‘ওরেব্বাবা! তোমার কামানের মুখটা একটু সরাও। গুলি বেরিয়ে পড়লে একেবারে ছাতু হয়ে যাব!’ বলল রানা।
এসব রসিকতায় কান না দিয়ে উৎকণ্ঠিত সুলতা জিজ্ঞেস করল, তোমার লাগেনি তো?
সামান্য লেগেছে। তোমার?
‘আমার লাগবে কেন, আমি কি মারামারি করতে গেছি? একটু থেমে আবার বলল, ইশ, তোমার গায়ে করডাইটের গন্ধ। মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরলে। কাপড়টা ছেড়ে ফেলো।
রানা দরজা বন্ধ করে ফিরে দাঁড়াতেই ওর মুখের দিকে চেয়ে চমকে উঠে সুলতা, বলল, তোমার মুখে এত কাটাকুটি কেন? রক্ত বেয়ে পড়ছে। এখন ডেটল। কোথায় পাই বলো তো!’ ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে উঠল সুলতা।
‘আমার সুটকেসের মধ্যে আফটার-শেভ লোশন আছে। বের করে দাও, তাই খানিকটা লাগিয়ে নিচ্ছি। আর আমার স্লিপিং গাউনটাও বের করো, এক্ষুণি খেয়ে শুয়ে পড়ব।
একটা চেয়ারের উপর গাউন আর ওল্ড স্পাইসের শিশিটা বের করে রাখতেই একটা টার্কিশ টাওয়েল কাঁধে ফেলে ওগুলো তুলে নিতে গেল রানা।
রাখো তো ওগুলো, আমি লাগিয়ে দেব,’ বলে প্রায় ঠেলতে ঠেলতে রানাকে বাথরুমের মধ্যে নিয়ে গেল সুলতা। কোথায় কোথায় লেগেছে দেখি?
টী-শার্টের বোতামগুলো খুলে ফেলল সুলতা আলতো হাতে। গেঞ্জিটা খুলে রানার দেহের দৃঢ় পেশিগুলোর দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, বাব্বা, কী অসম্ভব জোর তোমার গায়ে। তিনজন ষণ্ডা মার্কা লোকও পারল না তোমার সঙ্গে! নাও, এখন মুখটা ধুয়ে ফেললো তো আগে।’
মুখ ধুতে গিয়ে ডানহাতের তালুতে পানি লাগতেই জ্বালা করে উঠল। কাটা জায়গাটা দেখে আঁতকে উঠল সুলতা। কাঁচা দগদগে জখম থেকে এখনও রক্ত পড়া বন্ধ হয়নি। নীল হয়ে গেছে দু’পাশের জায়গাটা। খানিকটা লোশন ঢেলে দিতেই কড়ে আঙুলটা কাটা মুরগির মত লাফিয়ে উঠল কয়েকবার আপনাআপনি। জ্বালার চোটে কাতরে উঠল রানা। নিজের একটা রুমাল দিয়ে বেঁধে দিল সুলতা হাতটা। তারপর তোয়ালেটা পানিতে ভিজিয়ে মুছে নিয়ে মুখে, ঘাড়ে, পিঠে আর বাম কনুইয়ে লোশন লাগিয়ে দিল। ওর নরম বুক মাঝে মাঝে রানার দেহকে আলতো করে ছুঁয়ে গেল নিজেরই অজান্তে। লোশনের জ্বলুনির উপর প্রলেপের কাজ করল সে স্পর্শ।
‘আমার জন্যেই তোমার এই অবস্থা! সুলতা নিজেকে অপরাধী মনে করছে।
দেহের উপরের ভাগটায় লোশন লাগানো হয়ে গেল। সুলতা জিজ্ঞেস করল, নীচের দিকে কেটেছে কোথাও?
‘বোতামগুলো খুলেই দেখো না!’ মৃদু হেসে বলল রানা।
যাহ্, তুমি ভারি পাজী,’ বলে সত্যিসত্যিই বোতাম খুলবার উপক্রম করল সুলতা।
ওর হাতটা চেপে ধরল রানা। হঠাৎ কী হলো, দু’জন যেন বড় বেশি কাছে চলে এল। রানার বাঁ হাতটা সুলতার ক্ষীণ কটি ধরল জড়িয়ে। সুলতার সুন্দর চোখ দুটো একটু বিস্ফারিত। মুখটা উঁচু করে রানার চোখের দিকে চেয়ে আছে। নরম ভেজা ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক হয়ে আছে। ইঞ্চি তিনেক দূরে এসে দুই সেকেণ্ডের জন্যে থমকে দাঁড়াল রানার ঠোঁট। তারপর আর দূরত্ব থাকল না।
এক মিনিট, দুই মিনিট, তিন মিনিট। দুই হাতে রানাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে হাঁপাতে লাগল সুলতা। একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘চলো, খেয়ে নাও ঘরে এসে।’
‘তুমি যাও আমি কাপড়টা ছেড়েই আসছি।’
সাত কোর্সের ডিনার রাখা আছে টেবিলে। কিন্তু সবই ঠাণ্ডা। এক নজর দেখেই খাবার রুচি নষ্ট হয়ে গেল রানার। একজোড়া চিংড়ির কাটলেটের। মাঝখানে খানিকটা টম্যাটো-সস্ ঢেলে নিয়ে নাক-মুখ বুজে কোনও মতে খেয়ে নিল সে।
‘আচ্ছা, বলতে পারো, আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল কারা?
কবীর চৌধুরীর ভাড়া করা গুণ্ডা। এক গ্লাস পানি খেয়ে ঠক করে টেবিলের উপর গ্লাসটা রেখে জবাব দিল রানা।
তাই নাকি? কিন্তু, কারণ কী?
কারণ তোমার রূপ। মনে ধরে গিয়েছিল ওর।
যাহ্!’ হাসল সুলতা। কিন্তু লোকটাকে দেখে তো এমন বলে মনে হয়নি!
‘চোখের দেখায় সবাইকে কি চেনা যায়? আমাকেই বা কতটুকু চিনেছ তুমি?
‘ও, হ্যাঁ, তুমি হঠাৎ কোত্থেকে এলে? কোথায় গিয়েছিলে, বাইরে? মনে হলো। যেন আমাকে রক্ষা করবার জন্যেই দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলে?
‘একা একা ভাল লাগছিল না, বেরিয়ে পড়েছিলাম বাইরে। একটা নাইট শোতে ঢুকেছিলাম, ভাল লাগল না-কিছুদূর দেখে হাফ টাইমের সময় বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছিলাম।’
‘জানো, আমি জীবনে কখনও এমন অবস্থায় পড়িনি। আর একবার শুধু এমন অসহায় লেগেছিল-তোমাকে বলেছি। তুমি এসে না পড়লে কী যে হত ভাবতেই শিউরে উঠছি।’
‘কিন্তু ঘরে ঢুকল কী করে ওরা? ছিটকিনি লাগাওনি?’
লাগিয়েছিলাম।’
রানা উঠে গিয়ে দেখল চৌকাঠের একটা ফাঁক দিয়ে অনায়াসেই ছিটকিনি খোলা যায়। অর্থাৎ, জেগেই কাটাতে হবে রাতটা।
একটা সিগারেট ধরিয়ে পশ্চিমের জানালাটা খুলে দিয়ে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল রানা। বাতি নিভিয়ে দিয়ে পাশে চলে এল সুলতা। স্নিগ্ধ চাঁদের আলো। এসে পড়ল ওদের চোখে-মুখে।
ঘুমিয়ে পড়েছে শহরটা। মাঝে মাঝে দূর থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ ভেসে আসছে। হয়তো নাইট-ক্লাব থেকে বাড়ি ফিরছে কোনও ভদ্রলোক। তা ছাড়া সব নিঝুম। পাশেই কোনও বাড়িতে বাচ্চা কেঁদে উঠল। তারপর আবার চুপ।
সুলতার হাতটা তুলে নিল রানা হাতে। মনে হলো অদ্ভুত এক স্বপ্নের রাজ্যে চলে এসেছে ও আর সুলতা। মিটমিট করছে তারাগুলো। উজ্জ্বল চাঁদের পাশে নিস্প্রভ লাগছে ওদের। মনে হলো, এমন লগন যদি চিরস্থায়ী হত! মনে হলো, বলি, তোমাকে ভালবাসি। পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল আর কলুষ থেকে অনেক, অনেক দূরে সরে গিয়ে, এই রূপকথার রাজকন্যেকে বলি, তোমায় ভালবাসি! কিন্তু মনের একটি কথাও বেরোল না রানার মুখ দিয়ে।
