রীতিগত (Conventional) যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে বিজয়োপযোগী রণনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় অসুবিধা ছিল দখলদার পাকিস্তানী সৈন্যের তুলনায় বাংলাদেশের সেনাদলের সংখ্যা, সমরাস্ত্রের মান, সামরিক অবকাঠামো ও সাংগঠনিক দৈন্যতা। পক্ষান্তরে গেরিলা যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে রণনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রধান অসুবিধা ছিল, দেশের ভিতরে রাজনৈতিক অবকাঠামোর অভাব তথা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা ও নিয়ন্ত্রণের উপযোগী ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক সংগঠনের অনুপস্থিতি। তা ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে গেরিলা যুদ্ধে দখলদার সৈন্যদের কেবলমাত্র পরিশ্রান্ত ও দুর্বলই করা সম্ভব; তাই গেরিলা যুদ্ধের সর্বশেষ পর্যায়ে পরিশ্রান্ত শত্রুবাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করার জন্য প্রয়োজন পড়ে বিরাট ও একত্রীভূত বাহিনীর চূড়ান্ত আঘাত-যেমন চীনের ছিল 4th Route Army অথবা দক্ষিণ ভিয়েতনামে ভিয়েত-কং গেরিলা তৎপরতার সর্বশেষ পর্যায়ে ছিল উত্তর ভিয়েতনামের নিয়মিত বাহিনীর সাহায্য।
প্রত্যেক জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নিজস্ব কতকগুলি বৈশিষ্ট্য এবং কিছু সমস্যা থাকে। এগুলির বাস্তব সদ্ব্যবহার ও সমাধানের উপরেই নির্ভর করে সেই বিশেষ জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সাফল্য ও ব্যর্থতা। রীতিগত ও গেরিলা-এই উভয়বিধ লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের উপরোল্লিখিত সীমাবদ্ধতার দরুন এবং অন্যদিকে তাদের আপকালীন আশ্রয়দাতা ভারতের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল যাবত শরণার্থীসৃষ্ট দুঃসহ চাপ মেনে চলার অক্ষমতা ও অসম্মতির ফলে বাংলাদেশকে মুক্ত করার একমাত্র বাস্তব উপায় ছিল: দেশের অভ্যন্তরে অনিয়মিত যুদ্ধে এবং সীমান্ত বরাবর ছোট ও মাঝারি সংঘর্ষে পাকিস্তানী সেনাদের যুদ্ধ-পরিশ্রান্ত করে তোলার পর ভারতীয় বিমান, নৌ ও হল বাহিনীর সহযোগিতায় চূড়ান্ত আঘাতের ব্যবস্থা করা। মে, জুন ও জুলাই মাসে তাজউদ্দিনের সঙ্গে এবং তাজউদ্দিনের পক্ষে বিভিন্ন বৈদেশিক মহলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাবার কালে আমার মনে কখনও এমন সংশয় দেখা দেয়নি যে তাজউদ্দিন এই রণনীতির বিকল্প অন্য কিছু সম্ভব বলে মনে করতেন। বস্তুত ভারত যাতে অপ্রতিহতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে পারে এবং চূড়ান্ত লড়াইয়ের স্তরে, ভারতের সামরিক শক্তি যাতে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়, সেই উদ্দেশ্যেই আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে ভারতের অনুকূলে আনা আলোচ্য সময়ে আমাদের প্রধান লক্ষ্য ও করণীয় হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু এ ব্যাপারে কর্নেল ওসমানীর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বহুলাংশেই ভিন্ন। মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং এবং বিশেষত নিয়মিত বাহিনীর দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি ও অস্ত্রসজ্জার জন্য ভারত সরকারের উপর নিরন্তর চাপ সৃষ্টির ব্যাপারে তিনি ছিলেন নিরলস। জুলাই মাসে তিনটি ব্যাটালিয়ানের সমবায়ে একটি ব্রিগেড গঠন এবং সেপ্টেম্বরে তিনটি সম্পূর্ণ নতুন ব্যাটালিয়ান গঠনের উদ্দেশ্যে ভারতীয় সম্পদ ও সহায়তা লাভের জন্য বাংলাদেশ মন্ত্রিসভাকে তিনি তৎপর রাখেন। কিন্তু তৎসত্ত্বেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে প্রত্যক্ষ ভারতীয় সহায়তার পরিধি সম্পর্কে দ্বিধান্বিত মনোভাব ওসমানীর রণনৈতিক পরিকল্পনা সংক্রান্ত চিন্তাকে অস্বচ্ছ ও অসম্পূর্ণ করে রাখে। মে মাসে মন্ত্রিসভার সঙ্গে তিনি যখন দিল্লীতে আলাপ-আলোচনার জন্য যান, তখন সম্ভবত এই উপলব্ধিতে তিনি পৌঁছান যে, বাংলাদেশকে মুক্ত করার ব্যাপারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সম্ভাবনা অনুপস্থিত অথবা খুবই অনিশ্চিত। যদিও মে মাস থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শক্তি সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য এবং মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং এর জন্য ভারতীয় সহায়তা কিছু কিছু শুরু হয়, তবু জুন-জুলাইয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসংগ্রামীদের মুক্তিযুদ্ধে নিয়োগের (Induction) ঘটনায় ওসমানী চিন্তিত বোধ করতে শুরু করেন। তা ছাড়া আলোচ্য সময়ে, ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের দুই নেতা লে. জেনারেল অরোরা এবং মেজর জেনারেল জ্যেকবের সঙ্গে কর্নেল ওসমানীর যোগাযোগ বাহ্যত সৌজন্যমূলক হলেও তা যে সব সময় সহজ ও পারস্পরিক আস্থাবর্ধনে সহায়ক হত, একথা বলার উপায় নেই। পরিস্থিতি বিশেষণে দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্নতা এবং সমস্যা সমাধানে সাধারণ মতপার্থক্য ছাড়াও অপর পক্ষের প্রচ্ছন্ন পদমর্যাদা-সচেতন আচরণ ওসমানীর জন্য সম্ভবত পীড়াদায়ক হত। যতদূর জানা যায়, ভারতীয় বিএসএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ জাতীয় কোন সমস্যা তার কখনো ঘটেনি। কিন্তু মে মাস থেকে বাংলাদেশের ব্যাপারে বিএসএফ-এর ভূমিকা দ্রুত হ্রাস পতে শুরু করে।
এই সব উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা আত্মমর্যাদা-সচেতন ওসমানীকে কতখানি প্রভাবিত করে বলা কঠিন, তবে তার সমর পরিকল্পনা সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা গড়ে ওঠে কেবলমাত্র দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘গেরিলা যুদ্ধ এবং সীমান্ত অঞ্চলে বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর সাহায্যে ‘মুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যকে অবলম্বন করে। কিন্তু নিয়মিত বাহিনী যেখানেই মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করুক, বিমান প্রতিরক্ষা, ট্যাঙ্ক ও গোলন্দাজ বাহিনীর অভাবে তার সুরক্ষা দুঃসাধ্য ছিল। অবশ্য অক্টোবরের শুরুতে মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা ওসমানী নিজেই বাতিল করে দিয়ে নিয়মিত বাহিনীর এক উল্লেখযোগ্য অংশকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা কৌশলে লড়াই করার জন্য নিয়োগ করতে শুরু করেন। এই গোপন তৎপরতা দেশের ভিতরে দখলদার বাহিনীকে যতই নাজেহাল করুক, কেবলমাত্র এই পন্থায়, বিশেষত রাজনৈতিক অবকাঠামো এবং সুসংগঠিত নেতৃত্ব-কাঠামোর অভাবে, দখলদার বাহিনীকে বৎসরকালের মধ্যে সম্পূর্ণ উৎখাতের চিন্তা ছিল অবাস্তবধর্মী। বাংলাদেশের সামরিক শক্তির এই মৌলিক অক্ষমতার ফলে দেশকে। শত্রুমুক্ত করার বিঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে যে শূন্যতা (gap) বিরাজমান ছিল, তা পূরণ করার জন্য ভারতীয় সামরিক সহায়তাকে কোন নির্দিষ্ট রূপে, মাত্রায় ও সময়ে গ্রহণ করা দরকার তা সুস্পষ্টভাবে নির্ণয় করার দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বের।
