কিন্তু এ জন্য যে ধরনের কার্যকরী ক্ষমতা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হাতে ন্যস্ত করার প্রয়োজন ছিল মন্ত্রিসভা তা না করায় ফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ব্যবস্থাপনা উন্নত করার সুযোগ নষ্ট হয়। এই অবস্থার শেষ চেষ্টা হিসাবে তাজউদ্দিন মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অমান্য না করেও প্রস্তাবিত ‘উপদেষ্টা কমিটি’কে অপেক্ষাকৃত সক্রিয় সংগঠনে রূপান্তরিত করার সুযোগ উন্মুক্ত রাখার জন্য এর প্রতিনিধি সংখ্যা বৃদ্ধি করে একটি সেক্রেটারীয়েট স্থাপনে সচেষ্ট হন, যাতে অন্তত শুরু থেকেই স্বাধীনতা সমর্থক দলগুলির যোগাযোগ একটি নিয়মিত ও ফলপ্রসূ ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। মন্ত্রিসভার গৃহীত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রস্তাব তাঁর পক্ষে উত্থাপন করা অসুবিধাজনক বলে তিনি প্রস্তাবটি পেশ করার জন্য ৭ই সেপ্টেম্বর ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের কাছে অনুরোধ করে পাঠান এবং তাঁকে দেখা করতে বলেন।
পরদিন ৮ই সেপ্টেম্বর সকাল দশটায় জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠনের জন্য পাঁচ দলের নেতৃবন্দ কোলকাতায় মিলিত হন। মন্ত্রিসভার প্রতিনিধিরা ছাড়াও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মণি সিংহ, ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর এই বৈঠকে যোগদান করেন। একই উদ্দেশ্যে দেরাদুন থেকে এসে পৌঁছান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সংক্ষিপ্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপ-আলোচনার পর তারা জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেন। মন্ত্রিসভার দু’জন সদস্য, তাজউদ্দিন ও খোন্দকার মোশতাক ছাড়াও আওয়ামী লীগ থেকে আরও দু’জন প্রতিনিধি এবং অন্য চারটি দল থেকে একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে উপদেষ্টা কমিটি গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন খোন্দকার মোশতাক আহমদ। আগের দিন তাজউদ্দিনের অনুরোধ সত্ত্বেও অজ্ঞাত ব্যস্ততার দরুন মোজাফফর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে উঠতে পারেননি এবং পরদিন তিনি উত্থাপিত প্রস্তাব সমর্থন করেন। এরপর এই ক্ষুদ্র কমিটির জন্য সর্বসম্মতিক্রমে তাজউদ্দিন আহ্বায়ক নিযুক্ত হন। অতঃপর পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে অবিচল আস্থা জ্ঞাপন, শেখ মুজিবের মুক্তি দাবী, ভারত সরকারের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন এবং বাংলাদেশ সরকারের নীতির প্রতি আস্থাসূচক প্রস্তাব গ্রহণ করে উপদেষ্টা কমিটির সভা শেষ হয়। এমনিভাবে জাতীয় ঐক্যজোটকে একটি সক্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করার যে সামান্য সম্ভাবনা ছিল তা নিঃশেষিত হয়। তবে এই ঐক্যজোট যত দুর্বলই হোক, তা বৃহত্তর রণনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক শক্তি-সম্পর্ককে বাংলাদেশের অনুকূলে আনার পক্ষে সহায়ক হয়।
অধ্যায় ১২: সেপ্টেম্বর
প্রস্তাবিত ঐক্যফ্রন্টকে দুর্বল ‘উপদেষ্টা কমিটিতে’ পরিণত করার ক্ষেত্রে সর্বাধিক কার্যকর ভূমিকা ছিল খোন্দকার মোশতাকের। আওয়ামী লীগের ‘নিরঙ্কুশ অধিকারকে জলাঞ্জলি দিয়ে বহুদলীয় কমিটি গঠন করার ফলে আওয়ামী লীগের যে অংশ ক্ষুব্ধ হয়, তাদেরকে তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে পরিচালিত করার ক্ষেত্রেও মোশতাক সক্রিয় ছিলেন। অথচ নিজের নিউইয়র্ক যাওয়া যাতে সম্ভব হয়, এ জন্য সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মহলের জন্য তার বাহ্যিক ভূমিকা ছিল অন্য রকম। জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হওয়ার পাঁচদিন আগে, যখন এ বিষয়ে উধ্বতন প্রবাসী নেতৃত্ব গোপনীয়তা বজায়ের চেষ্টা করছিলেন, এমনকি ভারতীয় পত্রপত্রিকাও দৃশ্যত যখন এ বিষয়ের কোন হদিশ পায়নি, তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই লন্ডনের ‘গার্ডিয়ান পত্রিকার সংবাদদাতার কাছে ঘোষণা করেন যে, শীঘ্রই ‘ঐক্যবদ্ধ মুক্তিফ্রন্ট গঠিত হতে চলেছে এবং এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাশিয়ার সমর্থন লাভ সম্ভব হতে পারে। ৫ই সেপ্টেম্বরে পররাষ্ট্র সচিব মাহবুব আলম চাষীকে তিনি দিল্লী পাঠান মুখ্যত তার প্রত্যাশিত বিদেশ ভ্রমণ সম্পর্কে ভারতের সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে। পরবর্তীকালে প্রকাশিত এক তথ্য অনুসারে, যে দিন। ‘গার্ডিয়ান পত্রিকায় রাশিয়ার সমর্থনের সম্ভাবনা সম্পর্কে মোশতাকের আশাবাদ প্রকাশিত হয়, ঠিক সে দিনই অর্থাৎ ৪ঠা সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত যোসেফ ফারল্যান্ড প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে প্রস্তাব করেন, কোলকাতায় বাংলাদেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তারা জানিয়ে রাখতে চান যে, ইয়াহিয়া মোশতাকের সঙ্গে গোপনে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছেন। ফারল্যান্ডের এই প্রস্তাবে ইয়াহিয়া রাজী হন। কিসিঞ্জারের স্মৃতিকথা প্রকাশের আগে অবধি এই ঘটনার কথা অবিদিত থাকলেও, এই ধরনের কর্মকাণ্ড যে ভিতরে ভিতরে চলছিল তা সেই সময়ের আর একটি সূত্র থেকে প্রকাশ পায়।
১৯৬০ সালে কঙ্গোয় পাশ্চাত্য রাজনৈতিক ও অর্থনেতিক স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক’ বাহিনীর আবরণকে যেভাবে ব্যবহার করেছিল, ১৯৭১ সালের জুলাই-আগস্টে অধিকৃত এলাকায় জাতিসংঘের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা কর্মসূচী অনেকটা তেমনিভাবে ব্যবহার করতে এবং সেই উদ্দেশ্যে USAID–কে উত্তরোত্তর মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যায়। কাজেই আগস্টের শেষ দিকে এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করা হয়। ৫ই সেপ্টেম্বরের বেতার ভাষণে তাজউদ্দিন স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যে সাহায্য দিয়েছে পাকিস্তানের মাধ্যমে তা দখলকৃত এলাকায় বিলি করার ব্যবস্থা সঙ্গত মনে করেছে জাতিসংঘ। বিগত ঘূর্ণিঝড়ের পরে রিলিফের জন্য যে সব হেলিকপ্টার, জলযান ও অন্যান্য যানবাহন এসেছিল, বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধেই পাকিস্তান সরকার নির্বিকারচিত্তে সে সব ব্যবহার করেছে। দুর্গত মানুষের জন্য নির্দিষ্ট বহু সামগ্রী দখলদার সৈন্যদের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাতিসংঘের সেবাদলে এখন একদল যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এসেছেন উন্নত ধরনের যন্ত্রপাতি নিয়ে। এতে পাকিস্তান সৈন্যবাহিনীর রণকৌশলে সাহায্য হবে, তাতে সন্দেহ নেই। এই অবস্থায়, ত্রাণকার্যের মানবতাবাদী উদ্দেশ্য বিপর্যস্ত হবার ঘোরতর আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল যদি পৃথিবীর এই অংশে বিশ্ব প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে চান তাহলে তাকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে ত্রাণকার্যের নামে নিষ্ঠুর প্রহসন অনুষ্ঠিত না হয়।’
