এ যাবত অধিকার ও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার কোন কোন সদস্য নিজকে প্রধানমন্ত্রী সমকক্ষ হিসাবে জ্ঞান করায়–কি ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় (মূলত সহায়তা সংগ্রহের) প্রশ্নে, কি তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের ক্ষেত্রে–শৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের প্রশ্নকে তাঁরা অনেক সময় উপেক্ষা করতেন। ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রশ্ন ছাড়াও জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং মুক্তিযুদ্ধ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাদের উপলব্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্যও ছিল বিশাল। সমস্যা যদি কেবল এইটুকুই থাকতো তবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর যুগ্ম সিদ্ধান্তের পদ্ধতি গৃহীত হবার পর মন্ত্রিসভাকে ক্রমশ শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তোলা সম্ভব হত। কিন্তু বাস্তবে তখন উপদলীয় পরিস্থিতি গোপন বৈদেশিক হস্তক্ষেপের ফলে ছিল অত্যন্ত জটিল ও বিস্ফোরণোন্মুখ।
ডি. পি. ধরের সফরের দ্বিতীয় প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশর অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র বামপন্থী দলসমূহকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল শক্তি আওয়ামী লীগের সঙ্গে এমনভাবে গ্রথিত করা, যাতে এই সংগ্রাম জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের রূপ লাভ করে এবং যার ফলে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তিকে কেবলমাত্র নিরাপত্তার বর্ম হিসাবে ব্যবহার না করে বাংলাদেশে পাকিস্তানী দখল বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান সহায়ক উপাদান হিসাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। এই রণনৈতিক বিবেচনা থেকে বহত্তর ঐক্য সাধনের জন্য ডি. পি. ধর অত্যন্ত স্বল্প সময়সীমার মাঝে (অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শেষে ইন্দিরা গান্ধীর মস্কো সফর শুরু হবার আগে) বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার অনিচ্ছুক অংশকে ঐক্যজোট প্রস্তাবে যে পদ্ধতিতে সম্মত করান, তা সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরাগ উৎপাদন করে। তদুপরি দিল্লীর সাথে মন্ত্রীদের সরাসরি সংযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধজনিত ক্ষোভও সম্ভবত এর সাথে যুক্ত হয়।
অন্যদিকে ডি. পি. ধর এই চারদিনে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের নেতা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে খোলাখুলি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং এর রাজনৈতিক উপাদান সম্পর্কে যে ধারণা গঠন করেন, তা পরবর্তী চার মাসের ঘটনাধারার বিকাশকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর দিল্লী প্রত্যাবর্তনের পর পরই বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা প্রস্তাবিত জাতীয় মোর্চার নির্দিষ্ট কাঠামো ও ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। কিন্তু এদের কোন কোন সদস্যের অভিমতকে প্রতিধ্বনিত করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের জন্য ভারত সরকারের ‘চাপ’ এ ‘হস্তক্ষেপের’ বিরুদ্ধে ক্ষোভের গুঞ্জন শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে মন্ত্রিসভা জাতীয় ঐক্যজোট গঠন করেন ঠিকই, তবে এই জোটকে কোন কার্যকরী সংগঠনের রূপ না দিয়ে নিছক এক উপদেষ্টা সংস্থার মর্যাদা দান করেন এবং এর অধিকার সীমিত করেন মুক্তিসংগ্রামের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ দানের মধ্যে। কিন্তু এই পরামর্শ দান প্রক্রিয়া কিভাবে বা কত নিয়মিত সংঘটিত হবে, সে বিষয়টিও সর্বাংশে অস্পষ্ট থাকে। অন্য কথায়, বৃহত্তর রণনৈতিক বিবেচনা থেকে জাতীয় মোর্চা গঠনের জন্য ভারতের জোরাল অভিমতের কথা বিবেচনা করে মন্ত্রিসভা ‘জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠনে সম্মত হলেও সাংগঠনিক অর্থে এই মোর্চা একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানের রূপ লাভ করে।
কিন্তু বাংলাদেশের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে, এই বিশেষ সময়ে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মূল প্রয়োজনই ছিল রাজনৈতিক। ইতিপূর্বে মে-জুন মাসে মুক্তিযুদ্ধের জন্য ভারতীয় সহায়তার মাত্রা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এবং এই সহায়তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্তরায়স্বরূপ পাক-চীন মিলিত আক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করার উদ্দেশ্যে, ভারত-সোভিয়েট সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অত্যাবশ্যক বলে মনে করা হয় এবং এই লক্ষ্যে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের বিষয় উত্থাপন করা হয়। তবু মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতির সাথে সাথে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরো কিছু অতিরিক্ত বিবেচনা ফ্রন্ট গঠনের চিন্তার সাথে ক্রমশ যুক্ত হতে থাকে। যেমন জুলাইয়ের শেষ দিকে ‘শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের ক্রমবর্ধিত দৌরাত্মের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় রাখার জন্য দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক কর্মীদের ফেরৎ পাঠিয়ে গোপন সহায়ক সংগঠন নির্মাণ করা অত্যাবশ্যক বলে বিবেচিত হয়। এই উদ্দেশ্যে পরিষদ সদস্যদের সমবায়ে গঠিত বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাউন্সিল এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনগুলিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি ঘটে সামান্যই। তারও আগে অর্থাৎ মে-জুন মাসে ‘মুজিব বাহিনী’ দেশের ভিতরে গেরিলা যুদ্ধের উপযোগী রাজনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণ করতে সক্ষম হবে বলে অনুমান করা হলেও কার্যক্ষেত্রে তা হয়নি। দেশের ভিতরে এই রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করার উদ্দেশ্যে-বিশেষত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও সংশ্লিষ্ট ন্যাপের কর্মীদের আগ্রহ ও মনোভাব বিবেচনা করে এক বহুদলীয় কেন্দ্রীয় সংগঠনের অধীনে পরীক্ষামূলকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক রাজনৈতিক সংগঠন তৈরী করার চেষ্টা তাজউদ্দিন যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন।
‘শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের দৌরাত্ম মোকাবিলা করার প্রশ্ন ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় ও সংহত করে তোলার নিজস্ব কতকগুলি সমস্যা ছিল। জুন-জুলাই থেকে তরুণ যুদ্ধ-অনভিজ্ঞ যোদ্ধাদের ছোট ছোট দল অতি স্বল্প পরিমাণ বিস্ফোরক ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এবং নামমাত্র পাথেয় সম্বল করে সীমান্ত অতিক্রম করা মাত্র প্রায়শই যে বিপদ-সঙ্কুল বা অসংগঠিত অবস্থার মাঝে নিক্ষিপ্ত হত, সেই অবস্থার মাঝে অনেক যোদ্ধাকেই নিছক উপস্থিত বুদ্ধির জোরে টিকে থাকতে হয়েছে এবং অনেকে এর ফলে লক্ষ্য-বিচ্যুতও হয়েছে। এ ছাড়া ভ্রান্ত রিক্রুটিং পদ্ধতির জন্য কিছু স্বার্থবুদ্ধিপ্রবণ তরুণেরও সমাবেশ ঘটে। তখন থেকেই দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়–কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার জন্যেই নয়, তাদের সমন্বিত ও নিয়ন্ত্রিত করার স্বার্থেও। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন আঞ্চলিক কাউন্সিল থেকেও প্রায় একই মর্মে কিছু রিপোর্ট আসতে শুরু করে।
