে বাদলাকে কোলে নিয়েছে রাবি। এই ফাকে ঘোমটাও দিয়েছে মাথায়। মান্নান মাওলানা ফিরে তাকাতেই বলল, মামায় আইছে বাইত্তে।
সাদা কালোয় মিশান বিছার মতো জোড়া ভুরু কুঁচকে, মুখখানা যতদূর সম্ভব বিকৃত করে খাই খাই করা গলায় মান্নান মাওলানা বললেন, মামাডা আবার কেডা?
প্রথমে ওইরকম হিংস্র চোখে তাকানো তারপর এমন মুখ করে কথা বলা, রাবি ভড়কে গেল। তার কাছে মান্নান মাওলানা রক্ত মাংসের তৈরি মানুষ না। মাটি দিয়ে নিশ্চয় এই রকম পরহেজগার বান্দা তৈরি করেননি আল্লাহতায়ালা। তৈরি করেছেন নূর দিয়ে। মান্নান মাওলানা তো আসলে ফেরেশতা। এই রকম একজন ফেরেশতা বদমাস মানুষদের মতো খাউ খাউ করতাছেন কেন? যুবতী মেয়েটার কাঁধে হাত দিয়েই বা কী করছিলেন তিনি!
রাবি একটা ঢোক গিলল। কাচুমাচু গলায় বলল, এনামুল মামায়।
এনামুল নামটা দোয়া দরুদের মতন কাজ দিল। চোখের পলকে চেহারা বদলে গেল মান্নান মাওলানার। চোখের হিংস্রতা কোথায় উধাও হল, কোথায় গেল মুখ বিকৃতি আর কুত্তার মতন খেউক্কানি! মুখ অমায়িক হয়ে গেল। গলার স্বর হল পুকুরের অনেক গভীরে লুকিয়ে থাকা কাদার মতো। হাসিমুখে মান্নান মাওলানা বললেন, কচ কী! এনামুল আইছে।
মাওলানা সাহেবের এই আচরণে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল রাবি। সেও হাসল। হ।
কুনসুম?
দুফইরা ভাত খাওনের আগে।
কেমতে আইছে। লনচে?
না। রিশকা কইরা।
রাবি কথা বলবার আগেই তার কোল থেকে বাদলা বলল, হ রিশকা কইরা আপনেগ বাড়ি ছাড়াইয়া হাজামবাড়ি মিহি আইয়া নামছে।
আমগো গেরামে তাইলে রিশকা আইয়া পড়ছে! বা বাবা বা।
তারপর আবার চিন্তিত হলেন মান্নান মাওলানা। ঢাকা থিকা রিশকা লইয়া বাইত্তে আইছে এনামুল! না, এইডা সম্ভব না। ছিন্নগর তরি গাড়ি লইয়াইছে তার বাদে লইছে রিশকা।
বয়স্ক লোকদের মতো মাথা নাড়িয়ে বাদলা বলল, হ। অমনেঐ আইছে।
এবার বাদলাকে একটা ধমক দিলেন মান্নান মাওলানা। ঐ বেডা, এত ডাঙ্গর অইছস অহনতরি মার কুলে উইঠা রইছস ক্যা?
রাবি বলল, হ হুজুর, বাদলা সব সময় খালি আমার কুলে উইট্টা থাকে। আপনে অরে ইট্টু ফুঁ দিয়া দেন।
তরে না আমি কইছিলাম, আহিচ আমার কাছে, পোলাডারে ঝাইড়া দিমুনে আর খাওনের লেইগা পানি পড়া দিমুনে। তুই তো আহচ ভাই।
কেমতে আমু! হারাদিন কাম থাকে।
পোলাডার ভালমন্দও কাম। এইডা করতে অইবো না?
হ করতে তো অইবোঐ।
আমি ঐদিন যে ঝাইড়া দিয়াইলাম তারবাদে মোতালেইব্বাগ ঐমিহি কইতর দেকতে যায়?
রাবি কথা বলবার আগেই বাদলা বলল, হ যাই।
মান্নান মাওলানা ভুরু কুঁচকালেন। কচ কী?
ছেলের দিকে তাকিয়ে তাকে একটা ধমক দিল রাবি। এই ছেমড়া মিছাকথা কচ ক্যা? ঐ দিনের পর থিকা তুই কি আর কইতর দেকতে যাচ? গেলে আমি জানতাম না। যহন বাইত্তে থাকি তহন তো দেকতামও!
বাদলা হাসল। আমি তো পলাইয়া পলাইয়া যাই। কেঐ দেহে না। চুপ্পে চুপ্পে মোতালেব নানাগো খোয়াড়ের সামনে খাড়ইয়া কইতর দেইক্কাহি। তোমারেও কই না।
মান্নান মাওলানা চিন্তিত গলায় বললেন, রাবি রে পোলাডা তর কমিনা। এই পোলায় বহুত ভোগাইবো তরে।
রাবি ভয়ার্ত গলায় বলল, তাইলে অহন কী করুম?
ভাল কইরা ঝাড়ন লাগবো অরে, তিনওক্ত পানি পড়া খাওয়ান লাগবো।
তাইলে আজ থিকাই ঝাড়েন, আইজ থিকাই পানি পড়া দেন।
ঐডা অইবো নে। তার আগে আরেকখান কথা ক আমারে। বাদলা বলে অহনতরি তর বুকের দুধ খায়?
একথায় লজ্জা পেল রাবি। মাথা নিচু করে বলল, হ।
এইডা তো সব্বনাইশা কথা। না না বুকে মুখ দিতে পারবো না পোলায়। দুধ ছাড়ান লাগবো।ইলে ফাড়া আছে পোলার কপালে।
রাবি ভয়ার্ত গলায় বলল, কেমতে ছাড়ামু?
মান্নান মাওলানা আশ্বাসের গলায় বললেন, ব্যবস্থা আছে। কইরা দিমুনে।
আইজঐ কইরা দেন।
আইজ মইবো না। সময় লাগবো। আমি যেদিন কমু ঐদিন আবি। বাদলারে লগে আনবি না। একলা আবি। ঝাড়ন লাগবো তরে, বাদলারে না।
রাবি চিন্তিত গলায় বলল, আমারে ঝাড়ন লাগবো ক্যা? ·
মান্নান মাওলানা হাসলেন। তর পোলার সামনে এই কথা কওন যাইবো না। পরে কমুনে।
আইচ্ছা।
অহন ক এনামুল কী কইছে।
এ কথায় রাবি চমকাল। হায় হায় আসল কথাঐত্তো ভুইল্লা গেছি। যেই কামে আইছি ঐ কামঐত্তো অহনতরি করি নাই। এনামুল মামায় আপনেরে যাইতে কইছে।
কুনসুম? অহনঐ?
না বিয়ালে।
বিয়ালে ক্যা? অহন কী করে?
দুফইরা ভাত খাইয়া লেপ মুড়া দিয়া যুমাইছে।
আইচ্ছা তাইলে বিয়ালেঐ যামুনে।ঐ রাবি আমার পত্ৰডা এনামুল পাইছিলো?
হ।
তরে কইল কেডা?
এনামুল মামায় দেলরা বুজিরে কইতাছিল। আমি হুনছি।
মান্নান মাওলানা বেশ একটা ফুর্তির শব্দ করলেন। আমার পত্র পাইয়া যহন বাইত্তে আইছে এনামুল, তাইলে কাম অইয়া যাইবো।
রাবি কথা বলল না, বাদলা বিজ্ঞের মতো বলল, হ অইয়া যাইবো।
মান্নান মাওলানা ঘেটি ত্যাড়া করে বাদলার দিকে তাকালেন। ঐ বেডা, কী অইয়া যাইবো?
বাদলা হাসল। আপনের কাম।
আমার কী কাম তুই জানচ?
হ।
কী কাম ক তো?
