এই পরিস্থিতিতে জুলাইয়ে সেক্টর অধিনায়কদের সম্মেলনের প্রাক্কালে মুক্তিযুদ্ধের অধোগতি রোধ এবং কমান্ড ব্যবস্থার উন্নতি সাধনের উদ্দেশ্যে এক ‘যুদ্ধ কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। সেক্টর অধিনায়কদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সাথে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এবং তাদের সমবায়ে ‘যুদ্ধ কাউন্সিল গঠনের এই উদ্যোগের পিছনে মেজর জিয়াউর রহমান মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। প্রধান সেনাপতি ওসমানীকে দেশরক্ষা মন্ত্রী পদে উন্নীত করে সাতজন তরুণ অধিনায়কের সমবায়ে গঠিতব্য এক কাউন্সিলের হাতে মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণই ছিল আলোচ্য প্রস্তাবের সার কথা। কিন্তু প্রস্তাবের মূলমর্ম ওসমানীর নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থাব্যঞ্জক হওয়ায় কর্নেল ওসমানী ১০ই জুলাই সম্মেলনের প্রথম দিনেই প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। সেক্টর অধিনায়কদের মধ্যে খালেদ মোশাররফ উত্থাপিত যুদ্ধ কাউন্সিল’ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তাজউদ্দিনের চেষ্টায় ওসমানীর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার হতে কেটে যায় একদিনেরও বেশী সময়। সেক্টর অধিনায়কদের সম্মেলনের এই অপ্রীতিকর সূচনা সত্ত্বেও তারপর কয়েকদিনের আলোচনায় বিভিন্ন সেক্টরের সীমানা পুনঃনির্ধারণ, মুক্তিবাহিনীর শ্রেণীকরণ ও দায়িত্ব অর্পণ, সশস্ত্র তৎপরতার লক্ষ্য ও পরিসীমা নির্ধারণ, দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা ঘাঁটি নির্মাণ, প্রতিপক্ষের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দেশের অভ্যন্তরে অনিয়মিত যুদ্ধে (irregular war) নিযুক্ত ছাত্র ও তরুণদের বাহিনীর নামকরণ হয় ‘গণবাহিনী’, যদিও মুক্তিযোদ্ধা’ (Freedom Fighter of FF) নামেই তারা অধিক পরিচিতি লাভ করে। দেশের সীমান্ত এলাকায় সমুখ অথবা গোপন আক্রমণে শত্রুসেনাকে ঘায়েল করার জন্য ‘ইবিআর’, ‘ইপিআর’ এবং ক্ষেত্রবিশেষে আনসার, পুলিশ ও নতুন রিক্রটের সমবায়ে গঠিত হয় নিয়মিত বাহিনী’, ‘মুক্তিফৌজ বা MF নামেই যার অধিক পরিচিতি ঘটে। এই নিয়মিত বাহিনীর মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় কিছু ‘মুক্তাঞ্চল’(lodgement area) গঠনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে নিয়মিত বাহিনীকে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সেক্টর কমান্ডারদের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের পর দেখা যায়, সংগঠন ও আক্রমণ ধারার ব্যাপারে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দু’টি অত্যন্ত মূল বিষয়ে তথা, কেন্দ্রীয় কমান্ড গঠন এবং পূর্ণাঙ্গ রণনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যথোচিত দৃষ্টি না দেওয়ায় উভয় বিষয়েই মারাত্মক দুর্বলতা রয়ে গেছে। প্রায় চৌদ্দশ’ মাইল সীমান্ত জুড়ে বিস্তৃত এবং কোন কোন অংশে দুর্গম এই রণাঙ্গনকে স্বল্প সম্পদ ও সীমিত সহায়তার উপর নির্ভর করে কোলকাতা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যে কোন কমান্ডের পক্ষেই সাধ্যাতীত ছিল। বিশেষত সেক্টরগুলির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের কোন উপায় না থাকায় কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে সেক্টর নিয়ন্ত্রণের চিন্তা ছিল অবাস্তব। সেক্টরের পক্ষেও ঊর্ধ্বতন কমান্ডের সময়োপযোগী নির্দেশের বা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার সুযোগের অভাবে নিজেদের বুদ্ধিবিবেচনার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। সম্ভবত কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে দুই বা তিনটি আঞ্চলিক কমান্ড স্থাপন করে এবং আঞ্চলিক কমান্ডের হাতে সেক্টর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব অর্পণ করে কমান্ড ব্যবহার মৌলিক দুর্বলতা বহুলাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হত।
কিন্তু ওসমানীর পদত্যাগ প্রচেষ্টার পর এহেন নাজুক বিষয় তাঁর কাছে উত্থাপন করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়ে। সেই পর্যায়ে ওসমানীর সম্ভাব্য পদত্যাগের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বিবেচনা করেই আঞ্চলিক কমান্ড গঠনের প্রশ্নটি স্থগিত থাকে। কেন্দ্রীয় কমান্ড ও সেক্টর অধিনায়কদের মধ্যে বিশাল দূরত্ব পূরণ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বাহিনীর নিজস্ব টেলিযোগাযোগ বা অন্য কোন উপায় না থাকায় প্রাত্যহিক যোগাযোগের জন্য তাদের পক্ষে ভারতীয় সিগনালের উপর নির্ভর করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। এর ফলে বাংলাদেশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ও একান্ত নিজস্ব বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমান্ড ও সেক্টরের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সুযোগ ছিল অনেকটা সঙ্কুচিত। তা ছাড়া প্রধান সেনাপতির নিজস্ব কর্মর্তালিকায় বিভিন্ন সেক্টরে নিয়মিত পরিদর্শন বিশেষ কোন অগ্রাধিকার পেত না। কমান্ড ব্যবহার এই সব অসম্পূর্ণতা ও দুর্বলতার ফলে সেক্টর অধিনায়কদের অনেকেই এক ধরনের স্বাধীন ক্ষমতার উৎস হিসাবে বিরাজ করতে থাকেন। ক্রমে এই স্বাধীন ক্ষমতা কোন কোন অধিনায়কের মধ্যে আত্মপরিপোষণের অভিপ্রায় ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষকে উদ্দীপ্ত করে।
কমান্ড গঠনে এই দুর্বলতা অপেক্ষাও আরও বড় দুর্বলতা ধরা পড়ে বাংলাদেশের নিজস্ব রণনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে। পাকিস্তানী হামলা শুরু হবার সাড়ে তিন মাস পর জুলাইয়ে সেক্টর অধিনায়কদের এই প্রথম সম্মেলন শেষ হওয়ার পরেও দেখা গেল, সংগঠন ও আক্রমণ ধারার ব্যাপারে কয়েকটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিকই, কিন্তু দখলদার বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পরাভূত করার মত কোন রণনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং নির্দিষ্ট সময়সূচী নির্ধারণ করা হয়নি। সম্মেলন নিয়মিত বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ‘আক্রমণ ধারার নির্দেশ’ (Operations instruction), তৎপরতার কৌশল ও লক্ষ্য প্রভৃতি বিষয়ে কিছু সাধারণ আলোকপাত করতে সক্ষম হলেও তাকে কোন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সামগ্রিক বিজয় লাভের উপযোগী পরিকল্পনা হিসাবে গণ্য করা যায় না।
