বাইরে বেরিয়ে ট্যাক্সি নিলো ভাইয়া। বললো নিউমার্কেট। আমি শুধু রাস্তা দেখছি, আর দেখছি অগণিত লোকের হেঁটে যাওয়া। ওরা স্বাধীন। ওদের কেউ ধরে নেবে না। হঠাৎ ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরলাম। ভাইয়া মাথায় হাত দিয়ে বললো, ভয় কিরে? আমি তো এসে গেছি। খোকা (অর্থাৎ ছোট ভাই তোর জন্যে বাড়ি সাজিয়ে অপেক্ষা করছে। আলী ভাইকে দেখলে চিনতে পারবি না। চমকে উঠলাম, আলী ভাই বেঁচে আছে? আছে, তবে বা পাটা কেটে ফেলেছে। আর কিছু জিজ্ঞেস করতেও ভয় হলো। মার্কেটে নেমে ভাইয়া জিজ্ঞেস করলো শাড়ি কিনবি না সালোয়ার কামিজ। স্থির দৃষ্টিতে ভাইয়ার মুখ জরিপ করে বললাম শাড়ি। শাড়ি, জুতো, স্যান্ডেল, প্রসাধনী, চিরুনি, ব্রাশ সব কেনা হলো ভারপর গিয়ে উঠলাম নিউ মার্কেটের কাছে একটা হোটেলে। আমরা পরদিন সকালের ফ্লাইটে ঢাকা যাবো। সারাটা দিন ভাইয়ার সঙ্গে ছোটবেলার মতো ঘুরলাম।
সিনেমা দেখলাম, প্রচুর গল্প করলাম। ভাইয়া তার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলো, থোকা কেমন করে বেঁচে গেছে অল্পের জন্য তাও বললো। আমি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম আমি যে এখানে আছি তুমি কি করে জানলে? ভাইয়ার মুখটা ম্লান হয়ে গেল। বললেন ঢাকায় ভারতীয় মিলিটারীর ব্রিগেডিয়ার ভার্মার কাছে গিয়েছিলাম যদি তোর কোনও খবর পাওয়া যায়। ভদ্রলোক অত্যন্ত অমায়িক, ধৈর্য ধরে সব শুনলেন। পরে বললেন, যেসব বাঙালি মহিলা পাকিস্তানি বন্দিদের সঙ্গে গেছে তাদের কিছু হিসাব আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা নীলিমা ইব্রাহিমের কাছে। আপনি তার সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখতে পারেন। গুড় লাক।
অনেক কষ্টে নীলিমা ইব্রাহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। উনি তোর নাম শুনে খুবই উত্তেজিত হলেন। বললেন, অনেক চেষ্টা করেছিলাম বাবা, কিন্তু কিছুতেই ওকে আটকাতে পারলাম না। সমস্ত দেশের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষোভ আর অভিমান নিয়ে ও চলে গেল। তুমি অশোকের কাছে যাও আমি ওকে বলে দিচ্ছি। ও তোমার বোনকে খুঁজে দেবে। ব্রিগেডিয়ার ভার্মার নাম অশোক। সত্যিই অশোক তার দিদির নির্দেশে আমার জন্য যা করেছে তা বলে শেষ করতে পারবো না রিনী। উনি না থাকলে আমি হয়তো আর তোকে খুঁজে পেতাম না।
ঢাকাতেও আমরা কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে উঠলাম না। একরাত হোটেলে রইলাম। ভাইয়ার অফিসে যেতে হলো ছুটির ব্যবস্থা করতে। তাছাড়া আমার সম্পর্কেও বাংলাদেশ সরকারকে কি কি কাগজ পত্রদিতে হলো। রাতের ট্রেনে রওয়ানা হলাম। পরদিন নিজেদের বাড়ি।
সব কিছুই তেমনি আছে তবে সব মানুষ জড় পদার্থের মতো হয়ে গেছে। আলী ভাই ক্রাচ নিয়ে এসে দাঁড়ালো। গামছা দিয়ে চোখ ঢেকে বললো। এ তোমার কি চেহারা হয়েছে আপামণি। কেন? ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, আমি তো ভলো আছি। কিন্তু তুমি তো আমার জন্য পা হারালে আমাকে কথা শেষ করতে দিলো না আলী ভাই, মুখ চেপে ধরলো। সবাই মিলে চেষ্টা করে বাড়িটাকে জীবন্ত করে তোলা হলো।
আব্বা আম্মার জন্য মিলাদ পড়ানো হলো। অনেকেই এলেন, কেউ কথা বললেন না। সবাই বলতে গেলে স্বাভাবিক ব্যবহার করলেন, আব্বা-আম্মার জন্য দুঃখ করলেন। মহিলারা কেউ কেউ কৌতূহলী হয়ে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলেন, আমি সুযোগ দিলাম না। প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখী যে হতে হবে তা বুঝতে পারলাম।
বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। ভাইয়া আমাকে যাবার জন্য জিদ করলো ‘ বললো তুই স্বাভাবিক না হলে কেউ তোকে স্বাভাবিক হতে দেবে না। আরও যন্ত্রণা বাড়াবে, শেষ পর্যন্ত গেলাম। পুরোনো ক্লাসফ্রেন্ড কয়েক জনের সঙ্গে দেখা হলো। ওরা মুক্তিযুদ্ধের গল্প করলো। আমাকে বললো, এবার তোর কথা বল? বললাম, আমার কথা? শুনালাম আর সবাই গিললো। সবার অনাবিল হাসি থমকে আবহাওয়া ঠাণ্ডা শীতল। হয়ে গেল। স্যারদের সঙ্গে দেখা করলাম। জুনিয়র স্যার একেবারেই স্বাভাবিক ব্যবহার করলেন। কিন্তু সিনিয়রদের ভেতর দু’একজন বেশ তীর্যক ভঙ্গিতে চাইলেন এবং বাঁকা প্রশ্ন করলেন। চুপ করে গেলাম। ভাবলাম পায়ের নিচের মাটি শক্ত হোক। তারপর দেখে নেবো। কিন্তু মাটি কি আজও শক্ত হয়েছে।
গতানুগতিক জীবন কেটে যায়। বাসায় আমি একা, সেই পুরোনো মায়ের আমলের বুয়া আর আলী ভাই। আলী ভাই আমাকে সর্বক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখে। ও কেন যেন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গেছে। ভাইয়া প্রায়ই আসে। কয়েক ঘণ্টার জন্যে হলেও আমাদের দেখে যায়। একদিন সংকোচ ত্যাগ করে বললাম, ভাইয়া তুই বিয়ে কর। ভাবি এলে আমার এতো একা একা লাগবে না। ভাইয়া হেসে বললো, আমি বিয়ে করলে তোর ভাবি এখানে থাকবে? ও আমার সঙ্গে যেতে চাইবে না? চাইলেও… কথাটা শেষ করতে পারলাম না। ভাইয়া বললো, আগে তোর ব্যবস্থা করি তারপর নিজের। আতোয়ারের সঙ্গে কথা হয়েছে। ও সামারে আসবে তখন সব কথা হবে।
আপন অলক্ষ্যে আমার ওষ্ঠে ম্লান হাসি দেখে ভাইয়া বললো, না, না, তুই ওকে ভুল বুঝিস না। জবাব দিলাম না। আজ প্রায় পাঁচমাস হলো আমি এখানে এসেছি, ভাইয়ার সঙ্গে তার কথাও হয়েছে অথচ আমাকে একটা ফোন পর্যন্ত করে নি। আমি কিন্তু ওকে চেষ্টা করে ভুলতে বসেছি। কারণ ওকে আমি চিনিঃ ও ভালোমানুষ কিন্তু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ নয়। ও আমাকে নিয়ে সমাজের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারবে না। তবুও ভাইয়ার স্বপ্নটা ভাঙতে ইচ্ছে হলো না।
